বিজেপি আরএসএসের দুর্গা মমতা সরকারের পতন, তৃণমূল কি সত্যিই বিজেপি বিরোধী?

আরিফুজ্জামান তুহিন
আরিফুজ্জামান তুহিন
প্রকাশ: ৫ মে ২০২৬, ৯:৫৩পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
বিজেপি আরএসএসের দুর্গা মমতা সরকারের পতন, তৃণমূল কি সত্যিই বিজেপি বিরোধী?

স্কেচ: এআই

শেয়ার করুন:

যতই মমতার শাড়ি লাল রক্তে গাঢ় হচ্ছিলো ততই কিছু ঢ্যামনা সাবেক বাম মমতাকে বিপ্লবী বলশেভিক লেনিন হিসেবে হাজির করছিল।

 

সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখ, ২০১২ সাল। কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী (সিপিআইএম) নেতা ও প্রাক্তন বিধায়ক প্রদীপ তা এবং জেলা কমিটির সদস্য কমল গায়েনের নেতৃত্বে বর্ধমান শহরের দেওয়ানদিঘি এলাকায় বামফ্রন্টের ডাকা ধর্মঘটের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলে তৃণমূলের সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে। প্রাক্তন বিধায়ক প্রদীপ তা’কে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে পাথর দিয়ে থেঁতলে খুন করে। অবশ্য কমল গায়েনকে খুনিরা অল্পবিস্তর সহানুভূতি দেখিয়েছিল, তাকে পাথর দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয়নি, তাকে কুপিয়ে খুন করা হয়। এর আগের বছর ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার নির্বাচনে হেরে বিদায় নিয়েছে।

 

বামপন্থীদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে সিপিআইএমের নেতা-কর্মীদের সমানে খুন করার এই বীভৎস উৎসব তৃণমূল প্রদীপ তা ও কমল গায়েনকে দিয়ে শুরু করেনি। সেই খুনের বীভৎস উৎসব শুরু হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকতে আর যেদিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পদত্যাগ করলেন ঠিক তার পরেরদিন ১৪ মে ২০১১ থেকেই শুরু হলো বামপন্থীদের রক্তে  তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাদা কাপড় লাল রক্তে গাড়ো করার দিন। যতই মমতার শাড়ি লাল রক্তে গাঢ় হচ্ছিলো ততই কিছু ঢ্যামনা সাবেক বাম মমতাকে বিপ্লবী বলশেভিক লেনিন হিসেবে হাজির করছিল।

 

একবার মনে করুন তো, সেইসব দিনের কথা। ১৪ মে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার জোনাল কমিটির সদস্য কমরেড জিতেন নন্দীর কথা। সেদিন পার্টির কার্যালয় থেকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নৃশংসভাবে খুন করে তৃণমূলের সন্ত্রাসীরা। এই আসনে কিন্তু সিপিআইএমের প্রার্থী জয় পেয়েছিল। রাজ্য পুলিশ কোন স্তরে পোষ মেনেছিল মাত্র একদিনের মাথায়, সন্ত্রাসীরা পুলিশ, প্রশাসনকে স্রেফ তুবড়ি ফোটার মতো মনে করেছিল? তারপরের দিন ১৫ মে খুন হলেন বাঁকুড়ার কমরেড অজিত লোহার, তিনি ছিলেন স্থানীয় কমিটির সম্পাদক।

 

সেই মাসের ২৪ তারিখ বা ২৪ মে-র ঘটনাটি রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। মুর্শিদাবাদের কাপাসডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মহাবুল শেখ বামফ্রন্টের কর্মী ছিলেন, নির্বাচনে তিনি প্রচারেরও কাজ করেছিলেন। মহাবুলের ছেলে মুম্বাই কাজ করতেন, নির্বাচনের সময় তিনি গ্রামে ছিলেন। তৃণমূলের একটি বিজয় মিছিল থেকে মহাবুলের ওপর হামলা হয়। বাবাকে বাঁচাতে বুক পেতে দেয় ছেলে মোশাররফ। তৃণমূলের সন্ত্রাসীরা মোশাররফকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে, মহাবুলও নিহত হন।

 

এরকম কতগুলো ঘটনার বর্ণনা দিলে সেই সংখ্যা দিয়ে ২৫০ বা তারও অধিক গিয়ে ঠেকবে? সিপিআইএমের কর্মীদের ঘরের ভেতর আটকে আগুনে পুড়িয়ে জীবন্ত দাহ করেছে তৃণমূল। বাঁকুড়ার সমীর নাগ, বর্ধমানের পূর্ণিমা ঘড়ুই, পশ্চিম মেদিনীপুরের আনসার খাঁ বা উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া এলাকার অমিয় মহলদার ও বিমলা মহলদার দম্পতির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা কি নিশ্চিতভাবেই বিস্মৃত হয়েছে, তাদের ঘরের ভেতর আটকে জীবন্ত চিতার ছাইয়ে পরিণত করেছিল তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। এসব মানুষের মৃত্যুর একমাত্র কারণ তারা ছিলেন বামপন্থী। এভাবে মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, হুগলি থেকে খোদ কলকাতা বামপন্থীদের রক্তে ভেসে গেল। আর ক্রমশই একদল তেল চিটচিটে বিশ্রী অভদ্র, ইতর, নিজেদের কবি, গায়ক, সুশিল, বুদ্ধিজীবী দাবি করা বাঙালী মমতাকে লেনিন বলা শুরু করলো।

 

তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে প্রথম ৫ বছর বিরোধী দল ছিল সিপিআইএম ও বামফ্রন্ট। এরপরেই বিরোধী দলের আসন জায়গা করে নেয় বিজেপি। শাসক তৃণমূল সরকার বিজেপিকে নিশানা করেনি, করেছে বামপন্থীদের বিশেষত সিপিআইএমের নেতা-কর্মীদের। ২০১১ থেকে ২০২১ সালের ভেতর সিপিআইএমের অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ নেতা-কর্মী খুন হয়েছে তৃণমূলের হাতে।

 

বিজেপি বিরোধী দলে থাকলেও মামলা হয়েছে সিপিআইএমের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। রাজ্যের প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি বাম কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দিয়েছে তৃণমূল সরকার। ৬০ হাজার বাম নেতা-কর্মীকে ঘরছাড়া করেছে তৃণমূল; এসব বাম কর্মীদের চাষের জমি ও ছোট ব্যবসা সব দখল নিয়েছে সরকারি দল তৃণমূল।

 

সিপিআইএম যাতে সংগঠন গড়ে তুলতে না পারে, পার্টির কর্মকাণ্ড না চালাতে পারে সে জন্য সারা পশ্চিমবাংলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৫ হাজার পার্টি অফিস দখল করেছে তৃণমূল সরকার। এসব পার্টি অফিসের বড় অংশ তৃণমূলের পার্টি অফিসে পরিণত হয়েছে।

 

এরকম নজিরবিহীন সন্ত্রাস ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আমলেও হয়নি, এমন বাম নিপীড়ন ভারতের কোনো সরকার কোনো রাজ্যে করেনি এক বিহার ছাড়া। রাজ্যে বিরোধী দল বিজেপি কিন্তু হামলা, মামলা ও খুনের শিকার হচ্ছে বামপন্থীরা। এর কারণ, বামদের শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্র সংগঠন বেশ শক্তিশালী। তারা অন্তত মাঠে নামার সাহস ও ক্ষমতা এবং কৌশল জানে। বাম ঠেকাও একটা সর্বান্তকরণ চেষ্টা গত ১৫ বছর তৃণমূল সরকারের ছিল। বিজেপি ঠেকাও এরকম কোথাও দেখা যায়নি।

 

অন্যদিকে বিজেপিকে বেড়ে ওঠার সকল সুযোগ দিয়েছে তৃণমূল।  লুটেরা, চরম ঘৃণ্যবাদী একটি দল কতদিন টিকে থাকতে পারে শুধু হিন্দু মৌলবাদের ভয় দিয়ে? কতদিন, কত বছর? আর আদৌ কি তৃণমূল বিজেপিকে আটকাতে চেয়েছিল?

 

বিজেপির নেতারা তো বলেছিল— সিপিআইএমের বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জি হলো আমাদের দুর্গা। বামপন্থী আন্দোলন বিরোধী সেই জোটে কে ছিল না? বিজেপি, কংগ্রেস তো ছিলই, সাথে সোসালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট) বা এসইউসিআই (কমিউনিস্ট), সিপিআইএম লিবারেশন থেকে শুরু করে মাওবাদীরা পর্যন্ত। তাতে কি লাভ হলো বিপ্লবীদের আমি জানি না। কিন্তু আমি দেখলাম, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল খ্যাত লালগড়, জঙ্গলমহল থেকে মাওবাদীদের নির্মূল করা  হলো। যে মাওবাদীদের হাতে অসংখ্য সিপিআইএমের নেতা-কর্মী খুন হয়েছিল তারাই একের পর এক খুন হতে শুরু করলেন তৃণমূল সরকারের জমানায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। মাওবাদীদের মুখপাত্র ও পার্টির শীর্ষ নেতা  কিষাণজী খুন হলেন। তিনি নিহত হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক ব্যানার্জি জঙ্গলমহলে ২০১৫ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিম মেদিনীপুরের বিনপুরে একটি সভায় বলেছিলেন কিষাণজীকে তৃণমূল সরকারই এনকাউন্টারে হত্যা করেছে।

 

আর এখন তো সারা ভারত থেকেই মাওবাদীদের নিকেশ চলছে। কংগ্রেসের লাভ হয়নি, তারা একদম উচ্ছেদ হয়েছে। শিবদাস ঘোষের অনুসারী এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) যতখানি ইজ্জত ও বিপ্লবী আবেশ তৈরি করতে পেরেছিল বামফ্রন্টের আমলে সেটা এখন আর শোনা যায় না, পশ্চিমবাংলা থেকে শীবদাস ঘোষের অনুসারী ধুয়ে মুছে ছাফ হয়ে গেছে। সিপিআইএম লিবারেশন বা অন্যদের কথা কী বলব এখন  তাদের আর কোনো বিপ্লবী বানী শোনা যায় না।

 

সিপিআইএমকে হটাতে গিয়ে সিপিআইএম বিরোধী বামপন্থীরা একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সিপিআইএমের তবুও তো ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক সংগঠন আছে; তারা ব্রিগেড সমাবেশ ডাকলে এখনো কানায় কানায় ভরে যায়, তাদের ছাত্র যুব নেতারা এখনো মাঠে আন্দোলন জমাতে পারে কিন্তু বামপন্থী বিরোধী বামেরা কোথায়? তাদের তো কোনো চিহ্নই নেই। ‘তাহাদের আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না।’

তৃণমূল কী আসলেই বিজেপি বিরোধী ছিল?

 

তৃণমূলের নেতারা দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে পশ্চিমবাংলার বিজেপি গড়ে তুলেছে। তৃণমূলের যেসব নেতারা গেছেন তারা অন ক্যামেরায় ঘুষ নিয়েছেন, চরিত্রের বিচারে কত নিকৃষ্ট নেতা। সেই নেতা যদি মুখ্যমন্ত্রী হয় তাহলে গোপন ঘুষের কারবারি মমতা ব্যানার্জির আজ বেশ ভালোই লাগার কথা যে, তার শিক্ষায় শিক্ষিত নেতা আজ চিন্তার এলিট রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (হতে যাচ্ছেন হয়তো)। মূল প্রশ্ন হলো, তৃণমূল কি সত্যি কখনোই বিজেপিকে আটকাতে চেয়েছে?

 

গণমাধ্যম ও রাজনীতির বিশ্লেষক হিসেবে, আমি ফল দেখে গাছের নাম বলতে চাই। বিজেপি আরএসএস-এর আদর্শে পরিচালিত প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ‘সরস্বতী শিশু মন্দির’ এবং ‘সরস্বতী বিদ্যা মন্দির’ এটি আরএসএসের সংগঠন। এই স্কুলগুলোর মূল কাজ হলো শিশুকাল থেকে বাচ্চাদের বিজেপির ফ্যাসিস্ট মাইন্ডসেট গড়ে তোলা, যাকে সহজভাবে ব্রেনওয়াশ করা বলে। এই বিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মানুষ পরিণত হয় একটি জেনোফোবিক মানুষ হিসেবে, যার ভেতর মায়া-প্রেম-ভালোবাসার বদলে তৈরি হয় মুসলমান ঘৃণা। এই ধরনের ঘৃণাবাদী শিক্ষা প্রদানকারী স্কুল সিপিআইএম তাদের আমলে অনুমতি দেয়নি, এই আদর্শিক স্কুল বামেরা গড়তে দেয়নি। বামপন্থীদের হেরে যাওয়ার পর আরএসএসের দুর্গা মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সরকার গত ১৫ বছরে এই স্কুলের অনুমতি দেওয়া শুরু করেছে। বলা হয়, পশ্চিমবাংলায় আরএসএসের ‘সরস্বতী শিশু মন্দির’ এবং ‘সরস্বতী বিদ্যা মন্দির’ নামের স্কুল আছে ১০০০। তাহলে কারা পশ্চিমবাংলায় বিজেপির ভিত গড়ে দিয়েছে? আরএসএসের দুর্গা মমতা ব্যানার্জি বিজেপিকে একদম আদর করে পুষেছে, এমনকি বিজেপিতে তিনি নেতাও সাপ্লাই দিয়েছেন। এসব স্কুল উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে।

 

পশ্চিমবঙ্গে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) এবং প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ (টেট) পরিচালিত নিয়োগ পরীক্ষা প্রতিবছর নিয়ম করে হতো। বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও এই নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে এমনটি বিরোধী দল কখনোই দাবি করেনি। এমনকি মমতা ব্যানার্জি যখন চুন থেকে পান খসলে সড়কের ওপর বসে পড়তেন, তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রাজ্যসভায় কিংবা রাজপথে অথবা গণমাধ্যমের সামনে বামফ্রন্ট সরকারের এসএসসি ও টেট নিয়োগে দুর্নীতি হচ্ছে এমন দাবি করেন নাই।

 

বামফ্রন্ট সরকার চলে যাবার পর রাজ্যে নতুন চাকরির সংস্থান করতে পারে নাই মমতা ব্যানার্জির সরকার। একমাত্র সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই চাকরি ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত বেকারের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নও ভেস্তে গেল যখন দেখা গেল, এই দুই চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ ও দুর্নীতি হয়েছে শত শত কোটি টাকা। ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অধিকাংশই চাকরি পেয়েছে। এরপর বিষয়টি আদালতে গড়ালে সেখানে বছরে বছরে হওয়া এসএসসি ও টেট পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে দিনের পর দিন আন্দোলন হয়েছে খোদ কলকাতায়। যারা ঘুষ নিয়ে চাকরি দিয়েছে তারা ছিলেন মমতার কাছের লোক।

 

একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলকে বাড়তে দেওয়ার পানি, সার, ওষুধ এবং নিড়ানি সবই দিচ্ছে মমতা ব্যানার্জি; সঙ্গে বামপন্থীদের ওপর দমন-নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে রাজ্যটিকে আড়াআড়ি সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভেঙে ফেলার যে বিজেপির প্রয়াস তাতে ঘি ঢেলেছেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মুখোমুখি করার এই অপরাজনীতি মমতা ব্যানার্জি ও তৃণমূল বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করেছেন।

 

কোথাও রমজান মাসে ইফতারির মাহফিল হচ্ছে মমতা সেখানে চলে যাচ্ছেন। মাথায় বড় ঘোমটা দিয়ে দুহাতে দোয়া পড়ছেন। এসব যে রীতিমতো মাথামোটা কাজ এটা বোঝার মতো জ্ঞান ওনার ও ওনার পার্টির ছিল না এটা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায়। আর সাথে পেয়েছিলেন আশ্চর্য এক তেলমর্দনকারী সভাসদ। যারা মনে করতেন (আজ থেকে করবেন কিনা জানি না) মমতার নামে কলকাতায় মন্দির হওয়া উচিত। তাদের প্রধান ছিলেন গায়ক কবির সুমন।

 

কবির সুমন মাথায় বড় একটা টুপি পরে লম্বা চওড়া যে বক্তব্য দিতেন তার ভেতর বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই কবিরপন্থীদের চোখে মমতা ছিলেন লেনিন, তারা বলতেন পাছায় লেনিন থাকার চেয়ে বুকে মেরি থাকা ভালো। কোনটা যে ভালো না সেটা বোঝা এবং পালন করার মতো তারা লোক ছিল না। তারা ছিল মূলত অ্যাটেনশন সিকার এবং সমাজের সেই অংশ যাদের কখনোই ভাতের কষ্ট হয়নি। তারা মনে করছেন ভাতের কষ্টের চেয়ে তাদের কবিতা লেখার কষ্ট বোধ হয় অনেক মূল্যবান। যদিও তাদের প্রধান শ্রোতা ও পাঠক ছিল খোদ বামপন্থীরাই।

বিজেপির জয়ের পর সঙ্গত কারণেই বামদের ওপর আক্রমণ কমবে না, বরং বাড়বে।

 

কিন্তু তাতে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। বরং এটা সাপে বর হবে। ফলে আজ যখন মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস হেরে গেছে এবং বিজেপির সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে তখন সব বাঙালি প্রগতিশীলকে দেখছি কেঁদেকেটে ভাসিয়ে দিচ্ছে। মনে হয়, বাঙালির সর্বনাশ হয়ে গেছে বিজেপি ক্ষমতায় এসে। বাঙালীকে আজীবন প্রগতিশীল থাকার মেহনত করে যেতে হবে, কিন্তু সেই মেহনতের জন্য তারা মে দিবসেও একটি ধন্যবাদ পাবে না।

 

 

বিজেপির দুর্গা মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসেছে সেই ২০১১ সালের ১৩ মে, দুর্গাবাহিনীর বাকি সদস্যরা আজ মসনদ পেল এই যা ফারাক।

 

বরং বামপন্থীদের জন্য দুর্দান্ত একটা কাজ হয়েছে। তাদের দুই ফ্রন্টে লড়াই করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। কেন্দ্রে বিজেপি আর রাজ্যে তৃণমূল— এই লড়াইটা তাদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। এবার লড়াই সহজ; কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই শত্রু। এখন আর বিজেপির ভয় দেখিয়ে তৃণমূলকে জেতাও, বামদের ভোট দিলে বিজেপি জিতবে এই ন্যারেশনের দিন শেষ। বরং এখন নতুন লড়াইয়ের দিন শুরু, যে তৃণমূলকে ভোট দিলে বিজেপি আরও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে। এমনিতেই দেখার খুব ইচ্ছে যে, তৃণমূলের কয়জন বিধায়ক শেষ পর্যন্ত তৃণমূলে থাকে আর কয়জন মূল পার্টি বিজেপিতে যোগ দেয়।

 

আর বাংলাদেশের মানুষের এত আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। কারও যদি বেশি আতঙ্ক লাগে তার উচিত রাজনৈতিক দলে নাম লেখানো। নিজের রাজনীতি দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করুক তিনি। বেহুদা আতঙ্ক সমাজে উৎপাদন করার অর্থ গোপনে কোনো না কোনো রাজনীতির পক্ষে সম্মতি আদায় করা।

__

লেখক:  সম্পাদক, ঢাকা পেপার্স

ইমেইল: [email protected]

 

শেয়ার করুন: