সালমান মুক্তাদির: ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র একাট্টা হয়ে যেতে পারে?

ফেরদৌস আরা রুমী
ফেরদৌস আরা রুমী
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৫পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
সালমান মুক্তাদির: ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র একাট্টা হয়ে যেতে পারে?
শেয়ার করুন:

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাটি মূলত জমি দখল ও বিরোধ সংক্রান্ত ছিল, চাঁদা না দেওয়ার ঘটনা নয়। এটিকে ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে প্রচার করে তিনি ভুল করেছেন এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। কিন্তু এই ডিজইনফরমেশন বা ভুল বয়ানের জন্য কী করা যেতে পারত? প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে সতর্ক করাই যথেষ্ট ছিল। তা না করে সরকার যা করল, তা সম্পূর্ণ অন্যায্য।

সালমান মুক্তাদির: ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র একাট্টা হয়ে যেতে পারে?

কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’-এ হামলা, মামলা করতে গিয়ে তার চরম ভোগান্তি, আর হঠাৎ করে তার ব্যাংক হিসাব তলব—সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক করুণ ছবি সামনে নিয়ে এসেছে। একজন নাগরিক যখন বিপদে পড়ে পুলিশের কাছে যান; পুলিশ সাথে সাথে মামলা না নিয়ে নানান অজুহাত দেখান তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই ভাঙচুরের পর থেকে পুরো বিষয়টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা দেখা গেছে। সালমান যখন আইনি সাহায্য চাইতে গেলেন, তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হলো। অথচ সেই মধ্যবর্তী সময়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমে খুব সহজে বলে দিলেন, সালমান নাকি কোনো মামলাই করেননি! একজন নাগরিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হলে পুলিশের কাজ ছিল দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের ধরা। কিন্তু তা না করে হঠাৎ বয়ান তৈরি হলো—ঘটনা নাকি জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে, বিএনপি চাঁদা চাইতে যায়নি। অপরাধের পেছনে কারণ যা-ই থাক, একটা স্টুডিও ভাঙচুর করা যে ফৌজদারি অপরাধ, সে কথা পুলিশ আমলেই নিলো না।

পুলিশের প্রথম কাজ ছিল নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা। অথচ পুলিশ সেদিকে হাঁটলই না। উল্টো সালমানের স্টুডিও এত বড় কেন, জমিতে ঝামেলা ছিল সালমান জানেন না কেন, তার আয়ের উৎস কী—এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুরো ঘটনার মোড় অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হলো। এটাকে সোজা বাংলায় বলে ভুক্তভোগীকে হেনস্তা করা। এমনকি ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) যেভাবে আইন ভেঙে তার ব্যাংক হিসাব তলবের খবর মিডিয়াতে প্রকাশ করল, তা পুরোপুরি নিয়মবহির্ভূত। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মুদ্রার অপর পিঠটাও আমাদের একটু দেখা দরকার। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সালমান বলছিলেন, আক্রমণের দিন তার স্ত্রী ও সন্তান যদি অফিসে থাকত, তবে তারা কতটা ট্রমার শিকার হতো! কথাটি একেবারেই সত্যি। কোনো মানুষের পরিবার আর সন্তানের জীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলে সেই ভয় ও মানসিক কষ্ট অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তবে এই ভয় আর ট্রমা তো সবার জন্য সমান। সালমানের নিজের অভিজ্ঞতার পর নিশ্চয়ই তার মনে পড়ার কথা দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা এবং আগুন দেওয়ার বিভীষিকাময় দিনের কথা। সেদিন আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ভয়ে যখন সাংবাদিকরা ভবনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন, তখন কিন্তু সালমান এক পডকাস্টে খুব হাসিমুখে বলেছিলেন—এই হামলা নাকি সাংবাদিকদের “কর্মের পরিণতি”! পাশে বসে উপস্থাপকও হাসছিলেন। আর পিনাকী ভট্টাচার্য সেই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক প্রজ্ঞা’ বলে প্রশংসা করে ভিডিও বানিয়েছিলেন। আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় রোগ হলো—আমরা সহিংসতাকেও রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী বিচার করি। পছন্দের মানুষের ওপর আঘাত এলে আমরা মানবাধিকার আর পরিবারের ট্রমার কথা বলি; কিন্তু ভিন্নমতের প্রতিষ্ঠানের ওপর তাণ্ডব চললে সেটাকে ‘কর্মফল’ বলে হেসে উড়িয়ে দিই। সহিংসতা যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, অন্যায়কে সব পরিস্থিতিতেই অন্যায় বলতে পারা উচিত।

সালমানের অতীত ভূমিকা সমালোচনার যোগ্য হলেও, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র যে চরম প্রতিক্রিয়া দেখালো, তা কি গ্রহণযোগ্য?

প্রথমত, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাটি মূলত জমি দখল ও বিরোধ সংক্রান্ত ছিল, চাঁদা না দেওয়ার ঘটনা নয়। এটিকে ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে প্রচার করে তিনি ভুল করেছেন এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। কিন্তু এই ডিজইনফরমেশন বা ভুল বয়ানের জন্য কী করা যেতে পারত? প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে সতর্ক করাই যথেষ্ট ছিল। তা না করে সরকার যা করল, তা সম্পূর্ণ অন্যায্য। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকারি প্রভাবাধীন মিডিয়া, গোয়েন্দা সংস্থা, পিআর বাহিনী এবং অনলাইন বট বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হলো একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পেছনে! ব্যক্তিজীবনে তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ পছন্দ করতেই পারেন, হয়তো তিনি জামায়াতঘেঁষা রাজনীতিই মনে মনে সমর্থন করতে পারেন—কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পছন্দের দায়ে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র কি যখন ভুক্তভোগী নাগরিককে হেনস্তা করতে পারে? তাহলে তো তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়। 

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার এই অপব্যবহারের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটল যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্সকে সালমানের শ্বশুরের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হলো। কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়া হঠাৎ সালমানের শ্বশুরের ব্যবসা ও অ্যাকাউন্টের পেছনে এভাবে গোয়েন্দা লাগানো প্রকারান্তরে সালমানের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রের পেশিশক্তির আস্ফালন।

তৃতীয়ত, সালমানের শ্বশুরের ব্যবসায় যদি কোনো ঘাপলা বা অনিয়ম থেকেই থাকে, তবে বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই তো সেই তদন্ত হতে পারত। তখন নিয়মমাফিক তদন্ত করলে কারও কিছু বলার থাকত না। কিন্তু সালমানের এই ঘটনার ঠিক পরপরই হঠাৎ করে শ্বশুরের পেছনে উঠে পড়ে লাগা প্রমাণ করে যে, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সালমানকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শায়েস্তা করার এক নগ্ন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।

চতুর্থত, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে প্রচার করা হচ্ছে যে শ্বশুরের অর্থই সালমানের অর্থ। অথচ বাংলাদেশের আইন ও উত্তরাধিকারের স্বাভাবিক নিয়মে জামাই কোনোভাবেই শ্বশুরের সম্পত্তির মালিক নন। আগামীতেও তার এই সম্পত্তির মালিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, যদি না তার স্ত্রী তাকে সম্পত্তি লিখে দেন কিংবা স্ত্রী আগে মারা যান। তাহলে শ্বশুরের সম্পদকে জামাইয়ের সম্পদ বানিয়ে সালমানকে হেয় করার এই অপচেষ্টা কেন? এটি আসলে আমাদের সমাজের গভীরে থাকা চরম পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ—যেখানে নারীর পারিবারিক সম্পত্তিকেও কেবল পুরুষ বা জামাইয়ের নামে ট্যাগ করে দেখা হয়।

সবশেষে, এই নোংরা রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার পেছনে আমাদের সামাজিক একটা মানসিক ব্যাধিও কাজ করছে। বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জাতির ভাষায় সম্ভবত ‘পরশ্রীকাতর’ শব্দের এমন নিখুঁত উপস্থিতি নেই। অন্যের ‘শ্রী’ বা ঐশ্বর্য দেখে অন্তরে ‘কাতর’ হওয়া বা জ্বলেপুড়ে মরাই হলো এই জাতির একাংশের স্বভাব। সালমানের লাইফস্টাইল, জনপ্রিয়তা আর সাফল্য দেখে যারা দীর্ঘদিন ধরে পরশ্রীকাতরতায় ভুগছিল, রাষ্ট্র যখন তার পেছনে লাগল, সেই হিংসুটে মানুষের দল তখন আনন্দে হাততালি দিতে শুরু করল।

দিনশেষে সত্য একটাই—ব্যক্তি সালমান মুক্তাদির ভুলের ঊর্ধ্বে নন, তার বয়ানের অসঙ্গতি নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হবে। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের বিপরীতে যখন ক্ষমতাসীন সরকার তার গোয়েন্দা সংস্থা, মিডিয়া আর বট বাহিনীকে ঢাল বানিয়ে প্রতিশোধ নিতে নামে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্র কতখানি প্রতিশোধপরায়ণ ও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন সম্মিলিত আক্রমণ আসলে কোনোভাবে কাম্য নয়। 

---
*লেখক: জেন্ডার বিশ্লেষক এবং মানবসম্পদ বিভাগ প্রধান, ঢাকা পেপার্স।

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন: