কারাবাস, বিলম্বিত বিচার ও সংকটে সংবাদমাধ্যম

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩ মে ২০২৬, ৮:০৬পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
কারাবাস, বিলম্বিত বিচার ও সংকটে সংবাদমাধ্যম

স্কেচ: এআই

শেয়ার করুন:

এই মামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনো চার্জশিট দাখিল হয়নি এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগপত্র ছাড়া কাউকে আটক রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার একটি বড় প্রভাব পড়েছে গণমাধ্যমে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বহু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে মামলা দায়ের এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বিস্তৃত কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানায়, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ২৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত প্রায় ২০ মাস ধরে কারাবন্দি—যা বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একই ধরনের অভিযোগে একাত্তর টেলিভিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন সাংবাদিকও গ্রেপ্তার হয়েছেন।

 

বিশ্লেষণ বলছে, এই মামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনো চার্জশিট দাখিল হয়নি এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগপত্র ছাড়া কাউকে আটক রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত? ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় তদন্ত শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেওয়ার কথা থাকলেও এখানে সেই প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হচ্ছে, যা অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

জামিন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ আদালতে জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় চেয়ে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে। কিছু ক্ষেত্রে হাইকোর্ট জামিন দিলেও তা চেম্বার জজ আদালতে গিয়ে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিচার শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকছেন, যা কার্যত ‘বিচারের আগে শাস্তি’ হিসেবে বলে অভিযোগ।

 

এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই আন্দোলনের সময় এবং পরে কিছু সাংবাদিককে ‘পূর্বতন সরকারের ঘনিষ্ঠ’ বা ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই মামলাগুলো কতটা নিরপেক্ষভাবে করা হয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, অনেক মামলার ধরন প্রায় একই এবং একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে, যা একটি প্যাটার্ন নির্দেশ করে।

 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘এই প্রতিটি মামলার ধরন বা প্যাটার্ন প্রায় একই রকম। প্রত্যেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পাঁচটির বেশি করে মামলা দেওয়া হয়েছে।’

 

পরিবার ও স্বজনদের অভিজ্ঞতা এই সংকটের মানবিক দিকটি তুলে ধরে। দীর্ঘ কারাবাস, ব্যাংক হিসাব জব্দ, চিকিৎসা না পাওয়া—এসব সমস্যায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। চার্জশিট না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকার বিষয়টি তাদের জন্য আরও কষ্টকর হয়ে উঠছে। এতে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পেশাগত ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এবং আর্টিকেল ১৯-এর মতো সংগঠনগুলো বলছে, অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে এবং ভিন্নমত প্রকাশে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে।

 

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মামলাগুলো পর্যালোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, আমরা বলেছি যে, এটার সুরাহা হওয়া উচিত। তিনি তো বলছেন যে, আমরা সুরাহা করার চেষ্টা করবো, আপনারা আমাদের লিস্ট দেন।’ তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যদিও বাস্তব ফলাফল এখনো দৃশ্যমান নয়।

 

এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন—দুই ক্ষেত্রেই একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজন, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হতে পারে।

শেয়ার করুন: