বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সামরিক ডুবোযান উদ্ধার: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

আরিফুজ্জামান তুহিন
আরিফুজ্জামান তুহিন
প্রকাশ: ৬ জুন ২০২৬, ১৪:৪৭পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সামরিক ডুবোযান উদ্ধার: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

স্কেচ: এআই

শেয়ার করুন:

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া এই গ্লাইডারটি কোনো সাধারণ বেসামরিক বয়া নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক আন্ডারওয়াটার গ্লাইডার। এটি সামরিক ও বৈজ্ঞানিক উভয় ধরনের মিশনেই সহায়তা করতে সক্ষম।

 

​গত ৩১ মে বিকেলে বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটায় জেলেরা তাদের জালে এক অপ্রত্যাশিত শিকার খুঁজে পান। বঙ্গোপসাগর থেকে তাদের জালে উঠে আসে ৮ ফুট দীর্ঘ, টর্পেডো আকৃতির একটি অচেনা চালকহীন ডুবোযান বা আন্ডারওয়াটার ভেহিকল । এর ভেতরে তারসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস রয়েছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, ডিভাইসটি ডুবোযান তৈরিতে বিশেষায়িত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘টেলিডাইন ওয়েব রিসার্চ’-এর তৈরি। এটি একটি চালকহীন আন্ডারওয়াটার গ্লাইডার, যা সমুদ্রের তলদেশে অত্যন্ত বৈরী পরিবেশে চলাচল করতে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য পাঠাতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী গত এক দশকে এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের ২১০টিরও বেশি গ্লাইডার সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশের জলসীমায় এই গ্লাইডার ঠিক কী করছিল বা কারা এটি মোয়েন করেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিশেষ এই যানটি বর্তমানে সরকারি হেফাজতে রয়েছে।

 

পাথরঘাটায় পাওয়া গ্লাইডারের গায়ে থাকা ব্যাচ নম্বর উল্লেখ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান টেলিডাইন ওয়েব রিসার্চকে ইমেল করা হয়; সেখানে জানতে চাওয়া হয় এই গ্লাইডারটির তারা কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেছে। তবে এই মেইলের কোনো জবাব দেয়নি টেলিডাইন।

 

গ্লাইডারের কন্ট্রোল মডিউল---যাকে এর ‘মস্তিষ্ক’ বলা যায়---তা কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে ঢাকা পেপার্স ডিভাইসটির একটি সিরিয়াল নম্বর সনাক্ত করেছে। পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া গ্লাইডারটির কন্ট্রোল মডিউলেলে সিরিয়াল নম্বর হলো S/N: *****। কন্ট্রোল মডিউলে গোটা ডুবোযানের অপারেটিং সিস্টেম ও ডেটা চিপ থাকে, যা অনবরত সেন্সর থেকে আসা তথ্য জমা করে। এই সিরিয়াল নম্বরটি থেকে গ্লাইডারটি মূলত কার কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছিল তা সনাক্ত করা সম্ভব। এটির বারকোড ও প্রস্তুতকারকের চিহ্ন ইঙ্গিত করে যে এটি মার্কিন ওই কোম্পানিরই একটি পণ্য।

 

টেলিডাইন ও মার্কিন নেভি

 

১৯৮০ দশকের শেষদিকে বিখ্যাত সমুদ্রবিজ্ঞানী ও গবেষক ডগলাস ওয়েব প্রথম এমন একটি ডুবোযানের নকশা তৈরি করেন, যা কোনো প্রচলিত ইঞ্জিন বা প্রোপেলার ছাড়াই সমুদ্রের নিচে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে। এই ধারণার কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পেরে মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণা শাখা---‘অফিস অব নেভাল রিসার্চ’ (সেসময় অফিস অব নেভাল টেকনোলজি নামে পরিচিত) ১৯৮৬ সালে এই প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীর বাজেট এবং সরাসরি চুক্তির অধীনে এই প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর, ১৯৯১ সালে ফ্লোরিডার ওয়াকুলা স্প্রিংস এবং নিউইয়র্কের সেনেকা লেকে এই প্রজেক্টের প্রথম সফল আন্ডারওয়াটার ডাইভিং সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ডগলাস ওয়েব এই প্রযুক্তির অফিশিয়াল ইউএস পেটেন্ট লাভ করেন। এই প্রযুক্তিটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় তৈরি হয়েছিল।

 

২০০০ সালের পর থেকে সামরিক খাতে স্লকোম গ্লাইডারের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। মার্কিন নৌবাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনের জন্য স্লকোম গ্লাইডারের সংস্করণ তৈরি করা হয়, যার মধ্যে ‘এলবিএস-জি’ (লিটোরাল ব্যাটলস্পেস সেন্সিং গ্লাইডার) প্রোগ্রাম অন্যতম।

 

অফিসিয়াল ডিফেন্স রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৯ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন নৌবাহিনীকে ২১০টিরও বেশি এই গ্লাইডার সরবরাহ করেছে।

 

সর্বশেষ ২০২১ সালের জুলাই মাসে মার্কিন নৌবাহিনী সঙ্গে টেলিডাইনের চুক্তির আওতায় মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ন্যাভাল ওশেনোগ্রাফিক অফিস’ গ্লাইডার সরবরাহ এবং উন্নত সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ সেবা নিচ্ছে।

 

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া এই গ্লাইডারটি কোনো সাধারণ বেসামরিক বয়া নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক আন্ডারওয়াটার গ্লাইডার। এটি সামরিক ও বৈজ্ঞানিক উভয় ধরনের মিশনেই সহায়তা করতে সক্ষম।

 

সক্ষমতা ও সামরিক প্রয়োগ

 

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া ডুবোযানটির বাহ্যিক অবয়ব নিরীহ মনে হলেও, এর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। সমুদ্রের গভীরে থেকে এটি এমন সব তথ্য সংগ্রহ করে, যা নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে আধুনিক নৌ-অভিযানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করতে পারে।

 

এই গ্লাইডারে অত্যন্ত সংবেদনশীল সিটিডি সেন্সর রয়েছে, যা অনবরত সমুদ্রের পানির পরিবাহিতা, তাপমাত্রা এবং গভীরতা পরিমাপ করে। এই তিনটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পানির স্তরে স্তরে লবণাক্ততার তারতম্য হিসাব করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ পরিবেশগত তথ্য মনে হলেও, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে এটি নৌ-অভিযানের জন্য তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।

 

সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততার পরিবর্তনের ওপর সরাসরি নির্ভর করে পানির নিচে শব্দের গতি। গ্লাইডারটি সাগরের বিভিন্ন গভীরতায় ডুব দিয়ে নিখুঁতভাবে এই শব্দের গতির একটি ডিজিটাল প্রোফাইল বা ম্যাপ তৈরি করে।

 

পানির নিচে যেহেতু সাধারণ রাডার বা আলো কাজ করে না, তাই সাবমেরিন বা যুদ্ধজাহাজগুলোকে সম্পূর্ণভাবে শব্দতরঙ্গের ওপর নির্ভর করতে হয়, যাকে বলা হয় ‘সোনার’ সিস্টেম। সমুদ্রের পানির নিচে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন স্তরে ‘থার্মোক্লাইন লেয়ার’ তৈরি হয়। এই লেয়ারগুলো পানির নিচে এক ধরনের সীমানা হিসেবে কাজ করে শব্দতরঙ্গকে বাঁকিয়ে বা প্রতিফলিত করে দেয়। সাবমেরিনগুলো প্রায়ই এই থার্মোক্লাইন লেয়ারের নিচে লুকিয়ে থাকে, যাতে প্রতিপক্ষ দেশের যুদ্ধজাহাজের সোনার সিগন্যাল তাদের সহজে সনাক্ত করতে না পারে।

 

এ ধরনের গ্লাইডারের অন্যতম প্রধান ব্যবহার হলো পানির নিচে অ্যাকোস্টিক অপারেশন বা শব্দতরঙ্গের গতিবিধির সাথে সম্পর্কিত পরিবেশগত ডেটা সংগ্রহ করা। এই ডেটা সাবমেরিন অপারেশন বিশ্লেষণে সহায়ক হতে পারে, যদিও এটিই একমাত্র উপাদান নয়। ওপেন-সোর্স বিশ্লেষণগুলো বলছে, এই তথ্য পাওয়ার পর নৌ-অপারেটররা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সোনারের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং পানির নিচের লক্ষ্যবস্তু সহজে সনাক্ত করতে পারে। একে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার বা সাবমেরিন শিকার।

 

এর পাশাপাশি এই গ্লাইডারের আরেকটি কাজ হলো 'ব্যাথিমেট্রি' বা সমুদ্রের তলদেশের ভূপ্রকৃতির থ্রি-ডি মানচিত্র তৈরি করা। এর গায়ে থাকা বিশেষ অ্যাকোস্টিক সেন্সর দিয়ে এটি সমুদ্রের তলদেশের পাহাড়, খাত, খাঁদ এবং মাটির গঠনের রুট ম্যাপ তৈরি করে। এই ম্যাপগুলো পারমাণবিক বা সাধারণ সাবমেরিনকে এমন পরিবেশেও চলাচলে সাহায্য করতে পারে যেখানে সরাসরি দৃষ্টিগোচর হওয়া অসম্ভব।

 

সংবেদনশীল জলসীমায় নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহে এটি সহায়তা করতে পারে, যা সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিচালনাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে। এরকম অ্যাকোস্টিক সিগনেচার বা শব্দ তৈরি না করার কারণে এটি ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে নাম, সহজেই নজরদারি চালাতে পারে, যা নৌবাহিনীর কার্যক্রমকে আরও নিখুত করে।

 

কারিগরি কার্যপদ্ধতি ও গোপনীয়তা

 

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া এই আন্ডারওয়াটার গ্লাইডারটি চলার জন্য মূলত ‘প্লবতা’ বা বুয়েন্সি পরিবর্তনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর নাকের ভেতরে একটি বিশেষ তেলের থলি এবং একটি ছোট বিদ্যুতিক পাম্প থাকে। যখন গ্লাইডারটি পানির নিচে ডুব দিতে চায়, তখন পাম্পটি থলি থেকে তেল টেনে ভেতরে নিয়ে নেয়। এতে যন্ত্রটির আয়তন সামান্য কমে যায় এবং সেটি পানির চেয়ে ভারী হয়ে নিচে ডুবতে শুরু করে। আবার যখন এটি ওপরে উঠতে চায়, তখন পাম্পটি তেল আবার বাইরের থলিতে ঠেলে দেয়, যা যন্ত্রটিকে পানির চেয়ে হালকা করে তোলে এবং সেটি ওপরে ভাসতে থাকে।

 

দুই পাশে থাকা দুটি ছোট স্থির ডানা এই ওপরে-নিচে যাওয়ার উলম্ব শক্তিকে অনুভূমিক শক্তিতে রূপান্তর করে। ফলে যন্ত্রটি সাগরের ভেতরে তির্যকভাবে সামনে এগোতে থাকে। এই বিশেষ চলার পথ অনেকটা করাতের দাঁতের মতো আঁকাবাঁকা ।

 

যেহেতু এতে কোনো বড় ইঞ্জিন নেই, তাই এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে---ঘণ্টায় মাত্র ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার। তবে এর ব্যাটারি একটানা ৩ থেকে ১২ মাস সচল থাকতে পারে।

 

রাডার বা সোনারে সনাক্ত না হওয়ার কারণ

 

এই গ্লাইডারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর লো-অ্যাকোস্টিক সিগনেচার। পানির নিচে যেকোনো ডুবোযান সনাক্ত করার প্রধান উপায় হলো তাদের ইঞ্জিনের কম্পন বা প্রোপেলারের ঘূর্ণন থেকে সৃষ্ট শব্দ শোনা। কিন্তু এই স্লকোম গ্লাইডারের কোনো ইঞ্জিন বা প্রোপেলার নেই। এটি চলে নিঃশব্দে। এমনকি এর তেলের পাম্পটি যখন কাজ করে, তা থেকেও প্রায় কোনো শব্দ তৈরি হয় না। এর ফলে, যুদ্ধজাহাজের অতিসংবেদনশীল ‘সোনার’ সিস্টেম বা হাইড্রোফোন সহজে এর উপস্থিতি টের পায় না। নিঃশব্দে চলার কারণে এটি সহজে সনাক্ত ও ট্র্যাকিং করা কঠিন, যা একে গোয়েন্দা মিশন বা তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি একটি আদর্শ ডুবোযান।

 

ইরিডিয়াম স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ব্যবহার

 

গ্লাইডারটি পানির নিচে থেকে যে বিপুল পরিমাণ তথ্য---যেমন তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও গভীরতা সংগ্রহ করে, তা কন্ট্রোল রুমে পাঠানোই এর মূল কাজ। এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইরিডিয়াম স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। ইরিডিয়াম হলো আমেরিকার একটি যোগাযোগ সংস্থা, যার ৬৬টি কৃত্রিম উপগ্রহ পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, যা মেরু অঞ্চলসহ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রায় বৈশ্বিক কভারেজ দিতে সক্ষম।

 

গ্লাইডারটি যখন তার মিশন শেষ করে পানির উপরিভাগে আসে, তখন এর পেছনের খাড়া লেজটি অ্যান্টেন হিসেবে কাজ করে। সেটি ইরিডিয়াম স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সংগৃহীত সব তথ্য একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রোপ্রাইটারি এনক্রিপশন ফরম্যাটে নির্দিষ্ট গ্রাউন্ড স্টেশন ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে পাঠিয়ে দেয়। ডেটা পাঠানো শেষ হলে গ্লাইডারটি আবার স্যাটেলাইট থেকে নতুন নির্দেশ বা জিপিএস লোকেশন গ্রহণ করে পুনরায় সাগরের গভীরে ডুব দেয়।

 

আঞ্চলিক জলসীমায় মোতায়েন ও স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি

 

যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর এবং সামগ্রিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি বজায় রাখছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহরের অন্যতম প্রধান ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ ‘ইউএসএস ব্লুরিজ’ চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙ্গর এলাকায় অবস্থান করেছিল বলে জানা যায়। এই কমান্ড ও কন্ট্রোল জাহাজটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ সমন্বয় করে। এছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেলগুলো নিয়মিত বিরতিতে বঙ্গোপসাগরে মহড়া ও সার্ভে পরিচালনা করে থাকে। সাধারণত এই ধরনের সার্ভে জাহাজগুলো থেকেই আন্ডারওয়াটার গ্লাইডারগুলো গভীর সমুদ্রে অবমুক্ত করা হয়।

 

দূরত্ব ও গতির গাণিতিক হিসাব

 

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া গ্লাইডারটির অবস্থান এবং চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর এলাকা থেকে বরগুনার পাথরঘাটার উপকূলীয় অঞ্চলের সোজা নটিক্যাল দূরত্ব আনুমানিক ১৫০ থেকে ১৭০ কিলোমিটার বা গড়ে ১৬০ কিলোমিটার।

 

গ্লাইডারটির কারিগরি গতিবেগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি অত্যন্ত ধীরগতির একটি যন্ত্র যা ঘণ্টায় মাত্র ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতে একটি গাণিতিক হিসাবে দেখা যায়, সর্বনিম্ন গতিতে ঘন্টায় ১ কিলোমিটার চললে ১৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ১৬০ ঘণ্টা বা প্রায় ৬.৬ দিন।

 

সর্বোচ্চ গতি বা ঘন্টায় দেড় কিলোমিটার চললে ১৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে প্রায় ১০৭ ঘণ্টা বা প্রায় ৪.৫ দিন। অর্থাৎ, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যদি গ্লাইডারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেবল স্রোতের টানেও ভেসে আসে, তবে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে পাথরঘাটায় পৌঁছাতে এর সময় লাগার কথা মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন।

 

মোতায়েনকারী শক্তির পরিচয়

 

বঙ্গোপসাগর নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো বেশ তৎপর। বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বঙ্গোপসাগরের সীমানা বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে এক দশকেরও বেশি সময় আগে। এরপরও এ দুটি দেশের বড় আগ্রহ রয়েছে বঙ্গোপসাগর ঘিরে। তবে প্রকাশ্য উৎসে ভারত বা মিয়ানমারের কাছে এই ধরনের গ্লাইডার থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর বাইরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চল নিয়ে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। চীনের কাছে এই বিশেষ গ্লাইডার সরবরাহ করার প্রকাশ্য কোনো তথ্য বা নজির নেই। অন্যদিকে, এই গ্লাইডার প্রোগ্রামটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর অর্থায়নেই শুরু হয়েছিল এবং তারা এই প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছ থেকে অন্তত ২১০টি ইউনিট সংগ্রহ করেছে।

 

পাথরঘাটায় উদ্ধার হওয়া ডিভাইসটির প্রস্তুতকারক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলেও এটি কোন সংস্থা পরিচালনা করছিল, কী উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল এবং ঠিক কীভাবে বাংলাদেশের উপকূলে পৌঁছেছে---এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।

____
*লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন: