ভালোবাসার অর্থ খুঁজে বেড়ানোর শ্রেণি সচেতন কাব্যিক চলচ্চিত্র ‘পাভান’


ছবি: উইকি
সিনেমাটি দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগে, ভালোবাসা সত্যিই কি মায়া? নাকি এর চেয়েও কিছু বেশি? পরিচালক লি জঙ-পিল তাঁর কাব্যিক ঘরানার এই ছবিতে ভালোবাসার অর্থ খুঁজতে গিয়ে দেখান ভালোবাসা হয়তো মায়া নয়, বরং একাকীত্বের অন্ধকারে জ্বলা একটুখানি আলো।
“ভালোবাসা হচ্ছে এক মায়া। যে জালে নিজের প্রিয়জনকে সবার চাইতে আলাদা মনে হয়। কিংবা ধারণা দেয়া হয় ভালোবাসার এই অনুভূতি আজীবন ধরে থাকবে।” এই সংলাপ দিয়েই যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্র ‘পাভান’।
সিনেমাটি দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগে, ভালোবাসা সত্যিই কি মায়া? নাকি এর চেয়েও কিছু বেশি? পরিচালক লি জঙ-পিল তাঁর কাব্যিক ঘরানার এই ছবিতে ভালোবাসার অর্থ খুঁজতে গিয়ে দেখান ভালোবাসা হয়তো মায়া নয়, বরং একাকীত্বের অন্ধকারে জ্বলা একটুখানি আলো। ২০০৯ সালে লেখক পার্ক মিন-গিউ’র উপন্যাস ‘পাভানে ফর আ ডেড প্রিন্সেস’ অবলম্বনে নির্মিত ‘পাভান’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন লি জঙ-পিল । বর্তমানে এটি নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং হচ্ছে।
গল্পটা শুরু হয় সিউলের এক অভিজাত ডিপার্টমেন্ট স্টোরের বেসমেন্ট আর পার্কিং গ্যারেজে। চকচকে শপিং মলের ওপর তলায় যখন দামি পোশাক আর প্রসাধনীর বাহার, ঠিক তখন নিচতলায় চলে অন্য এক জীবন। যাদের সমাজের সৌন্দর্য আর সাফল্যের মাপকাঠিতে কোনও মূল্য নেই--এটা তাদের গল্প। আর এখানেই কাজ করে সিনেমার মুখ্য তিন চরিত্র- লি কিয়ঙ-রক, কিম মি-জঙ আর পার্ক ইয়-হান। তাদের মানসিক টানাপোড়ানের আবেগময় মৃহূর্তগুলো তুলে ধরা হয় ‘পাভান’ সিনেমায়।
মুন সাঙ-মিন অভিনীত লি কিয়ঙ-রক চরিত্রটা প্রথম দেখায় খুব সাধারণ মনে হলেও, ধীরে ধীরে তার ভেতরের জটিলতা বোঝা যায়। নাচের প্রতি তীব্র ভালোলাগা সত্ত্বেও জীবনের তাগিদে এখন সে শুধু পার্টটাইম পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট। আকর্ষণীয় চেহারার হলেও তার চোখে কোনও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস নেই। বরং গভীর শূন্যতা তাকে ঘিরে আছে। ছোটবেলায় বাবার চলে যাওয়া এবং পরে মার মৃত্যু (ধরে নিন, আত্মহত্যা)-- এই ট্রমাগুলো তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। উদ্যমহীন, প্রায় জড়সড় একটা জীবন তার। কিন্তু অদ্ভুত এক কোমলতা আছে তার মধ্যে। তাইতো সহজেই চরিত্রটি সহমর্মিতা জাগায় দর্শকের মনে।
তবে এ মুভিতে আলাদা করে নজর কাড়েন কিম মি-জঙ চরিত্রের গো আ-সঙ। সিনেমায় দেখা যায়, সে একই প্রতিষ্ঠানের পূর্ণকালীন কর্মচারী। নিয়োগ পরীক্ষায় সবার সেরা হওয়া সত্ত্বেও সাদামাটা চেহারা আর বেশভুষায় ব্যাকডেটেড হওয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বেসমেন্টে। আর তার নামের পাশে সেঁটে দেয়া হয় ‘ডাইনোসর’-এর মতো কটুক্তি। গো আ-সঙের অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে মি- জঙ’র একাকীত্ব, লজ্জা আর ধীরে ধীরে নিজেকে মেনে নেয়ার লড়াই দর্শক অনুভব করতে বাধ্য।
বিশেষ করে যখন কিয়ঙ-রক তার দিকে এগিয়ে আসে, তখন মি-জঙ’র বিস্ময় আর অবিশ্বাস দুই চোখের ভাষায় যেভাবে ফুটে ওঠে তা আসলেই অনবদ্য। ‘পাভান’ কিন্তু কোরীয় টিপিক্যাল সিনেমা না, যেখানে নায়িকা একদিন তারা সাদামাটা বেশভূষা ছুড়ে ফেলে, সাজগোজ করে প্রিয়তমার জন্য সুন্দরী হয়ে ওঠে। না। ‘পাভান’ সরাসরি বলে পৃথিবীটাকেই বদলাতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই বদলাতে হবে। মি-জঙকে বদলাতে হবে না।
অন্যদিকে পার্ক ইয়-হান চরিত্রে আছেন বিয়ন ইয়-হান। তিনিও পার্কিং গ্যারেজের একজন সহকর্মী। তারুণ্যের উচ্ছাসে ভরপুর ইয়- হান, কিয়ঙ-রক এবং মি-জঙ-এর মধ্যে সম্পর্ক গড়াতে কিউপিডের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বাইরের উচ্ছাসের আড়ালে লুকানো তার নিজের মানসিক অবসাদ---আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত গড়ায়। এই ঘটনা বাকি দুই চরিত্রের সম্পর্কে যে ছাপ ফেলে, তা ছবিটিকে আরও গভীর করে তোলে।
‘পাভানে’ পরিচালক লি জঙ-পিল গল্পে এনেছেন এক কোমল দৃষ্টিভঙ্গি। সিনোমায় তিনি ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য আর ভালোবাসার সেই নিরাময় ক্ষমতার ওপর খুব সুন্দরভাবে আলোকপাত করেছেন। আর চিত্রগ্রহণ তো অসাধারণ! মৃদু রঙের ব্যবহারে তৈরি হয়েছে এক বিষণœ অথচ স্বপ্নিল জগৎ। আর আছে রাভেল-এর ‘পাভানে ফর আ ডেড প্রিন্সেস’-এর মতো ধ্রুপদী কিছু অংশ, জ্যাজ, রক, পপ -সবকিছু মিলিয়ে এক অনন্য কাব্যিক আবহ নিয়েই এই সিনেমা।
তবে ছবিটি সবার জন্য নয়, প্রচলিত অর্থেও রোমান্টিক ঘরানায় এটি পড়ে না। বরং ধীরলয়ের, অনেকটা ধ্যানের মতো। প্রথমার্ধে এই ধীরতা যেখানে কাজ করে, দ্বিতীয়ার্ধের কিছু তাড়াহুড়ো করা দৃশ্য দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। তবু, সামগ্রিকভাবে বলা যায় -‘পাভান’ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ‘পাভান’ অনুধাবন করায় সমাজের তথাকথিত মডেলে আপনি নাই পড়তে পারেন কিন্তু ভালোবাসা খুঁজে নিতে হয় নিজের মতো করেই। পেয়ে যেতে পারেন নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত অর্থ।
--
*পেনুকা সুলতানা: লেখক ও সাংবাদিক।
ইমেইল: [email protected]



