ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ হাজার সদস্যের ফেসবুক গ্রুপ বহিরাগতদের দখলে: জামাত-শিবিরের পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগ

ইসমাম জামান
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:০০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ হাজার সদস্যের ফেসবুক গ্রুপ বহিরাগতদের দখলে: জামাত-শিবিরের পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগ

ছবি: গ্রুপ ও এডমিন

শেয়ার করুন:

ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত বিশাল এই গ্রুপটিকে আইনি প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। একাডেমিক কারণে চাইলেও গ্রুপটিকে এড়িয়ে চলতে পারেন না শিক্ষার্থীরা। আর শিক্ষার্থীদের এই নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়েই বহিরাগত একটি চক্র নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার ও সাইবার হয়রানির ফাঁদ তৈরি করেছে।

দেশের শীর্ষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি সবচেয়ে বড় ফেসবুক গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণ বহিরাগত ও ছাত্রশিবিরের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ গ্রুপটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত হয়রানি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা হচ্ছে। আইনি ব্যবস্থা নিয়েও গ্রুপটিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওপেন ক্রেডিট সিস্টেম’ চালু থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের কোর্স ও শিক্ষক (ফ্যাকাল্টি) বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। কোন কোর্সের জন্য কোন শিক্ষক ভালো—এসব বিষয়ে আলোচনা, নোটস আদান-প্রদান এবং পরামর্শের জন্য শিক্ষার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হয়। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই ‘BracU Faculty and Course Review’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি হয়। একই নামের একাধিক গ্রুপের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার সদস্যের সবচেয়ে বড় গ্রুপটি নিয়েই বর্তমানে তুমুল বিতর্ক চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রুপটির অ্যাডমিন ও মডারেটর প্যানেলে তিনটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এগুলো হলো—আদিব হাসান, নুসাইবা হোসেন এবং শারমিন আক্তার তুলি। এই প্রোফাইলগুলোতে ছবি হিসেবে যথাক্রমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, মুখ লুকানো একটি ছবি এবং কেবল একটি ছায়ার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সবকটি প্রোফাইলই লক করা। এসব অ্যাকাউন্টে ফ্রেন্ড বা বন্ধুর সংখ্যা যথাক্রমে ৬, শূন্য এবং ১ জন। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই তিনটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টই ভুয়া। এর পেছনে কে রয়েছে তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জানে না।

রাজনৈতিক প্রচার ও হয়রানির অভিযোগ

অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু এই ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি ছাত্রসংগঠনের মতাদর্শ প্রচার চলছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মাহরুফ মাহদী বলেন, ‘এই গ্রুপের অ্যাডমিন মূলত গুপ্ত শিবিরের একজন। তার পরিচয় কী, সে আসলেই এখানকার শিক্ষার্থী কি না, এমন কোনো প্রমাণ সে রাখেনি। সে প্রতিনিয়ত জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতিকে উৎসাহিত করে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক মত বা শিবিরবিরোধী কোনো পোস্ট হলে তা দ্রুত মুছে ফেলে। মূলত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবেই সে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণা চালিয়ে বেড়াচ্ছে।’

রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে গ্রুপটির প্রশ্নবিদ্ধ মডারেশন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের ছাত্রী সৌমিকা দত্ত বলেন, ‘এই গ্রুপে ক্রমাগত নাম-পরিচয় গোপন করে (অ্যানোনিমাস) পোস্ট ও কমেন্টের আড়ালে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। কনসেন্ট ছাড়াই যে কেউ যে কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও পোস্ট করে দিচ্ছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে জাতিগত বিদ্বেষ পর্যন্ত উসকে দেওয়া হচ্ছে। অথচ অ্যাডমিন নির্বিকার। আমরা এসব কার্যক্রমে প্রচণ্ড বিরক্ত। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রুপের এমন বাজে পরিচালনা খুবই কষ্টদায়ক।’

রাজনৈতিক উসকানির বিষয়ে সৌমিকা আরও বলেন, ‘গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত পেজ থেকে ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। এমনকি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্মদিনে গ্রুপের অ্যাডমিন শুভেচ্ছাও জানায়।’

শিক্ষার্থীরা জানান, গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত একটি ফেসবুক পেজ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্মদিনের শুভেচ্ছাসহ এসব বিতর্কিত পোস্ট করা হয় এ বছর ২'রা ফেব্রুয়ারি। মূলত সেই পেজ থেকেই গ্রুপের অ্যাডমিনশিপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। কিছুদিন আগে হঠাৎ গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় (ডিজেবল) হয়ে যায়, তবে সম্প্রতি এটি আবার ফিরে এসেছে। ফিরে আসার পর থেকে ওই পেজটি আর দেখা যাচ্ছে না, তবে অ্যাডমিন প্যানেলে পরিবর্তন এসেছে।

আইনি জটিলতা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

গ্রুপের এমন কার্যক্রমে বিরক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা একাধিক বিকল্প গ্রুপ দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেছেন। ব্র্যাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম কমিউনিটি গ্রুপ ‘BracU United’–এর (৩০ হাজার সদস্য) অ্যাডমিন ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফ্রান্সিস ফরিদ জানান, একসময় অ্যাডমিন প্যানেলের একটি প্রোফাইলের ছবিতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখান থেকেই ধারণা করা হয়, গ্রুপের অ্যাডমিন ব্র্যাকের কেউ নন, বরং কোনো বহিরাগত ব্যক্তি এটি চালাচ্ছেন। এই অ্যাডমিনরা উগ্রপন্থী কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হতে পারেন বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগ ও হয়রানির বিষয়টি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও নজরে এসেছে। ব্র্যাকের প্রক্টর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রক্টর কার্যালয়ের সহকারী ম্যানেজার মেহজাবিন হোসাইন জানান, এই গ্রুপের ব্যাপারে তারা অবগত। এর আগেও একাধিক শিক্ষার্থী নানা ধরনের হয়রানি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে প্রক্টরের কাছে গেছেন। অনেকেই নিজ উদ্যোগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

ব্র্যাকের প্রক্টর কার্যালয়ের ডেপুটি ম্যানেজার সাবরিনা জাহান জানান, ‘এই গ্রুপের অ্যাডমিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ নন। বহিরাগত হওয়ায় অনেক চেষ্টার পরও আমরা ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারিনি।’

তিনি আরো জানান, ‘গ্রুপে প্রায়ই এমন সব পোস্টের অনুমোদন দেওয়া হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। আমরা ওই ফ্যাকাল্টি রিভিউ গ্রুপের নামে সাইবার ক্রাইম আইনে মামলা ও জিডি করেছি। পুলিশের তৎপরতায় গ্রুপটিকে একবার নিষ্ক্রিয় করা সম্ভবও হয়েছিল। তবে কিছুদিন পর সেটি আবার ফিরে আসে। আসলে পুলিশ মেটার সাথে যোগাযোগ করে গ্রুপটি বন্ধ করতে সক্ষম হলেও মেটা তার কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘন হচ্ছেনা এমন যুক্তিতে গ্রুপটিকে আবার সক্রিয় করেছে। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপারটি নিয়ে বিব্রত।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক সাবেক শিক্ষার্থী যুক্ত থাকায় বর্তমান শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনে এই গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল। ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত বিশাল এই গ্রুপটিকে আইনি প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যাচ্ছে না। একাডেমিক কারণে চাইলেও গ্রুপটিকে এড়িয়ে চলতে পারেন না শিক্ষার্থীরা। আর শিক্ষার্থীদের এই নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়েই বহিরাগত একটি চক্র নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার ও সাইবার হয়রানির ফাঁদ তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন: