প্রকাশনার আড়ালে উগ্রবাদ: আল-কায়েদা নেতাদের বই বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে

আরিফুজ্জামান তুহিন ও রোকন-উজ-জামান
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৭পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
প্রকাশনার আড়ালে উগ্রবাদ: আল-কায়েদা  নেতাদের বই বিক্রি হচ্ছে  প্রকাশ্যে

সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা ব্যাক্তিদের বই

শেয়ার করুন:

ঢাকার বাংলাবাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে আল-কায়েদা ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের অনুদিত বই। জড়িত একাধিক বিতর্কিত প্রকাশনীর বিস্তারিত জানুন।

ঢাকায় ধর্মীয় বইয়ের আড়ালে আল-কায়েদা, আইএসসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে। একসময় গোপনে ছড়ানো এসব মতাদর্শভিত্তিক বই এখন রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। বাংলাবাজার ও আশপাশের অন্তত ছয়টি প্রকাশনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের বই অনুবাদ ও বাজারজাত করার তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব প্রকাশনীর মালিকদের অনেকেই আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদে জড়িত থাকার মামলাও রয়েছে। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত। নতুন নামে বা আগের প্রকাশনীর মাধ্যমেই তারা প্রকাশ্যে এই বইগুলো বিক্রি করছেন। প্রকাশনাপাড়া হিসেবে খ্যাত রাজধানীর বাংলাবাজারের কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

আর-রিহাব পাবলিকেশন্স

বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আর-রিহাব পাবলিকেশন্সের অবস্থান। এর স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুর রহমান শামীম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানীর বইগুলো প্রকাশ করতেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) তাকে তার প্রকাশনী থেকে উগ্রবাদী বইসহ গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। পরে তিনি আদালত থেকে জামিন পান। অভিযোগ রয়েছে, নজরদারি এড়াতে তিনি মাঝে মাঝে ‘মাকতাবাতুল হাকিম’ বা ‘আল-মুহাজিরুন পাবলিকেশন্স’ নাম ব্যবহার করে বই প্রকাশ করছেন।

তার প্রকাশনা থেকে আল-কায়েদা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বই বাংলায় অনুবাদ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ওসামা বিন লাদেনের লেখা ‘হযরত কা’ব বিন মালেক’। এছাড়া রয়েছে আনোয়ার আল-আওলাকি, ইউসুফ আল-উয়াইরি, আসেম উমর এবং আবু হামজা আল-মিশরীর একাধিক বই। উল্লেখ্য, আনোয়ার আল-আওলাকি ও আসেম উমর দুজনই আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ছিলেন এবং তারা ড্রোন হামলায় নিহত হন।

ইলমহাউস পাবলিকেশন্স

ইলমহাউস পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী আসিফ আদনান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি আবদুস সালাম মামুনের ছেলে। ২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। সে সময় পুলিশ দাবি করেছিল, তিনি তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় গিয়ে জিহাদে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।

মামলার নথি ও তখনকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর আসিফ আদনান হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি প্রকাশনা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। তার প্রকাশনা থেকে আহমাদ মুসা জিবরিলের ‘তাওহিদের মূলনীতি’ ও ‘নবি ইউসুফের পাঠশালা’ বই দুটি প্রকাশ করা হয়েছে। আহমাদ মুসা জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণা, ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন। পরে সিরিয়ায় বিদেশি যোদ্ধাদের মধ্যে প্রভাবশালী অনলাইন ধর্মীয় বক্তা হিসেবে তাকে গবেষকেরা চিহ্নিত করেন।

এ ছাড়া ইলমহাউস আবদুর রাহমান ইবনু সালিহ আল-মাহমুদের লেখা বই ‘অপরিহার্য শরীয়াহ’ প্রকাশ করেছে। যাতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের কাফের সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই বই নিয়ে খোদ সৌদি আরবের সালাফি আলেমরাও সমালোচনা করেছেন।

সম্প্রতি আসিফ আদনান বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টিটিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে করা একটি মামলায় তার নাম আসে। তবে মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ আদনান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি মামলাটিকে ‘রাষ্ট্রীয় নাটক’ বলে আখ্যা দেন।

সিয়ান পাবলিকেশন

বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারেই সিয়ান পাবলিকেশনের অবস্থান। এর স্বত্বাধিকারী আবু তাসমিয়া আহমদ রফিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে জানা যায়, তিনি একসময় 'জামায়াতুল মুসলিমিন' নামের একটি গোষ্ঠীর সমন্বয়ক ছিলেন। জঙ্গিবাদের অভিযোগে তিনি ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হন। ৭ মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণায় পূনরায় যুক্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমাবেশে উগ্র মতাদর্শ প্রচার ও পশ্চিমা নাগরিকদের প্রতি সহিংসতার আহ্বান জানানোর অভিযোগ রয়েছে। সিয়ান পাবলিকেশন থেকে আল-কায়েদা এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কের উত্থানস্থল হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম হাক্কানিয়ার প্রধান সামিউল হক হাক্কানির বই প্রকাশ করা হয়েছে।

খান প্রকাশনী

কওমি মার্কেট এলাকার খান প্রকাশনীর মালিক মাওলানা ইসহাক খান। তিনি আনসার আল-ইসলামের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী অনলাইন বক্তা পলাতক আশরাফ খান (তামিম আল-আদনানী)-এর বড় ভাই বলে জানা গেছে। ইসহাক খান ইতিপূর্বে জসীমুদ্দীন রাহমানীর উগ্রবাদী বইগুলো ছাপার দায়িত্ব পালন করতেন।

২০১৮ সালের ১০ জুলাই র‍্যাব-৩ তাকে মানিকগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে। ২০২১ সালের শেষে তিনি জামিন পান। তার প্রকাশনী থেকে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আল-কায়েদা তাত্ত্বিক আবদুল্লাহ আযযাম এবং আল-কায়েদার শীর্ষ পর্যায়ের নেতা আনওয়ার আল-আওলাকির মূল বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করে বিক্রি করা হচ্ছে। ইসহাক বর্তমানে উগ্রবাদে অভিযুক্ত আসামিদের জামিন ত্বরান্বিত করার একটি কমিটিতেও যুক্ত আছেন।

রুহামা পাবলিকেশন্স

বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে অবস্থিত রুহামা পাবলিকেশন্সের মালিক রফিকুল ইসলাম মিথিল। ঢাকা পুলিশের অতীত প্রতিবেদনের তথ্যে এটিকে আনসার আল-ইসলামের দাওয়াহ শাখার অংশ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতি, আরব উপদ্বীপে আল-কায়েদার শীর্ষনেতা হারিস আন-নাজারী এবং সৌদি কারাগারে আটক থাকা খালিদ আর-রাশিদের বই এই প্রকাশনী থেকে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যান্য প্রকাশনী

পি কে রায় রোডে অবস্থিত ‘সন্দীপন প্রকাশন’ থেকে আহমাদ মুসা জিবরিলের বই প্রকাশ করা হয়েছে। এর সম্পাদক তাইব হোসেন। নর্থব্রুক হল রোডে অবস্থিত ‘সীরাত পাবলিকেশন্স’ সৌদি আরবে কারাবন্দী আল-কায়েদা তাত্ত্বিক সুলায়মান ইবনু নাসির আল উলওয়ান এবং আরেক অভিযুক্ত হামুদ বিন উকলা আশ-শুয়াইবির বই অনুবাদ করেছে। এছাড়া ‘রেইনড্রপস মিডিয়া’ যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডপ্রাপ্ত তারিক মেহান্না ও বাবর আহমেদের লেখার সংকলন এবং আওলাকির অডিও বক্তব্য বাংলায় ডাবিং করে বাজারে এনেছে।

কী করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতাদের লেখা এবং তাদের চরমপন্থী মতাদর্শের বই এখন প্রকাশ্য বইয়ের দোকানে ও ফোন করে কুরিয়ারের মাধ্যমে কেনা যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তি অতীতে গ্রেপ্তার হয়ে মামলা চলাকালীন সময়েই প্রকাশ্যে কীভাবে এই বইগুলোর প্রকাশনা চালাচ্ছেন তা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। জামিনে মুক্ত থাকা অবস্থায় তাদের ব্যবসার ব্যাপারে নজরদারি চলছে কি না, সে বিষয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

এসব বই অনুবাদ, বিক্রি ও উগ্রবাদী মতাদর্শ বিস্তারের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারী কোনো সংস্থা এসব নির্দিষ্ট প্রকাশনী ও ব্যক্তিদের হালনাগাদ কার্যক্রমের ওপর বক্তব্য প্রদান করেননি। বইগুলোর ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাও আসেনি।

শেয়ার করুন: