মার্কিন চুক্তির বৈধতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন


স্কেচ: এআই
গবেষক ও বিশ্লেষকরা যেখানে বলছেন, চুক্তিটিই দেশের স্বার্থ বিরোধী, সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অহেতুক ‘দেশের স্বার্থ রক্ষার’ দায়সারা কথা বলছেন।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা প্রদান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে অন্তবর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, বিশেষ করে যখন তা সম্পাদিত হয়েছে একটি অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
অন্তবর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল সাধারণত নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু বিশ্লেষণ বলছে, সীমা অতিক্রম করে ওই সরকার এখতিয়ার বাহির্ভূতভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা প্রদান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই সিদ্ধান্তগুলো কতটা স্বচ্ছ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, চুক্তিগুলো নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা হয়নি, এমনকি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না।
চুক্তি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অবস্থান প্রথম থেকেই বিভ্রান্তিকর। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দাবি করে বলেন, ‘দেশের স্বার্থ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি বাস্তবায়ন করবে সরকার।’
তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করবে। তবে এক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা হবে।’
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গেই কিন্তু আমাদের কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ একটি এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড (রপ্তানিমুখী) দেশ। এলডিসি (লিস্ট ডেভোলপড কান্ট্রিজ) গ্রাজুয়েশনসহ সবকিছু মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে। সুতরাং চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে এবং আলোচনার ভিত্তিতেই সবকিছু হবে।’
লক্ষ্যনীয়, গবেষক ও বিশ্লেষকরা যেখানে বলছেন, চুক্তিটিই দেশের স্বার্থ বিরোধী, সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অহেতুক ‘দেশের স্বার্থ রক্ষার’ দায়সারা কথা বলছেন।
অর্থনীতিবিদ ও লেখক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘তথাকথিত বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে কার্যত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আয়োজন করা হয়েছে। শিল্প, কৃষি, জ্বালানি থেকে শুরু করে দেশের সব খাতকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থের অধীন করে ফেলা হয়েছে।
‘বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রকল্পে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত–পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে এককথায় এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী একটি চুক্তি,’ বলেন তিনি।
সিপিডি-(সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ)-এর বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণা তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।’
‘একই সঙ্গে চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে দেশের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে,’ বলেন তিনি।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিং-এ এই তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
টিআইবির ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে।’
লেখক ও গবেষক মাহা মির্জার মতে, ‘মার্কিন চুক্তি আমাদের এলডিসি (লিস্ট ডেভোলপড কান্ট্রিজ) হওয়ার সুবিধাগুলো কেড়ে নিচ্ছে। এলডিসি থাকার ফলে ডব্লিউইউটিইউ-এর আওতায় বাংলাদেশ যে সুবিধাগুলো পেয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতায় সেই জরুরি সুবিধা এবং পলিসি তৈরির সার্বভৌমত্ব নিজের ইচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে এসেছে “টিম বাংলাদেশ”। উল্টো আরও নতুন ১৫টি শর্ত ঘাড়ে করে নিয়ে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকা শর্ত, স্যাংশন, ট্যারিফ চাপাবেই। এটা আমেরিকার পুরোনো অভ্যাস।’ (প্রথম আলো, ২২ এপ্রিল ২০২৬)।
বাসদ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার একটি অনির্বাচিত সরকার। তার এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি করার কোন এখতিয়ার নাই।’
‘তাছাড়া মার্কিন ফেডারেল কোর্ট পাল্টা শুল্ক আরোপ করা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, যার সূত্র ধরে মালয়েশিয়া চুক্তি বাতিল করেছে; ভারত স্থগিত করেছে। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ও সংসদ এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা, বলেন তিনি।
‘এই অসম চুক্তি’ নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জরুরি আলোচনার দাবি জানান।
এখানে অতীত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার শাসনামলে সম্পাদিত কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে পরবর্তীতে দেখা গেছে, সেগুলোর শর্ত এতটাই জটিল যে সেগুলো বাতিল বা পুনর্বিন্যাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধরনের চুক্তি শুধু তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাবই ফেলে না, বরং ভবিষ্যতে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের দরকষাকষির অবস্থান দুর্বল করে দেয়। ফলে বর্তমান চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের চুক্তি গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত ফল নয়। বরং জনদাবির ভিত্তিতে গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নই ছিল সময়ের দাবি। এতে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হতো, যা স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারত।
এ পর্যায়ে এই বিতর্ক শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি চুক্তিকে ঘিরে নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।



