নারী আসনে বাড়ছে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা

ছবি: উইকি
সংসদে উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী নারীদের অংশগ্রহণ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সম্পদশালী ও নির্দিষ্ট পেশার আধিপত্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে জমা দেওয়া ৪৯ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত এবং কোটিপতি। এই তথ্য একদিকে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে, অন্যদিকে ক্ষমতার কাঠামোয় অর্থনৈতিক বৈষম্যের গভীরতাও স্পষ্ট করে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পর্যবেক্ষণে বলেছে, সংসদে উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী নারীদের অংশগ্রহণ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সম্পদশালী ও নির্দিষ্ট পেশার আধিপত্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সংরক্ষিত নারী আসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে এটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথমত, শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা সাধারণ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তুলনায় এগিয়ে। প্রায় ৬৩ শতাংশ প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী, যেখানে সাধারণ আসনে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি সূচক, কারণ শিক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নীতিনির্ধারণে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই উচ্চশিক্ষিত নারীরা কি বাস্তবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি তারা কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন কাঠামোর অংশ?
দ্বিতীয়ত, সম্পদের বিষয়টি এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে আলোচিত দিক। প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি, এবং তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি। এমনকি কয়েকজন প্রার্থীর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকারের তথ্যও উঠে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে সংরক্ষিত নারী আসনেও ধনী শ্রেণির প্রভাব প্রবল। সাধারণ জনগণের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত নারীরাই এখানে বেশি সুযোগ পাচ্ছেন, যা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক।
তৃতীয়ত, পেশাগত বৈচিত্র্য থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু পেশার আধিপত্য লক্ষণীয়। আইনজীবীরা সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা সাধারণ আসনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও গৃহিণীদেরও উপস্থিতি রয়েছে, তবে শ্রমজীবী বা প্রান্তিক পেশার নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় অনুপস্থিত। এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে একটি সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে, যেখানে সমাজের সব স্তরের কণ্ঠস্বর সমানভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
চতুর্থত, বয়সের দিক থেকেও একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা দেখা যায়। প্রার্থীদের গড় বয়স ৫২ বছরের বেশি, এবং তরুণ নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রজন্মগত ভারসাম্যের অভাব নির্দেশ করে। নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি আনতে তরুণদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে তা সীমিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী প্রার্থীদের সম্পদের তুলনামূলক চিত্র। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের সম্পদের পরিমাণ তাদের স্বামীর চেয়েও বেশি। এটি একদিকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ইঙ্গিত দেয়, তবে অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে—এই সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
সংরক্ষিত নারী আসন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর কাঠামো ও বাস্তবায়নে বৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক করতে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন হতে পারে।



