নজরুল ও সুইটির বিচারিক হত্যাঃ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়

মাহাথির মুহাম্মদ
মাহাথির মুহাম্মদ
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৫৬পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
নজরুল ও সুইটির বিচারিক হত্যাঃ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়
শেয়ার করুন:

নিউইয়র্ক-নিবাসী রজার খলিল, লন্ডন-ফেরত হুমায়ুন কবির, কাণ্ডজ্ঞানহীন শামা ওবায়েদ কিংবা রিয়াদ-জেদ্দার ঘুঘু আমলা দেলওয়ার হোসেন ও সাখাওয়াত হোসেন—এঁরা কেউই এই মাটির খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি নন। এঁদের অপদার্থতা ও অপরাধমূলক অবহেলায় সুইটি ও নজরুল খুন হয়েছে।

​টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মাটি কাটা শ্রমিক মো. ফজল মিয়ার বাড়ির উঠানে বসে তাঁর স্ত্রী জহুরা বেগম যখন বুক চাপড়ে কাঁদছেন আর বলছেন, "মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না... আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম"—ঠিক তখন ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লবিতে সুট-টাই আর দামি সুগন্ধির বাহার দেখে কে বলবে যে এটা ফজল মিয়ারই দেশ?


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার বৃদ্ধ কৃষক আবদুল বাছির, যিনি নিজে ২৪ বছর সৌদির মরুভূমিতে ঘাম ঝরিয়েও সংসারের অভাব ঘোচাতে পারেননি; শেষে ৬ লাখ টাকা চড়া সুদে ঋণ করে ২০২২ সালের নভেম্বরে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে পাঠিয়েছিলেন মক্কায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজে। আজও সেই ঋণের সাড়ে ৪ লাখ টাকা শোধ হয়নি, অথচ সেই ঋণগ্রস্ত বাবার কানে এসেছে ছেলে নজরুলের কাটা মাথার খবর। যে খবর শুনে গত ১৪ অক্টোবর রাত দুইটায় নজরুলের পঁয়ষট্টি বছর বয়সী ফুফু আবেদা বেগম কলিজা ফেটে মূর্ছা গিয়ে সেখানেই মরে গেছেন।

এদিকে টাঙ্গাইলের গরীব ঘরের মেয়ে সুইটি আক্তার—অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় যার বিয়ে ভেঙেছিল, আর দ্বিতীয় স্বামী যাকে ফেলে রেখে সৌদি যাওয়ার পর আর কখনো যোগাযোগ করেনি। 

সুইটি তার নয় বছরের খুকি মেয়েটাকে বোনের কাছে রেখে তিন বছর আগে সৌদি গিয়েছিল মাটি কাটা বাবার সংসারের অভাব ঘোচাতে, আর নিজের মেয়েটাকে মানুষ করতে। 

শুনলে শিউরে উঠতে হয়, গত ১৪ অক্টোবর বুধবার যখন মক্কার বধ্যভূমিতে জল্লাদের তলোয়ার সুইটির গর্দান নামিয়ে দেয়, তার ঠিক আগের দিন ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পরও সুইটি কারাগার থেকে তার বৃদ্ধ বাবা ফজল মিয়ার সাথে ফোনে কথা বলেছিল। একটিবারের জন্যও মেয়েটা তার মাটি দিন মজুর বলেনি যে কাল সকালেই তার গলা কেটে ফেলা হবে! কেন বলেনি জানেন? কারণ সুইটি জানত, তার মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনলে তার অসহায় বাপটা হয়তো কলিজা ফেটে করে মরে যাবে, আর টাঙ্গাইলের দিনমজুর বাপের কিই বা করার সামর্থ্য আছে?

​কিন্তু সুইটির বাবার সামর্থ্য না থাকুক, আমাদের তো একটা রাষ্ট্র ছিল? আমাদের তো রিয়াদে একটা বিশাল দূতাবাস আর জেদ্দায় একটা কনস্যুলেট জেনারেল ছিল? আমাদের প্রবাসীদের রক্ত-ঘামের টাকায় গড়া হাজার হাজার কোটি টাকার 'ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড' ছিল? তারা কী করেছে?


আজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর দূতাবাসের কর্তারা মিডিয়ার সামনে বলছেন, সৌদি সরকার নাকি তাদের কিছুই জানায়নি! হ্যাঁ, মৃত্যুদণ্ডের কথা জানায়নি, যেটা ভিয়েনা সনদের লঙ্ঘন।  কিন্তু সেটা তো সৌদির দোষ। সৌদিতে যে একটা অসভ্য, বর্বর, মানবতাবিরোধী, জালেম শাসন ব্যবস্থা চলে এটা সারা দুনিয়ার লোকেই জানে। আজকের আলাপ সৌদিকে নিয়ে নয়। 

আলাপটা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে নিয়ে।  গত ১৮ অক্টোবর জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি 'গোপনীয়' চিঠি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমস্ত অজুহাতকে উলঙ্গ করে দিয়েছে। সেই গোপন নথির ছত্রে ছত্রে লেখা আছে কীভাবে বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্রটি ঠান্ডা মাথায় নজরুল আর সুইটিকে খুনের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​চিঠির তথ্য দেখুন—নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার সৌদির 'আল মাজাল' কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। নজরুলকে সৌদি পুলিশ আটক করেছিল ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায়, আর পরদিন ২০২৩ সালের ২ আগস্ট সুইটিকে আটক করা হয় ব্যভিচারের অভিযোগে। নজরুল বন্দি ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে, আর সুইটি ছিলেন জেদ্দা নারী কারাগারে। অর্থাৎ এক দিন বা দুই দিন নয়—টানা ৩৮ মাস বা তিন বছরেরও বেশি সময় এই দুটি ছেলে-মেয়ে জেদ্দার কারাগারে বন্দি ছিল! এই তিন বছরে সৌদির নিম্ন আদালতে তাদের বিচার হয়েছে, এরপর ১৩ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আপিল প্যানেলে মাসের পর মাস শুনানি চলেছে,  এমনকি বিচার চলাকালে জেদ্দার আদালতে বাংলাদেশেরই দুজন বিশিষ্ট নাগরিক দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন।

​সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক ১৪ দিন আগে—গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে—সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের হাতে কারাবন্দিদের একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা তুলে দেয় । সেই তালিকায় ৩০৬ জন বন্দির মধ্যে ১৪৭ জনের সাজার মেয়াদ লেখা থাকলেও, নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নামের পাশে সাজার ঘরটি রহস্যজনকভাবে ফাঁকা রাখা হয়েছিল।  যেখানে সাইবার অপরাধ বা ব্যভিচারের মামলায় সৌদিতে আগে কখনো কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড হয়নি, সেখানে তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও এবং সাজার ঘর উহ্য থাকা সত্ত্বেও ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এই দীর্ঘ ১৪ দিনে জেদ্দা কনস্যুলেটের একজন কর্মকর্তাও কারাগারে গিয়ে বা সৌদি দপ্তরে যোগাযোগ করে জানতে চায়নি—নজরুল আর সুইটির কপালে কী ঘটতে যাচ্ছে!

​তিন বছরে একটি পয়সা খরচ করে তাদের জন্য কোনো সলিসিটর বা আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। একটিবারের জন্যও কূটনৈতিক চ্যানেল খুলে সৌদি সরকারের সাথে দেনদরবার করা হয়নি। অথচ এই ঘটনার মাত্র তিন দিন পর, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আমাদেরই প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা সরকারের সরাসরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে ও অনুরোধে সৌদি আরব এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে (প্রথম আলো)! শ্রীলঙ্কা তার নাগরিককে জল্লাদের তলোয়ারের নিচ থেকে বাঁচিয়ে আনতে পারল, আর আমাদের দূতাবাস ১৮ অক্টোবরের গোপন চিঠিতে নিজেদের চামড়া বাঁচাতে নির্লজ্জের মতো লিখল—"মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনগত সহায়তার জন্য কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি, কোনো যোগাযোগ করা হয়নি"! 


ছিঃ!  লজ্জা করে না আপনাদের এই কথা লিখতে? বিসিএস দিয়ে ফরেন ক্যাডার হয়েছেন, মানুষ হননি।  টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে যেই ফজল মিয়া অন্যের জমিতে মাটি কেটে ভাত খায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যেই আবদুল বাছির মহাজনের ঋণের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়—তারা জেদ্দায় গিয়ে ইংরেজি-আরবিতে আবেদনপত্র লিখে আপনাদের ঘুম ভাঙাবে? তবে আপনারা মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন, বৈদেশিক ভাতা আর পাজেরো গাড়ি হাঁকান কোন কার টাকায়? আপনাদের বাপের টাকায় নাকি এদেশের জনগণের টাকায়?

সত্যি কথাটা হলো—নজরুল ও সুইটিকে শুধু সৌদি সরকার মারেনি; বিনা উকিলে, বিনা কূটনৈতিক তদবিরে ৩৮ মাস কারাগারে ফেলে রেখে তাদের ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে বাংলাদেশ সরকার নিজে!

​আর এই ঠান্ডা মাথার খুনের রক্ত কেবল এক সরকারের হাতে লাগেনি—এই খুনের সাথে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর—এই ৩৮ মাসের টাইমলাইনটা একটু মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু প্রবাসীদের গলা কাটার কসাইখানায় এক চুলও পরিবর্তন হয়নি।

​প্রথমে আসুন জুলাইয়ের আগের আওয়ামী লীগ সরকারের কথায়। ২০২৩ সালের ১ ও ২ আগস্ট যখন নজরুল আর সুইটিকে মক্কা থেকে ধরে জেদ্দার জেলে ভরা হলো, তখন সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কে ছিলেন? ছিলেন সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী । কে এই জাবেদ পাটোয়ারী? ১৯৮৬ ব্যাচের পুলিশ ক্যাডার, স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক প্রধান এবং ২০১৮ সালের কুখ্যাত 'নিশিরাতের ভোটের' সময়কার পুলিশ মহাপরিদর্শক। শেখ হাসিনার গদি রক্ষার পুরস্কার হিসেবে ২০২০ সালে তাকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয় এবং ২০২৩ সালের নভেম্বরে তার চুক্তির মেয়াদ আরও দেড় বছর বাড়ানো হয় । সে সময় জেদ্দায় কনসাল জেনারেল ছিলেন আওয়ামী আমলের আরেক অনুগত আমলা মুহাম্মদ নাজমুল হক। নজরুল ও সুইটি গ্রেপ্তারের পর পুরো এক বছর এই জাবেদ পাটোয়ারী রিয়াদের দূতাবাসে বসে ছিলেন। দেশের গরিব শ্রমিকের জন্য উকিল দেওয়ার কথা তারা ভাবেন নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ১৫ আগস্ট যখন তাকে ঢাকায় তলব করা হলো,  তখন এই সাবেক পুলিশপ্রধান সরকারি আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সৌদি আরব থেকে সোজা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেলেন , এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হয়।

​কিন্তু জুলাইয়ের রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের পর যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তীতে তারেক রহমানের বর্তমান বিএনপি সরকার গদিতে বসল, তখন কী হলো? জাবেদ পাটোয়ারী পালানোর পর কয়েক মাস রিয়াদ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন মো. আবুল হাসান মৃধা, যাকে পরে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত বানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউনূস সরকার সৌদি আরবে ১৬তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিল ১৭তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. দেলওয়ার হোসেনকে।  কে এই দেলওয়ার হোসেন? ইনি সেই চিরস্থায়ী আমলাতন্ত্রের প্রতিভূ, যিনি ২০২১ সালে শেখ হাসিনার আমলেও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন , ইউনূস আমলে পেলেন সৌদি আরবের গদি, আর তারেক রহমানের বিএনপি সরকারেও বহাল তবিয়তে রিয়াদের দূতাবাসে বসে আছেন!  একইভাবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেদ্দায় কনসাল জেনারেল করে পাঠানো হলো ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আয়েশি জীবন কাটানো আমলা মো. সাখাওয়াত হোসেনকে । ইউনূসের ১৮ মাস আর তারেক রহমানের ৮ মাস—এই দীর্ঘ সময়ে দেলওয়ার হোসেন, আবুল হোসেন মৃধা আর সাখাওয়াত হোসেনরা রিয়াদ-জেদ্দায় বসে রেমিট্যান্সের হিসাব গুনেছেন, অথচ সুইটি-নজরুল এর জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করেন নি। কেজানে, হয়তো আইনজীবী নিয়োগের কথা কাগজে দেখিয়ে সেই টাকা মেরে দিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে আইনজীবী নিয়োগ করেন নি! সেই টাকা হয়তো পাচার করেছেন সুইস ব্যাংকে, বেগম পাড়ায়।

​এবার তাকানো যাক ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে—যেখানে বসে আছেন এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের তিন প্রধান কুশীলব! সুইটি-নজরুলের তিন খুনি।

এক নম্বরে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ওরফে 'রজার খলিল' বা 'রজার রহমান। কে এই রজার খলিল? 

১৯৭৯ ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তা জীবনের তিন দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও জেনেভায়; নিউইয়র্কের স্কারসডেলে ২৬ বছর ধরে বসবাস করা এই ভদ্রলোক ফেসবুকে নিজের নাম নিয়েছিলেন 'রজার রহমান'। আশির দশকে নিউইয়র্ক মিশনে থাকাকালে এই রজার খলিল, যিনি স্বৈরাচার এরশাদের শ্যালক মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ব্যাগ বহন করে নিজের আখের গুছিয়েছিলেন, ২০০১ সালে ভায়রা ভাই প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের আমলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই প্রমোশন বাগিয়ে একান্ত সচিব হয়েছিলেন এবং সচিবালয়ের এক নারী কর্মকর্তার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কেলেঙ্কারির পর দেশ ছেড়ে উড়াল দিয়েছিলেন।

আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূস তাকে প্যারাসুটে নামিয়ে প্রথমে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বানান । সবচেয়ে তামাশার বিষয় হলো, ২০২৫ সালের মে মাসে এই খলিলুর রহমানকে 'বিদেশি নাগরিক' আখ্যা দিয়ে যাকে পদচ্যুত করার দাবি তুলেছিলেন খোদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ , ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই ইউনূস-ঘনিষ্ঠ রজার খলিলকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় বানিয়ে দিলেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ! আর মন্ত্রী হয়ে রজার খলিল কী করলেন? বাংলাদেশের গরিব প্রবাসীদের বাঁচানোর বদলে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের মুকুট পরতে—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হওয়ার জন্য লন্ডন, বেইজিং, মস্কো চষে বেড়ালেন এবং গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে সভাপতির গদিতে বসেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটি ছাড়লেন না! নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বসে বিশ্বশান্তির গালভরা বুলি আওড়ানো এই 'রজার খলিল' এক সাথে দুই গদির মধু খাচ্ছেন, অথচ মক্কায় তাঁর দেশের দুটি সন্তানের গলা কেটে ফেলা হলো, তাঁর দপ্তর টেরও পেল না!

​দুই নম্বরে ধরুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলামকে । বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও মন্ত্রী প্রয়াত কে এম ওবায়দুর রহমানের কন্যা, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ফিনিক্স থেকে ডিগ্রি নেওয়া, আমেরিকার ফার্স্ট ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং দেশের বাঘা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী শোভন ইসলামের স্ত্রী। কিন্তু বড় নেতার মেয়ে হওয়া আর কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করা কিংবা বড় ব্যবসায়ীর বউ হওয়া কোনটাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পদে তাকে যোগ্য করে তুলেছে?

সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হওয়া এই অভিজাত প্রতিমন্ত্রী গত ১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে সুইটি ও নজরুলের রক্তাক্ত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কী বললেন? বললেন—"সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত‍্যুদণ্ড আমাদের জন‍্য বড় শিক্ষা"!  যে দেশের দূতাবাস ৩৮ মাসে নিজের বিদেশের কারাগারে বন্দি নাগরিকদের খোঁজ নেয় না, ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সাহস রাখে না, সেই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিজের সেই সব ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অপরাধের জন্য ক্ষমা না চেয়ে উল্টো নিজের নাগরিকের কাটা মাথাকে বলছেন 'শিক্ষা'! শামা ওবায়েদদের মতো এলিটদের কাছে তো আমাদের গরিবের রক্ত কেবলই 'শিক্ষা' আর আপনাদের করমুক্ত গাড়ির জ্বালানি! কিন্তু যে এই কথা বলতে পারে সে কি আর এদেশের প্রতিমন্ত্রী হবার যোগ্য থাকে?

​তিন নম্বরে ধরুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরকে। শৈশব থেকে লন্ডনে বেড়ে ওঠা এই ব্রিটিশ প্রবাসী হুমায়ুন কবির লন্ডনে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ৫ আগস্টের পর দেশে ফেরেন; সিলেট-২ আসনে মনোনয়ন চেয়েও না পেয়ে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং গত আগস্টে সোজা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ বনে যান—সেসময় এই ব্যাক্তির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন উঠেছিল। নজরুল ও সুইটির শিরচ্ছেদের মাত্র চার দিন আগে, গত ১০ অক্টোবর এই হুমায়ুন কবির বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন—"আক্রান্ত হলে সৌদির পাশে থাকবে ঢাকা" এবং সৌদি রাজপরিবারের সাথে প্রধানমন্ত্রীর গভীর সম্পর্কের বড়াই করেছিলেন। আর ১৪ অক্টোবর যখন সৌদি সরকার আমাদেরকে একবারও না জানিয়ে যখন আমাদের দুজন ভাইবোনের গলা কেটে ফেলল, তখন ১৯ অক্টোবর এই বৃটিশ নাগরিক প্রতিমন্ত্রী সাহেব ক্যামেরার সামনে এসে অধা-বাংলা- আধা-ইংরেজির বাংরেজি ভাষায় অনেক কিছু বললেন আর সাথে বললেন—"সুইটি- নজরুলের মৃত্যুদন্ডের কারণ যদি অনৈতিক কর্মকাণ্ড হয় তাহলে এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"

বাংলাদেশের  সুইটি আক্তার আর নজরুলের উপরে সংগঠিত বিচারিক হত্যায় এমন কথা বাংলাদেশের কোন মন্ত্রী দূরের কথা, কোন বাংলাদেশী নাগরিক বলতে পারেনা।  এই কথা যে বলেছে সে আসলেই বৃটিশ নাগরিক। 

​দর্শক, জুলাইয়ের আগে শেখ হাসিনার পুলিশি রাষ্ট্রদূত জাবেদ পাটোয়ারী আমাদের ভাইবোনদের বাঁচায়নি, জুলাইয় আন্দোলনের পরে ইউনূস সাহেবের এনজিও-আমলাতন্ত্র ওদের বাঁচায়নি, আর আজ তারেক রহমানের সরকারের রজার খলিল, শামা ওবায়েদ আর হুমায়ুন কবিররাও ওদেরকে মরতে পাঠিয়ে তারপর ওদের কাটা মাথা নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করছে। 

তবে চব্বিশের জুলাইয়ে আমাদের ভাইয়েরা বুক পেতে গুলি খেয়েছিল কার জন্য? নিউইয়র্কের রজার খলিলের জাতিসংঘের সভাপতির গদির জন্য? লন্ডনের হুমায়ুন কবিরের প্রতিমন্ত্রিত্বের জন্য? নাকি শামা ওবায়েদদের নসিহত শোনার জন্য? নাকি ওইসব সুবিধাভোগী আমলাদেরকে সৌদির রাষ্ট্রদূত বানানোর জন্য? কত প্রবাসীরা নিজেদের চাকরি, জীবন তুচ্ছ করে বাংলাদেশ দূতাবাসের দিকে বিক্ষোভ করেছে; এইজন্যে? এই বদমাইশদের জন্যে?

​প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আপনি এদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। যে বিপুল গণ-সমর্থন নিয়ে আপনি ক্ষমতায় বসেছেন, আপনার শত্রুরাও আপনাকে সমর্থন দিয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবর রহমান এর পরে আপনিই সর্বোচ্চ জন-সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন। অথচ, আপনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর সৌদি দূতাবাসে যাঁদের বসিয়ে রেখেছেন—নিউইয়র্ক-নিবাসী রজার খলিল, লন্ডন-ফেরত হুমায়ুন কবির, কাণ্ডজ্ঞানহীন শামা ওবায়েদ কিংবা রিয়াদ-জেদ্দার ঘুঘু আমলা দেলওয়ার হোসেন ও সাখাওয়াত হোসেন—এঁরা কেউই এই মাটির খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি নন। এঁদের অপদার্থতা ও অপরাধমূলক অবহেলায় সুইটি ও নজরুল খুন হয়েছে। আপনার যদি এই দেশের খেটে খাওয়া প্রবাসীদের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা থাকে, তবে আজই এই অপদার্থ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দুই প্রতিমন্ত্রী এবং সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ঘাড় ধাক্কা দিন, এদের বরখাস্ত করুন এবং পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অন্য কোন যোগ্য হাতে তুলে দিন কিংবা যোগ্য কাউকে না পেলে নিজেই দায়িত্ব  নিন। 

নতুবা ইতিহাস লিখে রাখবে—জুলাইয়ের আগের অনির্বাচিত হাসিনা সরকার কিংবা জুলাইয়ের পরের মব-বাজ ইউনুস সরকারের মতোই আপনার সরকারও প্রবাসীদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে রেমিট্যান্স গোনা আরেকটি ঠান্ডা মাথার খুনি সরকার!


লেখক: কবি ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন: