প্রান্তিকের দোহাই এবং ভীরু “পেটি-বুর্জোয়া”র দুশ্চিন্তা


ঢাকা পেপার্স গ্রাফিক্স
একদল সংস্কৃতির নামে নারীকে কামনার বস্তু বানায়, আরেকদল প্রান্তিকের অধিকার রক্ষার বাহানায় ধর্মান্ধ ধর্ষক ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে ভয় পায়। যখন সমাজ এক চরম নৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে, তখন এই প্রতিবাদহীন, মেরুদণ্ডহীন সুশীলদের পেটি-বুর্জোয়া “দুশ্চিন্তা”কে লাথি মেরে ভাঙতে হবে।
ফিরোজ আহমেদ কী চমৎকার তত্ত্ব দিলেন যে "জনতা-আলেম মুখোমুখি হওয়া হয়তো সমাজের জন্য ভালো না"। শোষিত আর প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার মহান ব্রত নিয়ে যারা মাঠে নেমেছিলেন, তারা আজ সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার, বিকৃত আর ধর্মান্ধ শক্তিকে আড়াল করার তাত্ত্বিক ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি যখন প্রকাশ্য আস্ফালন করে, তখন এই প্রগতিশীলতার লেবাসধারী তাত্ত্বিকেরা পরোক্ষভাবে তাদেরই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে দেন। ১৭ এপ্রিল ২০১৭-তে সলিমুল্লাহ খান বলেছিলেন, “মাদ্রাসা শিক্ষার লোকেরা লেখাপড়া জানে না এমন প্রচারণা ঠিক নয়। বরং আমি চ্যালেঞ্জ করব আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ জন অধ্যাপকও পাবেন না যে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সঙ্গে যুক্তি-তর্কে পারবেন।” সেই “চ্যালেঞ্জ” ছুড়ে দেওয়া ডায়ালগ আজ হয়তো টঙ্গীর কোনো অন্ধকার মাদ্রাসার কামরায় বসে কোনো বিকৃতাচারী শিক্ষকের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে।
যখন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে যৌন নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে একজন সাহসী পিতা এক ধর্মব্যবসায়ী ইতরকে কষে থাপ্পড় মারেন, এবং তার বদলে উল্টো পিতার বিরুদ্ধেই ভুয়া মামলার খড়্গ নেমে আসে, তখন একজন ফিরোজ আহমেদের মাথায় কোনো দ্রোহ বা প্রতিবাদের “চিন্তা” ঢোকে না, ঢোকে এক ভীরু পেটি-বুর্জোয়া মার্কা “দুশ্চিন্তা”। তিনি কাঁপতে কাঁপতে নিদান দেন, "জনতা-আলেম মুখোমুখি হওয়া হয়তো সমাজের জন্য ভালো না।" কী অপূর্ব আপসকামিতা। আপামর জনতা যখন শিশুদের ওপর ধারাবাহিক যৌন নির্যাতনে ক্ষুব্ধ, রুখে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়, তখন এই তাত্ত্বিকেরা শান্তির বাণী শোনান। আসলে জনতা আর আলেম মুখোমুখি হয়নি, মুখোমুখি হয়েছে ফিরোজ আহমেদের তাত্ত্বিক ভণ্ডামি আর তার মনগড়া কাপুরুষোচিত প্রশ্ন। প্রতিবাদের আগুন নেভাতে এদের এই তথাকথিত 'উদারপন্থী' অবস্থান আসলে উগ্রবাদেরই সবচেয়ে বড় সেবাদাস।
অন্যদিকে আছেন “শিল্পের জন্য শিল্প” বা কলাকৈবল্যবাদের পূজারিরা। ২০১৯ সালেও আমরা দেখেছি, আলোকায়নের অগ্রদূত সাজা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কীভাবে নারীর পরিধেয় বস্ত্র “শাড়ি” আর নারী শরীর নিয়ে এক অদ্ভুত কামুক “সৌন্দর্যতত্ত্ব” হাজির করেছিলেন। নারী শরীরকে কতটুকু ঢাকলে আর কতটুকু অনাবৃত রাখলে দর্শকের চোখে “শারীরিক মোহ” আর “রহস্যচকিত” ভাব বজায় থাকবে, তার এই নন্দনতাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ আসলে পিতৃতান্ত্রিক লোলুপতারই এক পরিশীলিত রূপ। উঁচু-নিচু ঢেউ আর তন্বী রূপের খোঁজে ব্যস্ত এই মনস্তত্ত্ব আর টঙ্গীর সেই লম্পট শিক্ষকের লোলুপ দৃষ্টির মধ্যে দূরত্বটা কেবল শব্দের চাতুর্যের, মানসিকতার নয়।
থিওফিল গতিয়ে থেকে রবীন্দ্রনাথ: ভোগ বনাম শক্তির সুষমা
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই উদারনীতিক সুশীলদের সাথে ওই ধর্মান্ধ মাস্তানদের “নারী প্রশ্নে” কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। এদের সবার কাছেই নারী দিনশেষে একটা “ভোগ্য পণ্য”। একজন নন্দনতত্ত্বের নামে শাড়ির আড়ালে নারীর শরীরী মোহ খোঁজেন, আরেকজন ধর্মের লেবাসে ক্ষমতার জোরে অপ্রাপ্তবয়স্কের শরীর গ্রাস করতে চায়। ফরাসি সমালোচক থিওফিল গতিয়ে যখন বলেন, একটি সুন্দরী নারীকে বিবস্ত্র দেখতে তিনি ফরাসি নাগরিকত্ব বিসর্জন দিতে পারেন, তখন আসলে স্পষ্ট হয়ে যায় নিজের সমাজ ও নারীর প্রতি কতখানি নেতিবাচক ও অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি এরা লালন করেন।
অথচ এই একই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “জাপানযাত্রীর ডায়েরি”তে হংকং বন্দরে ডকমজুরদের দেখে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সুষমাবদ্ধ চেতনার পরিচয় দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং কায়িক পরিশ্রমে লিপ্ত চীনা মজুরদের পেশিবহুল, মেদহীন দেহের কর্মচাঞ্চল্য দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন কাজের কাব্যের সাথে মানুষের শরীরের নিখুঁত ছন্দ। শক্তির সাথে সুষমার এই যে মহৎ সংগতি, যা মানবদেহকে কেবল মাংসের স্তূপ না বানিয়ে শক্তির বীণাযন্ত্র করে তোলে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি এই সুবিধাবাদী তাত্ত্বিকদের মগজে কোনোদিন ঢুকবে না।
সময় এসেছে এই দ্বিমুখী বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ উন্মোচিত করার। একদল সংস্কৃতির নামে নারীকে কামনার বস্তু বানায়, আরেকদল প্রান্তিকের অধিকার রক্ষার বাহানায় ধর্মান্ধ ধর্ষক ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে ভয় পায়। যখন সমাজ এক চরম নৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে, তখন এই প্রতিবাদহীন, মেরুদণ্ডহীন সুশীলদের পেটি-বুর্জোয়া “দুশ্চিন্তা”কে লাথি মেরে ভাঙতে হবে। শোষকের লেবাস ধর্মীয় হোক কিংবা তাত্ত্বিক, প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে, কোনো তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় পা দিয়ে নয়।
-- --
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।


