কফিনবন্দি রেমিট্যান্স, ধর্মব্যবসা আর বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়

দীপ্সিতা ধর
দীপ্সিতা ধর
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৩৬পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
কফিনবন্দি রেমিট্যান্স, ধর্মব্যবসা আর বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়

ছবিঃ ঢাকা পেপার্স গ্রাফিক্স

শেয়ার করুন:

গোটা উপমহাদেশের ২১ লাখ লোক কাজ করেন গালফ দেশগুলিতে, গোটা কোভিড জুড়ে কী অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল ওঁদের তা নিয়ে লেখালেখি হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু রাজনীতির মূল এজেন্ডায় এনারা এখনো ফুটনোটও হতে পারেননি। ফুট সোলজার হয়েছেন কেউ কেউ। নানা শেডের মৌলবাদের তল্পিবাহক হয়েছেন। কিন্তু কঠোর আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের জন্য কোনো দেশে আজ অবধি মিছিল দেখি না! লাশ দেখি শুধু গুনি, ডাটা হিসাবে কম্পিউটারে তুলে রাখি।

দুটো ছেলেমেয়ে পবিত্র মসজিদে চুমু খেয়েছে এমন অপবাদে কফিনবন্দি লাশ এসেছে বাংলাদেশের উঠোনে। সৌদি সরকার এখনো বাংলাদেশ সরকারকে এঁদের দোষের বর্ণনা, অপরাধের অকুস্থল, বিচার প্রক্রিয়া বিশেষ জানাতে পারেনি। ছেলের বাপ বলতেছে এক পাকিস্তানি সহকর্মীর সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতায় নাকি তাঁর এ পরিণতি। দক্ষিণ এশিয়ার এই পারিবারিক কূটকাচালি পাশ কাটিয়ে একটু বাংলাদেশের অর্থনীতির ভাঁড়ার ঘরে উঁকি মারা যাক!


বাংলাদেশের গোটা জিডিপি-র প্রায় ৭% আসে ইন্টারন্যাশনাল রেমিট্যান্স থেকে। মানে এই ছেলেমেয়ে দুইটার মতো গরিব মুসলমান যারা কেউ মিস্তিরি, কেউ কাজের মেয়ে হয়েছে শেখদের দেশে, যারা রক্ত জল করে, ঘুপচি ঘরে ২০ জনের সাথে ঘুমায়, আধপেটা খেয়ে, টাকা জমিয়ে বাড়ির জন্য বিকাশ করে, ওদের থেকে। তাঁদের মোট পাঠানো টাকার মূল্য ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, মানে ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার কোটি ভারতীয় টাকা। সবচেয়ে বেশি প্রবাসী মজদুর থাকে সৌদিতে, তাঁদের পাঠানো টাকার পরিমাণও তাই সবচেয়ে বেশি। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৫০ জন বাংলাদেশি নারীর মৃতদেহ ফিরেছে সেই সৌদি থেকেই। এরা সবাই গৃহকর্মী। ২৫০ জন। ওদের মৃত্যুর সাথে ধর্মীয় ভাবাবেগ জড়িত ছিল না বলে সেটা আর নিউজ হয়নি তেমন। ২৫০ জন। নারী গৃহকর্মীর আত্মহত্যাতেও সৌদি এক নম্বরে। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে সৌদিফেরত নূর বলছিল, মক্কা মদিনার লোকেরা খারাপ হতে পারে না বলে সে ভাবতো, আর এখন ভাঙা পাঁজর কালশিটে নিয়ে অন্যদের সৌদি যেতে মানা করে। কত মেয়ে বাচ্চা পেটে বাংলাদেশ ফিরেছে তার গল্প শোনায়।


সেই রক্ত কান্না মাখা টাকায় পাকা বাড়ি ওঠে, বোনের বিয়ে হয়, পাড়ার মসজিদে মুক্তহস্তে দান করবার জন্য ফলকে প্রবাসীর নাম ওঠে। একদিকে গার্মেন্ট শ্রমিক আর এক দিকে প্রবাসী, বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়লা, ঘুঁটে, শুকনো পাতা হয়ে এরা উনুনে আগুন জ্বালায়, গরম ভাতের গন্ধে ম-ম করে নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনীর গ্রামের পর গ্রাম। টাকা বাঁচাতে বছরের পর বছর প্রবাসে থাকে ছেলে, কাফিল পাসপোর্ট কেড়ে নেয়, নির্যাতন করে, প্রবাসীরা কাঁদে না। পাশের জমি কিনেছে আগের বছর, দেনা মাথায়, টাকা ধার করে দুবাইয়ের টিকিট কেটেছিল, তার টাকাও শোধ হয়নি। দেশে ফেরা যাবে না, হেরে ফেরা যাবে না। মরে ফিরলেও চলবে। হেরে ফেরা যাবে না। শুধু সৌদিতেই গড়ে ২৫০০ বাংলাদেশি শ্রমিক মারা যান প্রতি বছর, ওয়েজ আর্নারস ওয়েলফেয়ার বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী। এঁদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে কারণ হিসাবে "স্বাভাবিক মৃত্যু" দেখানো হয়। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক, গরমে মরে যাওয়া স্বাভাবিক, মাথায় চাঁই ভেঙে পড়লেও তা স্বাভাবিক।


মরে ফিরেছে কফিনবন্দি দুই মানুষ, সরকার কিছু করেনি, মুরুব্বি, জলসাওয়ালা, হুজুর, তৌহিদি জনতা বরং হাততালি দিয়েছে। ধর্ম অবমাননা? কত বড় সাহস। বেশ করেছে মেরেছে, এটাই তো সহি ধর্ম। সৌদি বাবার অপরাধ চোখে পড়ে না, পড়লেও তাও জিভ অবধি আসে না। গরিব মুসলমানের জানের দাম কম, এঁদের টাকায় মঞ্চ বেঁধে মেহফিল করা যায়, কিন্তু এঁদের হত্যায় ধার্মিকদের টুপি বাঁকা হয় না।


আজ দেখলাম যৌন হেনস্তা করা এক হুজুরকে বিরাশি সিক্কার একটা থাপ্পড় দিয়েছে নির্যাতিতা বাচ্চার বাপ। এইরম কষায়া থাবড়া না মারতে পারলে সমাজের ঘুম ভাঙে না। আসিফার খুনিরা তিরঙ্গা পায়, অঙ্কিতার খুনিরা রাজ্যপাল হয়। ঐরকম কষায়া একটা থাবড়া যদি আমরা মারতে পারতাম! ইস্কুলে, ধর্মস্থানে শিশু, বালক, মেয়েদের হেনস্তার অভিযোগ তো কম না! গোটা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ধর্মকে শিখণ্ডী বানিয়ে অধর্মের চাষ চলে। গরিব মানুষ মন্দির মসজিদ নিয়ে লড়ে, আর সরকার বাহাদুর ফাঁকতালে জল, জঙ্গল, জমি, বন্দর বড়লোক বেনিয়ার নামে লিখে দেয়। ক্ষুধায় গরিবিতে জর্জর দক্ষিণ এশিয়ার কর্মঠ শরীর তখন কাজের খোঁজে বিদেশ পাড়ি দেয়। চাচাতো ভাইয়ের পায়ে হাতে ধরে, জালি এজেন্সির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়, ডানকি পথে আমেরিকা যেতে গিয়ে জঙ্গলে মারা পড়ে, রোমানিয়া থেকে ইউরোপে ঢুকতে গেলে পুলিশে ধরা খায়, কিন্তু হাল ছাড়ে না। জেলে, রিফিউজি ক্যাম্পে মাকে মনে পড়লেই, অবিবাহিত বোনের মুখ মনে পড়ে। হাল ছাড়ে না। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিক শরীর কলমা পড়ে, গুরুগীত গায়, হনুমান চালিশা পড়ে, বা কোনোটাই করে না, হয়তো ছোটবেলার আকাশ নদীর কাছে, লাল ফিতে চুলের কাছে, সদ্য ওঠা গোঁফের কাছে, নিজের জীবনের সব নিরাপদ স্মৃতির কাছে সাহস চায়, ভরসা চায়। আরবের তপ্ত মরুভূমি, কিংবা কানাডার বরফ ঝড়ের মধ্যে বসে একদিন অনেক টাকা কামিয়ে দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখে সে। ও বোঝে না ওর স্বদেশ চুরি হয়ে যায়, ওর যৌবন, শ্রম, স্বপ্ন বিক্রি হয়ে গেছে চড়া দামে।

গোটা উপমহাদেশের ২১ লাখ লোক কাজ করেন গালফ দেশগুলিতে, গোটা কোভিড জুড়ে কী অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল ওঁদের তা নিয়ে লেখালেখি হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু রাজনীতির মূল এজেন্ডায় এনারা এখনো ফুটনোটও হতে পারেননি। ফুট সোলজার হয়েছেন কেউ কেউ। নানা শেডের মৌলবাদের তল্পিবাহক হয়েছেন। কিন্তু কঠোর আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের জন্য কোনো দেশে আজ অবধি মিছিল দেখি না! লাশ দেখি শুধু গুনি, ডাটা হিসাবে কম্পিউটারে তুলে রাখি।

কাল এক ভদ্রলোক লিখেছেন বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম আর ধর্মব্যবসার পার্থক্য ধরে ফেলেছে। আর হুজুরদের কথায় নাচে না। আমাদের দেশেও মানুষ বুঝবে, ধর্ম আর ধর্মব্যবসার পার্থক্য। কিন্তু এপারের বাঙালি এখনো একটু ঘোরে আছে, আপাতত গুজরাটি ধোকলা আর বিহার ইউপির ঠেকুয়াকে প্রসাদ ভেবে চাটছে। চাটুক, নদীমাতৃক দেশ আমাদের, গরম হইতে সময় নেয়। একটা থাপ্পড় এদের কপালেও আছে। সুভাষ বোস, মাস্টারদা, ইলা মিত্র, রোকেয়ার দেশ, একেবারে গাধার ইয়েতে চলে যাবে না! কী বলেন?


লেখক: নেত্রী, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট)

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

শেয়ার করুন: