সবুজ আলী আসলে কার: জুলাই যোদ্ধা বনাম ছাত্রলীগ, এক বিস্মৃত মৃত্যুর জন্মমৃত্যু জীবনযাপন

মাহাথির মুহাম্মদ
মাহাথির মুহাম্মদ
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৫পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
সবুজ আলী আসলে কার: জুলাই যোদ্ধা বনাম ছাত্রলীগ, এক বিস্মৃত মৃত্যুর জন্মমৃত্যু জীবনযাপন
শেয়ার করুন:

সবুজ আলী নিহতের ঘটনায় যে মামলাটি হয়, সেই থানায় দায়ের করা মামলার আসামি করা হয়েছে ভারতে পলাতক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে। আবার গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত জুলাই শহীদদের তালিকায় নীলফামারির শ্রমিক পিতার সন্তান সবুজ আলীর জায়গা হয়নি।

"মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে

আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন

কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?

আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের

ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর…"

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কবি আবুল হাসান তাঁর ‘জন্মমৃত্যু জীবনযাপন’ কবিতায় যে আক্ষেপ আর আর্তি করে গিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের রক্তাক্ত প্রান্তরে ঢলে পড়ার সময় উত্তরবঙ্গের যুবক সবুজ আলী এই কবিতা পড়ছিলেন কিনা, বা জীবনে কখনও পড়েছেন কিনা—তা আমাদের জানা নেই।

তবে আজ, এই ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই দাঁড়িয়ে, দুই বছর আগের সেই রক্তস্নাত বিকেলের দিকে তাকালে আমরা নিশ্চিত হই—সবুজ আলীর মৃত্যু কেউ নেয়নি, মৃত্যুই কেবল সবুজ আলীকে নিয়েছে।

তার এই অকাল মৃত্যু কাঁধে তুলে নিয়েছে কেবল তার হতদরিদ্র শ্রমিক পিতা, মানুষের বাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করা মা,ভাই আর মানসিক প্রতিবন্ধী আরেক ভাই। আর কেউ নয়।

সবুজ আলী পিছিয়ে পড়া জেলা নীলফামারির সদর উপজেলার চওড়া বড়গাছা ইউনিয়নের আরাজি দোলুয়া ভাটিয়া পাড়া গ্রাম থেকে একবুক স্বপ্ন নিয়ে শহর ঢাকায় এসেছিলেন।

ভ্যান চালক বাবা বাদশা মিয়ার অভাবের সংসারে অটোরিকশা চালিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জুটিয়ে ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যানে অনার্স পাস করেছিলেন তিনি। উত্তর ছাত্রাবাসের ২০৫ নম্বর কক্ষের এই আবাসিক শিক্ষার্থীর ইতোমধ্যে ১৬ হাজার টাকার একটি চাকরিও হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু নিজের আর পরিবারে ভাগ্য আমূল বদলে দিতে বিসিএস নামক লম্বা দৌড়ের রেসে নামতে চেয়েছিলেন সবুজ। সেই স্বপ্ন, সেই চাকরির লড়াই শেষ করার আগেই জীবনের প্রদীপ নিভে যায় সবুজ আলীর।

একটি অজ্ঞাত লাশ এবং পরিচয়ের টানাহেঁচড়া

আজ থেকে ঠিক গুনে গুনে দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলবেলা। কোটা সংষ্কারের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় ঢাকা কলেজ ও সায়েন্সল্যাব এলাকা। সেই উত্তাল সড়কেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় এক অজ্ঞাত যুবককে।

পথ দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন শরীফ ও আকাশ মাহমুদ নামের দুজন। তারা এই রক্তাক্ত যুবককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিকেল সোয়া ৫টায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিআইডির একটি দল ডাটাবেজ থেকে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে এই অজ্ঞাত লাশের পরিচয় নিশ্চিত করে—নিহতের নাম সবুজ আলী।

কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক পরিচয় ছাপিয়ে মুহূর্তেই শুরু হয়ে যায় তার ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ নির্ধারণের মহড়া। সবুজ হয়ে ওঠেন জুলাই আন্দোলনের এক অমীমাংসিত অধ্যায়।

সবুজের মৃত্যুর খবর আসার পর পরই আওয়ামী লীগের অ্যাকটিভিস্টরা দাবি করতে থাকেন, সবুজ ছাত্রলীগের কর্মী। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারিদের পক্ষের একটি গ্রুপ হলো ‘কোটা পূণর্বহাল করা চলবে না’।

এই ফেসবুক গ্রুপে মুহাম্মদ সিরাজ নামের একজন পোস্ট করেন “আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী সবুজ আলী আন্দোলনকারীদের হামলার কিছুক্ষণ আগে ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন।”

কিন্তু ১৬ জুলাই রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তোলেন, ছাত্রলীগই ছাত্রাবাসের রিডিং রুমে অধ্যয়নরত সবুজকে জোরপূর্বক কোটা সংস্কারবিরোধী আন্দোলনে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সায়েন্সল্যাবে ছাত্রলীগের হিংস্র কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তারা নিজেরাই তাকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং দায় চাপানোর জন্য ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ বলে প্রচার শুরু করে।

এই ক্ষোভে রাতভর ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস উত্তাল থাকে এবং তোপের মুখে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। উল্টোদিকে, তখনকার ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেন—সবুজকে ঢাকা কলেজের সামনে ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা পিটিয়ে মেরেছে।

পরের দিন ১৭ জুলাই শুরু হয় বিবৃতি ও লাশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকতার পাল্লা। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসরি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে সবুজের ছবি দিয়ে লিখেন, শহীদ আবরারের মতো ঢাকা কলেজের ছাত্র সবুজ আলীকেও পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। সবুজ আলী হত্যায় ছাত্রলীগ জড়িত অভিযোগ করে তিনি তার বিচারও চান।

ছাত্রদলের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানও একই ছবি এবং ক্যাপশন শেয়ার করেন।

অন্যদিকে, ১৭ জুলাই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে সম্পন্ন হয় সবুজের জানাজা। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সভাপতিমণ্ডলীর সদসসহ দলটির সারির প্রায় সব নেতা সেখানে অংশ নেন। জানাজায় তারা সবুজকে নিজেদের কর্মী দাবি করে বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরকে খুনি আখ্যা দেন।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শোকবার্তা পাঠান এবং তার পক্ষে কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধাও জানানো হয়। ছাত্রলীগের তৎকালিন সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানও বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করে বিবৃতি দেন।

নীলফামারী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানায়।

দুই বছর পর: সব হারানো এক মায়ের হাহাকার

সময় গড়িয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ আজ দেশে নিষিদ্ধ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এই দুই বছরে সবুজের জায়গা হয়নি কোনো পক্ষের কাছেই!

সবুজ আলী নিহতের ঘটনায় যে মামলাটি হয়, সেই থানায় দায়ের করা মামলার আসামি করা হয়েছে ভারতে পলাতক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে।

আবার গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত জুলাই শহীদদের তালিকায় নীলফামারির শ্রমিক পিতার সন্তান সবুজ আলীর জায়গা হয়নি।

সবুজ আলীর নিহতের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে আজ ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, বা ছাত্র শক্তি—তাঁর মৃত্যুর দিনে কোনো শোকপ্রস্তাব, মিলাদ মাহফিল অথবা সামান্য কোনো স্মরণানুষ্ঠানও রাখেনি। অন্যদিকে, সে সময় সবুজকে নিজেদের লোক দাবি করে ফুল দেওয়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের চালু ব্লুটিক ফেসবুক পেজগুলোতেও সবুজকে নিয়ে দেওয়া বিবৃতি আমাদের নজরে পড়েনি।

সবুজ আলীর বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লা আমান ঢাকা পেপার্সকে বলেন, নাসির ভাইয়ের(সাধারণ সম্পাদক) সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি। এটা মূলত নাসির ভাইয়েরই পোস্ট। আমি তার ওয়াল থেকে শেয়ার করেছিলাম।

তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আমানউল্লাহ আমান কিছু জানান নাই। এদিকে অনেকবার কল করলেও রিসিভ করেননি নাসির।

ঢাকা পেপার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে, সবুজ আলীর ইউনিয়নের এক নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, "সবুজ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী একটা ছেলে ছিলেন, তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ পরিচয় নিয়েই মারা গেছেন। জুলাই আন্দোলনকারীরা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘৃণা করে। তাই সবুজকে জুলাই যোদ্ধা বলবেন না প্লিজ।"

সবুজ আলী সংগঠনের সদস্য ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আনুষ্ঠানিকভাবে সবুজ সংগঠনের সদস্যপদ নেয়নি। তবে সে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ছিলেন।"

অন্যদিকে সবুজের বৃদ্ধ বাবা-মা গণমাধ্যমের কাছে এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সবুজের কবরের কাছে আজ তার বৃদ্ধা বাবা মা কেবল একা একাই দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের স্বজনের বক্তব্য, সবুজের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না, সে গ্রামের গরিব ঘরের ছেলে ছিল। তার বাবা মা এ নিয়ে কথা বলতে চান না।

আবুল হাসানের ‘জন্মমৃত্যু জীবনযাপন’ আজ সবুজ আলীর ক্ষেত্রে এক নিদারুণ ও নির্মম সত্য হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে—‘সবুজ আলী আসলে কার?’

শেয়ার করুন: