নারায়ণগঞ্জে পীরের লাশ তুলে পোড়ানো: মামলায় আসামি রাজ্জাক ও মামুনুল হকসহ ২৮ জন


৫ আগস্টের রাতে নারায়ণগঞ্জে চিশতিয়া তরিকার পীর এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার কবি রেজা সারোয়ারের রাজাজীর মাজার ভাঙচুর ও লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ও মামুনুল হকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের রাতে নারায়ণগঞ্জে চিশতিয়া তরিকার একজন পীরের মাজার ভাঙচুর করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় দুই বছর আগে দাফন করা ওই সুফির লাশ।
এ ঘটনায় সুফির পরিবার ও মুরিদরা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামিয়া আস-সালাফিয়ার মহাপরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকসহ ২৮ ব্যক্তির নামে জেলা আদালতে অভিযোগ করেছে। আদালত পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে (ডিবি) বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ছবিঃঅগ্নিসংযোগের শিকার মাজার
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২২ সালের ৭ মার্চ কবি শাহ সুফি রেজা সারোয়ার রাজাজী মারা যান; এরপর তাঁকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের কালনীতে তাঁর নিজের জায়গায় দাফন করা হয়। জায়গাটিকে মুরিদরা 'শাহ সুফি সৈয়দ রেজা সারোয়ার রাজাজী (রহ.)-এর মাজার' হিসেবে ওরসও পালন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এই মাজারে আসতে শুরু করে। রেজা সারোয়ার মূলত চিশতিয়া তরিকার একজন সুফি সাধক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার এবং কবি ছিলেন।
আদালতে দায়ের করা অভিযোগ ও তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন রাত ৯টার দিকে স্থানীয় জামিয়া সালাফিয়া মাদ্রাসা থেকে একদল লোক গেট ভেঙ্গে রেজা সারোয়ারের মাজারে ঢোকে। এ সময় তারা মাজার ভাঙচুর করে এবং কবর খুঁড়ে রেজা সারোয়ারের লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়। লাশ পোড়ানোর আগে তারা রাজ্জাক হুজুরের ছেলে আবদুল্লাহ বিন রাজ্জাক ওরফে আবদুল্লাহর সঙ্গে ফোনে কথা বলে।
ছবিঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক
প্রসঙ্গত, জামিয়া আস-সালাফিয়ার মহাপরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ রাজ্জাক হুজুর নামেও দেশজুড়ে বেশ আলোচিত। রাজ্জাক হুজুর সম্প্রতি বন্যার সময় ত্রাণ দিতে গিয়ে একাধিক শিশুর গলা থেকে তাবিজ কেটে ফেলে বেশ সমালোচিত হয়েছিলেন। এই রাজ্জাক হুজুরের ছেলে হলেন আবদুল্লাহ।
তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ঢাকা পেপার্সকে বলেন, হইচইর শব্দ শুনে বাসা থেকে বের হয়ে তারা কিছু লোক ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু-আকবর’ স্লোগান দিয়ে মাজার ভাঙচুর করতে দেখেন। এক পর্যায়ে তারা সারোয়ার সাহেবের কবর খুঁড়ে সেখান থেকে লাশ তুলে আনে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সুফি রেজা সারোয়ারের লাশ দুই বছর পরও পচে যায়নি—এটা দেখে হামলাকারীরা ভয় পেয়ে আবদুল্লাহকে ফোন করে পরামর্শ চায়। মুঠোফোনে লাউড-স্পিকারে উপস্থিতদের উদ্দেশে আবদুল্লাহ বলেন, “মেডিসিন দিয়েও লাশ অক্ষত রাখা যায়, এ দিয়ে বুজুর্গি বা আধ্যাত্মিকতা প্রমাণ হয় না। তোমরা ওই লাশ পুড়িয়ে দাও।” এরপরেই তারা সুফি রেজা সারোয়ারের লাশ পুড়িয়ে দেয়। সুফি রেজা সারোয়ারের লাশ বিকৃত হয়নি—এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানের প্রায় কাছাকাছি তথ্য মামলার অভিযোগেও উল্লেখ করা হয়েছে।
রেজা সারোয়ারের পরিবার জানান, এ ঘটনার পর গত ৭ আগস্ট পীরের পুড়ে যাওয়া লাশ ফের ঢাকার অজ্ঞাতস্থানে কবর দেওয়া হয়। এ বিষয়ে মামলার বাদী এবং পীরের স্ত্রী সৈয়দা জাহিদা সুলতানা রাজাজী ঢাকা পেপার্সকে বলেন, “আমরা তাঁর পুড়ে যাওয়া লাশ ঢাকায় নতুন করে দাফন করেছি।”
জাহিদা সুলতানা আরও জানান, ঘটনার পরপর রূপগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। সেসময় স্থানীয় সাংবাদিকরা এই খবর প্রকাশ করতে সংশয় প্রকাশ করেন। এরপর তাঁরা আদালতে অভিযোগটি করেন। আদালত অভিযোগটি সিআইডিকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাইদুল ইসলাম বলেন, “তদন্ত চলমান আছে। আমরা যথাসময়ে আদালতের কাছে প্রতিবেদন পেশ করব।”
অভিযুক্ত আবদুল্লাহর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারি পরিচয় মো. রিফাত খান ফোন রিসিভ করেন। তিনি বলেন, আমি কথা বলে জানাচ্ছি। এরপর তাকে ফোন করে আর পাওয়া যায়নি।



