রক্তে ভেজা সবুজ পাতা: ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের শতবর্ষ ও অবহেলিত এক জনপদ


ছবি: উইকি
চা-শ্রমিকদের সেই ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন ছিল শিকল ভাঙার এক মহানিষ্ক্রমণ। কিন্তু একুশ শতকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই ইতিহাসের পাতা উল্টাই, তখন দেখা যায়—মালিক বদলেছে, শাসন বদলেছে, কিন্তু চা-শ্রমিকদের জীবনের সেই তিতকুটে স্বাদটুকু আজও বদলায়নি।
ভোরবেলায় আমাদের ড্রয়িংরুমে যখন ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের সুবাস ছড়ায়, সেই স্নিগ্ধ আমেজটুকু কি কখনো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক বীভৎস আর্তনাদের কথা? কাপের তলায় জমে থাকা তলানিটুকুর মতো আমাদের সভ্যতার নিচে চাপা পড়ে আছে শত বছরের এক রক্তাক্ত ইতিহাস। আমাদের সতেজ সকালের যে ‘লাল চা’ বা ‘দুধ চা’—তার লিকারটুকু মূলত তৈরি হয়েছে এক শোষিত জনগোষ্ঠীর রক্ত আর চোখের জলে। আজ থেকে ১০৩ বছর আগে, ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে যা ঘটেছিল, তা কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুরতার দলিল নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক বিস্মৃতপ্রায় ক্ষত।
চা-শ্রমিকদের সেই ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন ছিল শিকল ভাঙার এক মহানিষ্ক্রমণ। কিন্তু একুশ শতকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই ইতিহাসের পাতা উল্টাই, তখন দেখা যায়—মালিক বদলেছে, শাসন বদলেছে, কিন্তু চা-শ্রমিকদের জীবনের সেই তিতকুটে স্বাদটুকু আজও বদলায়নি।
চা-শ্রমিকদের এই জনপদে আসার গল্পটা ছিল এক সুপরিকল্পিত প্রতারণার। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ করপোরেট বেনিয়ারা যখন আসাম ও সিলেটে চায়ের আবাদ শুরু করে, তখন তাদের প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ সস্তা শ্রমিকের। স্থানীয়রা এই হাড়ভাঙা খাটুনিতে রাজি ছিল না। তখন ব্রিটিশদের ‘আড়কাঠি’ বা দালালরা ভারতের বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় গিয়ে ছড়াতে শুরু করল রূপকথার গল্প। তারা বলেছিল, ‘চলো এমন এক দেশে, যেখানে গাছে গাছে সোনা ফলে। গাছ নাড়া দিলেই টাকা ঝরে (গাছ হিলায়েগা তো পয়সা মিলেগা)।’
ক্ষুধার্ত মানুষগুলো সেই সোনার হরিণের খোঁজে ঘর ছাড়ল। কিন্তু বাগানে এসে তারা দেখল, সোনা নয়—সেখানে ঝোপে ঝোপে লুকিয়ে আছে বিষাক্ত সাপ, হিংস্র বাঘ আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্রিটিশ ম্যানেজারদের চাবুক। ‘গিরমিট’ নামক এক কালো চুক্তিতে তাদের জীবন বাঁধা পড়ল। বাগানই হয়ে উঠল তাদের কারাগার। তাদের নিজস্ব কোনো টাকা ছিল না, দেওয়া হতো ‘টি-টোকেন’, যা কেবল বাগানের ভেতরের দোকানেই চলত। অর্থাৎ, বাগান থেকে পালানোর সব পথ ছিল রুদ্ধ। এই আধুনিক দাসপ্রথা যখন চরম সীমায় পৌঁছল, তখনই জন্ম নিল ‘মুল্লুক চলো’ বা নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
১৯২০-২১ সালের দিকে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন চা-শ্রমিকদের মনেও স্বাধীনতার স্বপ্ন উঁকি দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মন্দায় তাদের দৈনিক মজুরি কমিয়ে করা হয়েছিল মাত্র তিন পয়সা। এই অনাহার আর অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৯২১ সালের ৩ মে শ্রীমঙ্গলের আনিপুর বাগান থেকে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব পদযাত্রা। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে তাদের আদি নিবাস বা ‘মুল্লুক’-এর উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল শুধু স্ত্রী-সন্তানের হাত আর মনে এক বুক আশা।
সিলেট থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ তারা পাড়ি দিয়েছিল মূলত হেঁটেই। কারণ, ব্রিটিশ মালিকদের চাপে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হাজার হাজার মানুষ যখন ১৯ মে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে পৌঁছায়, তখন চারপাশ থেকে শুরু হয় গভীর ষড়যন্ত্র। তৎকালীন চাঁদপুরের মহকুমা প্রশাসক সুশীল কুমার সিংহ প্রথমে কিছুটা সহানুভূতি দেখালেও ব্রিটিশ প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ম্যাকফারসনের চাপে তার অবস্থান বদলে যায়।
২০ মে রাতের সেই অন্ধকার অধ্যায় আজও মেঘনার ঢেউয়ে ভাসে। চাঁদপুরের রেল স্টেশনে যখন হাজারো ক্লান্ত শ্রমিক ঘুমিয়ে ছিল, তখন কমিশনার কে. সি. দের নির্দেশে গোর্খা সৈন্যরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, সেদিন শ্রমিকদের রক্তে মেঘনার পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। অনেক শ্রমিকের পেট চিরে মেঘনায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল যেন লাশগুলো ভেসে না ওঠে। এই পাশবিক হত্যাকাণ্ড ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। অথচ ইতিহাসে এই ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন আজও তার যোগ্য জায়গা পায়নি।
এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর একমাত্র রেল শ্রমিক নেতা দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি রেল ও স্টিমার ধর্মঘট ডাকেন, যার ফলে প্রায় আড়াই মাস পুরো ব্রিটিশ প্রশাসন অচল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, খোদ মহাত্মা গান্ধী সেই সময় এই শ্রমিক আন্দোলনের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পুঁজি বা পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা চলছে না, সরকারের বিরুদ্ধে চলছে।’ কংগ্রেসের এই দ্বিমুখী নীতির কারণে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যারা বাঁচল, তাদের আবার সেই বাগানগুলোর বন্দিজীবনেই ফিরে যেতে হলো। তাদের ফিরে যাওয়ার কোনো ‘মুল্লুক’ আর অবশিষ্ট রইল না।
আজ ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন চা-শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় শোষণের কাঠামোটি কেবল আধুনিক হয়েছে। ব্রিটিশরা চলে গেছে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সেই ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা’ আজও চা-বাগানগুলোতে সগৌরবে টিকে আছে। একজন চা-শ্রমিক বর্তমানে দৈনিক মজুরি পান মাত্র ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। বর্তমান বাজারের অগ্নিমূল্যের দিনে এই টাকায় একটি পরিবারের তিন বেলা আহার জোটা কি আদৌ সম্ভব? এটি শ্রম নয়, বরং এক ধরনের পরিমার্জিত দাসত্ব।
চা-শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বঞ্চনা তাদের ভূমিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, প্রায় পৌনে ২০০ বছর ধরে তারা এই মাটিতে রক্ত-ঘাম ঝরাচ্ছেন। কিন্তু যে ভিটেতে তারা ঘুমান, সেই জমির ওপর তাদের কোনো মালিকানা নেই। যেদিন তারা কাজ করতে পারবেন না বা চাকরি শেষ হবে, সেদিনই তাদের উচ্ছেদ হতে হবে। এই ‘ভূমিহীন’ তকমা তাদের নাগরিক অধিকারকে খর্ব করে রেখেছে। তারা যেন স্বাধীন দেশের ভেতর এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।
শিক্ষার সুযোগ সেখানে অত্যন্ত সীমিত। হাতেগোনা কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। চা-জনগোষ্ঠীর জন্য নেই কোনো বিশেষ কোটা সুবিধা, অথচ তারাই দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও করুণ। অধিকাংশ বাগানে হাসপাতাল মানেই শুধু প্যারাসিটামল আর ওরস্যালাইনের বাক্স। আধুনিক চিকিৎসার অভাবে সেখানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার দেশের গড় হারের চেয়ে অনেক বেশি।
চা-শ্রমিকদের এই অবহেলিত পরিস্থিতি আমাদের জাতীয় লজ্জার বিষয়। প্রতি বছর ২০ মে ‘চা-শ্রমিক হত্যা দিবস’ পালিত হয় ঠিকই, কিন্তু তা আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। চা-শ্রমিকদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা যে ১১৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত, তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি এবং সংবিধানে তাদের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো তাদের মজুরি কাঠামো পরিবর্তন এবং ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা। তারা আর কতকাল অন্যের ইজারা নেওয়া জমিতে পরবাসী হয়ে থাকবে? যে মাটি তাদের শ্রমে সুজলা-সুফলা হয়েছে, সেই মাটির এক টুকরো মালিকানা কি তাদের পাওনা নয়?
মুল্লুক চলো আন্দোলনের ১০০ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু চা-শ্রমিকদের সেই আকুতি আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি যখন আমরা দেখি, তখন কি আমরা সেই নারীর চোখের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শত বছরের ক্লান্তি দেখতে পাই? আমাদের মনে রাখা উচিত, উন্নয়ন মানে শুধু শহরের বড় বড় অট্টালিকা নয়, উন্নয়ন মানে চা-বাগানের সেই কুঁড়েঘরে থাকা মানুষটির মুখে হাসিখুশি হাসিও।
ব্রিটিশরা তাদের বলেছিল, গাছ নাড়লে টাকা পড়বে। আজ ১০৩ বছর পর আমরা যেন তাদের এ কথা না বলি যে, ‘তোমাদের রক্ত দিলে আমরা উন্নয়ন পাব’। ২০ মে কেবল শোকের দিন নয়, ২০ মে হওয়া উচিত চা-শ্রমিকদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের শপথের দিন। তাদের ইতিহাসকে মূলধারার পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং চাঁদপুরের সেই রক্তভেজা ভূমিতে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা আমাদের নূন্যতম দায়বদ্ধতা। সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই লাল রক্ত যেন আর কখনো আমাদের বিবেককে দংশন না করে—সেই কামনাই করি।
চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবুন—এই চা কি তৃপ্তির, নাকি বঞ্চনার?
--
লেখক: কবি।



