রূপপুর ও বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতা: দীর্ঘপথ এতো সহজ ছিল না


নিউক্লিয়ার সক্ষমতা মানে কেবল একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নয়, এটি একটি দেশের মেধা ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর সনদ। এটি যেমন শান্তির সময়ে উন্নয়নের চাবিকাঠি, তেমনি সংকটের সময়ে জাতীয় নিরাপত্তার শক্তিশালী রক্ষাকবচ। এই সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান ও গবেষণার দ্বার উন্মোচন করেছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকে ১৯৩টি দেশের ভেতর বাংলাদেশ ১২৯তম। পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের ৯৩তম অবস্থানে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬৫তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ কোথাও ভালো কিছু করছে না যাতে আমাদের সম্মান, আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায়—এসব খারাপ খবরের ভেতরেও বাংলাদেশ দুনিয়ার ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুপার এলিট দেশে অনেক আগেই প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল অবকাঠামো নির্মাণ বা 'ফার্স্ট কংক্রিট পোরিং' (এফসিপি) শুরু করে ৩০ নভেম্বর ২০১৭ সালে। তবে নিউক্লিয়ার ক্লাবে প্রবেশের দিনটি অবশ্য আরও পরে।
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে 'নিউক্লিয়ার ক্লাব' বা পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য হওয়ার মর্যাদা পায় ৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে। এই দিনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে আসা ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এই জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এই জ্বালানি গ্রহণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
দক্ষ জনশক্তি ও কারিগরি উৎকর্ষ
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিচালনা করা সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো নয়। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ এক বিশাল বাহিনী। এই জনশক্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় দেশের শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দেশ অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম প্রকৌশলগত বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে যা অন্যান্য শিল্পখাতেও কাজে লাগে।
দ্বিমুখী ব্যবহারের সম্ভাবনা
পরমাণু প্রযুক্তি মূলত ডুয়াল-ইউজ বা দ্বিমুখী ব্যবহারের প্রযুক্তি। এই সক্ষমতা দেশের কৌশলগত শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি চক্রের নিয়ন্ত্রণ থাকলে একটি দেশ চাইলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে একে প্রতিরক্ষা বা মিলিটারি শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে; তবে এটি আন্তর্জাতিক আইন ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে। পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন দেশগুলোকে বিশ্বরাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয় যা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।
অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিকে আয়ত্তে আনা হচ্ছে, আগামীতে এখান থেকেই পারমাণবিক বোমাও তৈরি করা সম্ভব। এটা আজকের পরিস্থিতিতে যে কোনো দেশকে জাতীয় সুরক্ষা দেবে। পৃথিবীর কোনো পারমাণবিক বোমা আছে এমন দেশকে আমেরিকা আক্রমণ করবে না।
শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ব্যবহার
বিদ্যুৎ ছাড়াও পারমাণবিক প্রযুক্তি তিনটি প্রধান খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি এবং বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয়ে এই প্রযুক্তি অপরিহার্য। তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহার করে ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং পচনশীল খাদ্যদ্রব্য দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব। এছাড়া খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং শিল্পকারখানার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে আইসোটোপ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক
পরমাণু শক্তি ব্যবহারের যোগ্যতা থাকা মানে একটি দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই বিষয়গুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দীর্ঘ মেয়াদে সস্তায় এবং কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে জায়গা করে নিতে সাহায্য করে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে।
সহজ কথায়, নিউক্লিয়ার সক্ষমতা মানে কেবল একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নয়, এটি একটি দেশের মেধা ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর সনদ। এটি যেমন শান্তির সময়ে উন্নয়নের চাবিকাঠি, তেমনি সংকটের সময়ে জাতীয় নিরাপত্তার শক্তিশালী রক্ষাকবচ। এই সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান ও গবেষণার দ্বার উন্মোচন করেছে।
শঙ্কার দিক কোথায়?
২০১৫ সালে রাশিয়াতে গেছি, নেমেছি রস্টোভ শহরে। এটি ডন নদীর তীরে একটি শহর। ওরা বলে রস্টোভ অবলাস্ত। সেখান থেকে রস্টোভ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাব পরের দিন। টানা ৬০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রস্টোভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছলাম। এই দীর্ঘ রাস্তার দুপাশ ছিল জনমানবহীন, এমনকি শস্যও দেখিনি। হতে পারে সেটা শীতের শুরু, সে কারণে শস্য ছিল না ক্ষেতে। এরপর যেখানে আমরা উঠলাম, সেই হোটেল থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের বেশি। হোটেলের চারপাশে কিছু মানুষ আমরা পেলাম, সেটা আসলে কেন্দ্রে যারা কাজ করেন তাদের ঘিরেই।
কেন্দ্রে পৌঁছে দেখলাম সেখানকার কুলিং টাওয়ারের পানি আসে ২০০ কিলোমিটার দূরের নদী ডন থেকে। বিশাল চ্যানেল করা হয়েছে কৃত্রিমভাবে, সেই চ্যানেল দিয়ে। আর কেন্দ্রের আশেপাশে কোনো বসতি নেই। কেন্দ্রের ২০ কিলোমিটার দূরে মিটার বসানো, সেখানে বাতাসে নিউক্লিয়ারের মাত্রা প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। কোনো বিপদ ঘটলে দ্রুত রেসকিউ করার সব আয়োজন আছে, কারণ ওই শহরে মানুষ নেই বললেই চলে।
মূলত কেন্দ্রে যে হাজার হাজার মানুষ কাজ করেন তাদের পরিবার সেখানে বাস করে। আর এসবই গড়ে উঠেছে মূলত রাশিয়ার কমিউনিস্ট সরকার সোভিয়েত আমলে। আমি যে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম সেই রস্টোভ কেন্দ্রটির চতুর্থ ইউনিটের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালের দিকে; আমরা যখন ২০১৫ সালের শেষ দিকে কেন্দ্রটিতে যাই সে সময়ই চতুর্থ ইউনিটের কাজটি চলছিল।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণ। এর পেছনে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বড় কারণ। সেসব কারণে এটা চাইলেই হুট করে করা যায় না, এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। আবার এর সাথে টেকনোলজি এবং নিরাপত্তার ব্যাপারও আছে। তবে আমার মনে বড় সংশয় তখন দেখা দিয়েছিল যে, আমাদের তো পদ্মায় পানি নেই। শুকনা মৌসুমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ থেকে রূপপুর পয়েন্ট পর্যন্ত পানি প্রবাহ নেমে আসে ১৪ হাজার কিউসেক পর্যন্ত। এই পানি দিয়ে ১২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের কুলিং সিস্টেম চালানো সত্যিই কঠিন।
এ ছাড়া বড় রকম সংশয় ছিল আসলে প্রযুক্তি নিয়ে। ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তি রাশিয়ার বাইরে বাংলাদেশই প্রথম। কোনো প্রযুক্তি তখনই প্রুভেন টেকনোলজি (নিরাপদ প্রযুক্তি যা অন্তত অপারেশনে ১০ বছর রয়েছে), যা অন্তত ১০ বছর বাজারে এসেছে এবং তার একটা বড় অভিজ্ঞতা পাবলিক ডোমেইনে পাওয়া যায়। রাশিয়ার বাইরে কোনো দেশে ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তির কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে নেই, বাংলাদেশ প্রথম দেশ হতে যাচ্ছে। এটি নিরাপত্তার দিক থেকে অনেক বড় সংশয়। এর ভালো-মন্দ আমরা তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে জানতে পারছি না। আর আমাদের প্রথম আলোচনা ছিল ভিভিইআর ১০০০ প্রযুক্তির কেন্দ্রটি বাংলাদেশে আসবে, যেটা বহু বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়া ছাড়াও অন্যান্য দেশে উৎপাদনে আছে। কিন্তু তৎকালীন রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মূল ক্রীড়ানক ছিলেন এই প্রযুক্তি পরিবর্তনের। ভিভিইআর ১০০০ প্রযুক্তি যেমন প্রুভেন, তেমনি এটির দামও বর্তমানে যেটি স্থাপিত হয়েছে সেই ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তির চেয়ে অনেক কম ছিল।
ড. এস. এম. সাইফুল হক রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ২৬ আগস্ট ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই রাষ্ট্রদূত ছিলেন আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’, যেটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেওয়া হয়েছিল, তা প্রস্তুতকারী টিমের একজন সদস্য। মূল কাজটি করেছিলেন ড. আবুল বারকাত। এরই প্রতিদান হিসেবে সাইফুল হককে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বানানো হয়।
আলোচনা চলছিল ভিভিইআর ১০০০ মডেলের কেন্দ্রটি আসবে বাংলাদেশে। কিন্তু সাইফুল হক সরকারকে বোঝান যে, ভিভিইআর ১২০০ মডেল বেশি আধুনিক এবং কার্যকর। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনে সাইফুল হকের ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে। এই অভিযোগের অন্যতম কারণ হলো, রাশিয়ার তেল-গ্যাস প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের লোকাল এজেন্টশিপ রাষ্ট্রদূতের পছন্দের বিশেষ ব্যক্তিকে পাইয়ে দিয়েছিলেন এবং বাড়তি টাকায় রাশিয়ার কাছ থেকে যে গম কেনা হয়েছিল তাতেও এই ব্যক্তি ছিলেন লোকাল এজেন্ট। এটি তখন আমিসহ প্রথম আলো পত্রিকায়ও সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
আরএমএম পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেড ছিল গ্যাজপ্রমের লোকাল এজেন্ট। এটির বড় অংশের শেয়ার ছিল বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায় ও তার স্ত্রীর। এ ছাড়া আরও শেয়ার ছিল মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিনের। মাহিন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের ১৬ বছর তিনি এই পদে ছিলেন, এখনো আছেন কিনা জানি না। আরএমএম পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেডের আরও মালিক ছিলেন ঢাকা-১১ আসনের (গুলশান, বাড্ডা, ভাটারা এলাকা) তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ। ধরেই নিতে পারি ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা অনিরুদ্ধ রায়ের রাশিয়ার যোগাযোগ এবং রহমতুল্লাহ ও মাহিনের সরকারি যোগাযোগের কারণে রাশিয়ার গ্যাজপ্রমের লোকাল এজেন্ট তারা হতে পেরেছিলেন।
গ্যাজপ্রম বাংলাদেশে ২০টি কূপ খননের কাজ পায়। প্রতিটি কূপে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল, যেখানে বাপেক্স মাত্র ৬০-৭০ কোটিতে কাজ করতে পারত। যথাযথ কারিগরি মান বজায় না রাখায় খনন করা কূপে বালি উঠে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার সেইসব কূপগুলো কিন্তু বাপেক্সকেই ফের সচল করতে হয়।
গ্যাজপ্রম এইভাবে ভয়াবহ মুনাফা করা শুরু করে। আর এই গ্যাজপ্রম আসলে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও না, এটি নেদারল্যান্ডসে নিবন্ধিত গ্যাজপ্রম। গ্যাজপ্রমের এই সীমাহীন মুনাফার ভাগাভাগির কারণেই হয়তো ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট গুলশান থেকে তিনি (অনিরুদ্ধ রায়) নিখোঁজ হন এবং দীর্ঘ ৮১ দিন পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই আটক অবস্থায় অনিরুদ্ধ রায়ের কাছ থেকে মাহিন ও রহমতউল্লাহ চেক সই করে নেন, কোম্পানি থেকে সকল টাকা তুলে নেন। এরপর ছাড়া পেয়ে অনিরুদ্ধ রায় কিছুদিনের জন্য বিদেশে চলে যান। বেসরকারি লেভেলে এই ধরনের পণবন্দির ঘটনা তখন ঢাকার অনেক সাংবাদিকই জানতেন।
গ্যাজপ্রম যেহেতু ভয়াবহ লাভ করত আর অনিরুদ্ধ রায়কে চিহ্নিত করা হয়েছিল বিচারপতি এস কে সিনহার ঘনিষ্ঠ হিসেবে, সে কারণে তার কাছে গ্যাজপ্রমের লোকাল এজেন্ট রাখার আর কোনো মানে ছিল না। গ্যাজপ্রমের নতুন লোকাল এজেন্ট হয় ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক হলেন রাশিয়ার নাগরিক মিয়া সাত্তার ও তার ভাই সোহেল। ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডি গ্যাজপ্রম ছাড়াও রাশিয়ার খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রডিনটর্গের লোকাল এজেন্ট পায়।
সেটা ছিল ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়। এরপরেই ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডি দুটি বড় কাজ বাগিয়ে নেয়। এর একটি হলো বাড়তি দামে রাশিয়ার কাছ থেকে ৫ লাখ টন গম কেনার ক্রয় আদেশ পায় প্রডিনটর্গ; বাড়তি দাম ছিল বাজার থেকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা বেশি।
জ্বালানি বিভাগ ভোলায় গ্যাজপ্রমকে দিয়ে তিনটি গ্যাস কূপ খননে ব্যয় করছে ৬৯৪ কোটি টাকা। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে প্রতিটি কূপ খননে খরচ হয় ৮০ কোটি টাকা। এতে করে মোট খরচ হওয়ার কথা ২৪০ কোটি টাকা। অথচ গ্যাজপ্রমকে দিয়ে খননের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৪৫৪ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গম আমদানি ও গ্যাস কূপ খননে সরকারের বাড়তি ৬৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ের কারণ রাশিয়ান কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীর ব্যয়। বাংলাদেশে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আছেন মো. সোহেল। রাজধানীর মহাখালীতে ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডি নামে তার একটি প্রতিষ্ঠান আছে।
ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডিকে গ্যাজপ্রম ও প্রডিনটর্গের লোকাল এজেন্ট করা মূলত রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. এস. এম. সাইফুল হকের প্রভাবে। সাইফুল হক রাশিয়াতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফ্ল্যাগওয়ালা গাড়ি নিয়ে মিয়া সাত্তারকে নিয়ে রাশিয়ার ব্যবসায়ীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সাইফুল হকের একক কর্তৃত্বে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের লোকাল এজেন্ট নিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, লীগের শেষ আমলে ৬৯৪ কোটি টাকা বাজার দর ছাড়া দুটি কাজ পাইয়ে দেয়। সে সময় সাইফুল হক ঢাকায় এলে তার হোটেল ভাড়া পর্যন্ত ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডি পরিশোধ করত।
সাইফুল হকের কিছু হয়নি। তিনি ও তার ভারতীয় স্ত্রী নিয়ে দিব্যি তবিয়তে ভারতের সব থেকে দামি এলাকা মুম্বাই জুহু বিচ এলাকায় পাঁচ তলা নিজস্ব বাড়িতে বেশ ভালোই আছেন। আর ড. আবুল বারকাত জেলের ঘানি টানছেন। তাহলে সাইফুল হকের বিষয়টি নিয়ে এতো আলোচনা কেন? এটা বোঝানো যে বাংলাদেশের সারা সর্বনাশ যারা করে তাদের বেশিরভাগকেই অনেকে চেনেন না। আবার তারা কখনো বিচারেরও মুখোমুখি হয় না। আমার ধারণা ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক বিডির মালিক সোহেল ও তার ভাই মিয়া সাত্তার বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে বিজনেস করছেন। কারণ তাদের ওয়েবসাইটে তারা লিখে রেখেছিলেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেরও লোকাল এজেন্ট, সে কারণেই এতো কথা। যদিও এসব এখন আর তাদের ওয়েবসাইটে লেখা নেই।
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান সমালোচনা দুটি:
১. রাশিয়ার ২০০ কিলোমিটারের ভেতর বড় রকম কোনো মানুষের বাস নেই। আর পানির সংস্থান অফুরন্ত। সে তুলনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্বদিকের ওয়াল ঘিরে আছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, এমনকি কেন্দ্রের দেয়ালে আমি গোবর শুকাতে দেখেছি। লাখ লাখ মানুষের বাস গোটা ঈশ্বরদীতে, দ্রুত এতো মানুষ সরানোর কোনো সুযোগ দুনিয়াতে নেই। ফলে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
২. কেন্দ্রটির নির্মাণ ব্যয় বেশ উঁচু। অন্তত এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ দামি। এটা এড়ানো যেত কিনা সেটা ভাবা উচিত। যদিও এসব নির্ভর করে কেন্দ্রের বিনিয়োগ এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার দরকষাকষির ওপর।
যদিও অনেক মানুষ বিশ্বাস করে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প থেকে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ৫ বিলিয়ন ডলার চুরি করেছে। তবে ১২০০ মেগাওয়াটের দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার প্রযুক্তিতে করতে হলে তা কখনই ৭.৬৫ বিলিয়ন ডলারে করা সম্ভব না, দুনিয়াতে এই দামে এরকম দুটি ইউনিট করা সম্ভব হয়নি। তার মানে এই নয় যে, ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে অনেকে মনে করেন, রূপপুর বালিশকান্ডের সাথে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সম্পর্ক রয়েছে। আসল সত্য হলো, রূপপুর বালিশকান্ডের সাথে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। বালিশকান্ড ছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের কেনাকাটা, সেটা এই প্রকল্পের অর্থের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। তবে দেশি ও বিদেশী অনেক মিডিয়াতে বিষয়টি যখন আলাপ হয় বালিশ দুর্নীতির সাথে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প যুক্ত তখন বিষয়টি বেশ হাস্যকর হয়ে উঠে এবং প্রকৃত অপরাধ আড়াল করা হয়।
তার মানে এই নয় যে, শেখ হাসিনা সরকার এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি করেনি। অন্যান্য প্রকল্পের মত এটা ধারণা করা অসঙ্গত হবে না যে, রূপপুর প্রকল্পেও দুর্নীতির ছায়া দীর্ঘ ছিলো। তবে আমরা অন্যান্য জায়গার মত এখানেও মূল ক্রিড়ানককে আড়ালে রেখে আলাপ করছি। মূল আলাপ হওয়া উচিত রাষ্ট্রদূত সাইফুলকে ঘিরে। অথচ তাকে নিয়ে কোনো আলাপ নেই।
দেশের জাতীয় সক্ষমতা কারা ধ্বংস করতে চায় তার একটি উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করব। সেটা সম্ভবত ২০১৮ সালের ঘটনা; একটি বিদেশি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে। তারা রূপপুরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলবে। আমাকে সেখানে ইনভাইট করা হলো। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আলোচনাটি হলো গাজীপুরের সারা রিসোর্টে।
এই বিদেশিদের প্রধান আলোচনা ছিল, বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া বর্জ্য ফেরত নেবে না। কারণ রাশিয়ার বর্জ্য বেলারুশে ডাম্প করছিল, সেটা নিয়েই নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেহেতু রূপপুরের বর্জ্য রাশিয়া ফেরত নিয়ে যাবে সেটা মৌখিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে, কিন্তু লিখিত কোনো চুক্তি তো নেই—সে কারণে রাশিয়া কথা রাখবে না। আর কে না জানে বর্জ্য ব্যবস্থা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান বিষয়। যদিও আজকের জমানায় বর্জ্য দিয়ে আবার পুনরায় এনার্জি বানানো যায় রিসাইকেল করে। আয়োজকদের দাবি, এটা ফোকাস করে আমি যেন টানা লিখি। কারণ, এই কেন্দ্রের সাধারণ বিষয়গুলোও তীব্র পর্যবেক্ষণে আমি রেখেছি।
তীব্র পর্যবেক্ষণে রাখার প্রধান কারণ হলো ওয়াচডগের কাজ করা। সংবাদপত্র বা মিডিয়ার নজরদারি থাকলে কমপ্লায়েন্স থাকবে। এরপর সরকারি দপ্তর থেকে আসল চুক্তি পড়া শুরু করি। বলা যেতে পারে প্রতিদিন একজন কর্মকর্তার রুমে যেতাম, তিনি আমাকে পড়ার সুযোগ দিতেন। সাথে নিতাম নোট। দেখা গেল, এই চুক্তি একটা মহাভারতের মতো। কেজি হিসেবে করলে কয়েক কেজি। সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে বর্জ্য রাশিয়া ফেরত নেবে। আমি আর সেই রিপোর্ট করিনি। আশ্চর্যের ঘটনা হলো সেদিনের সেই অতি নিরাপত্তার আলোচনার আয়োজন সারা রিসোর্টে যিনি করেছিলেন, তিনি বিখ্যাত এক ব্যক্তি, যিনি গত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। আজ এসে মনে হয় রাশিয়ার লোকাল এজেন্ট বা অন্তর্বর্তী সরকারের সেই উপদেষ্টা সবাই ভিন্ন ভিন্ন হলেও সব রসুনের কোয়া আসলে একটি গ্রন্থিতে আটকা বা বাধা। আমরা কখনোই এই বন্ধন ছেদ করে দিতে পারি না। ১৯৭১ সালের পরের রাষ্ট্রে পারিনি, তারপরও কোনোদিন পারিনি। আগামীর কথা জানি না, তবে ইতিহাসে এই এলিট দেশবিরোধী শক্তিকে আমরা কখনোই ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারিনি।
এটা আমাদের স্বীকার করতে হবে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়া বড় ধরনের জাতীয় সক্ষমতার ব্যাপার। সেই সক্ষমতা অর্জনে শেখ হাসিনা ২০১০ সালের পর থেকে পিছপা হননি। এ জন্য আমাদের চড়া দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে—কিন্তু আমরা চড়া দাম দিয়ে হলেও অনেক সময় এরকম একটি গর্বের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক হতে পারতাম না, যে কেন্দ্রটি আগামীতে বাংলাদেশের মূল নিরাপত্তার বড় অনুঘটক হতে পারে। ৩৩তম নিউক্লিয়ার ক্লাবে বাংলাদেশকে স্বাগত জানান। এটা দল বা মতের ব্যাপার না। এটা বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতার ব্যাপার।
রূপপুর আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হোক। আমাদের গর্বের প্রতীক হোক। আমাদের কৃষি, চিকিৎসা কিংবা বিজ্ঞান এমনকি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্র হয়ে উঠুক।
_________________________________
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপার্স


