শত্রু বেছে নিলে শহরও বিপদে পড়ে

তন্ময় ইমরান
তন্ময় ইমরান
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ১৪:০৮পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
শত্রু বেছে নিলে শহরও বিপদে পড়ে

স্কেচ: এআই

শেয়ার করুন:

হামের টিকা নিয়ে যখন দেশে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যখন টিকা মজুত, সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিয়ে আদালত পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছে, যখন এক শিশুকে হাম টিকার বদলে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, ঠিক তখনই কুকুর-আতঙ্ক এত সামনে এল কেন?


ফেসবুকে তার নাম এমডি জিয়াউল হক। খুব কৌতূহল নিয়ে তার প্রোফাইলে গেলাম। আচ্ছা এই ভদ্রলোক, হঠাৎ ‘নিরাপদ শহর চাই’ নাম নিয়ে কুকুরের পেছনে লাগলো কেন! আগে কী করতেন? হামের টিকার আলোচনার সময়ই বা কোথায় ছিলেন? দেখলাম ইনি ‘স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টি’ নামের একটি সংগঠনের আহ্বায়ক। যে সংগঠনটি নিয়ে একটু পরেই কথা বলবো।


তার আগে চীন দেশের একটা ঘটনা দিয়ে লেখাটা শুরু করি। চীনা বিপ্লবের পর দেশটিতে সরকারি আদেশে চড়ুই পাখি মারা হয়েছিল। মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘ফোর পেস্টস ক্যাম্পেইন’-এ চড়ুইকে ঘোষণা করা হয়েছিল ফসলের শত্রু। যুক্তি ছিল, চড়ুই ধান-গম খেয়ে কৃষকের ক্ষতি করে। এরপর মানুষ হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে, বাসা ভেঙে, ডিম নষ্ট করে, পাখীকে উড়তে উড়তে ক্লান্ত করে মাটিতে ফেলে হত্যা করেছিল। রাষ্ট্রের চোখে তখন চড়ুই ছিল ‘সমস্যা’।


কিন্তু প্রকৃতির হিসাব রাষ্ট্রের কর্মসূচির চেয়ে জটিল। চড়ুই শুধু শস্য খেত না; পোকামাকড়ও খেত। চড়ুই কমে যাওয়ার পর পঙ্গপাল ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিস্তার বেড়ে যায়। চীনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পেছনে অবশ্যই আরও বড় বড় কারণ ছিল—ভুল কৃষিনীতি, উৎপাদনের মিথ্যা হিসাব, জবরদস্তি ও সামাজিক ব্যর্থতা। কিন্তু চড়ুই নিধন সেই রাষ্ট্রীয় ভুলের এক ভয়ংকর প্রতীক হয়ে আছে। ভুল শত্রু বেছে নিলে প্রকৃতি পরে তার হিসাব নেয়। প্রকৃতিতে ব্যাঙকে আপনার অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাঙ আবার মশার লার্ভা খেয়ে বাঁচে। তাহলে যে শহরে ব্যাঙ থাকবে না, সেই শহরে মশার উপদ্রব বাড়বে, বিষয়টি চেনা চেনা লাগছে তো?! হ্যাঁ, ঢাকার কথা বলছি, ঢাকায় ব্যাঙ নেই বললেই চলে, ঢাকায় মশার বাড়াবাড়ি রীতিমতো আতঙ্কের।


বাংলাদেশের পথকুকুর নিয়ে আজকের আলোচনা চীন কিংবা ঢাকার ব্যাঙ আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জলাতঙ্কের ভয় দেখিয়ে যখন কেউ কুকুর নিধনের ডাক দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আবার ভুল শত্রু বেছে নিচ্ছি? জলাতঙ্ক ভয়ংকর রোগ, কুকুরের কামড়ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তার সমাধান কি কুকুর মেরে ফেলা? না। সমাধান হলো টিকা, চিকিৎসা, নিউটারিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন বা রিগ নিশ্চিত করা এবং মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া।


জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার লক্ষণ দেখা দিলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু একই সঙ্গে এটি প্রতিরোধযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানুষের জলাতঙ্ক ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কুকুরকে টিকা দেওয়া। কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকার আওতায় রাখা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অর্থাৎ সমাধান অজানা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সমাধানে বাজেট দেব, নাকি আতঙ্ককে রাজনীতির হাতিয়ার বানাব?


বাংলাদেশে জলাতঙ্কে মৃত্যু আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরে কয়েক ডজন মানুষ জলাতঙ্কে মারা গেছেন। এই মৃত্যু কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। তাহলে জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার আমরা কীভাবে ঠিক করব? তথ্যের ভিত্তিতে, প্রতিরোধযোগ্যতার ভিত্তিতে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চিৎকারের ভিত্তিতে? মেরে ফেলা বা নষ্ট করাই যদি সমাধান হতো তাহলে দেশের সকল পুকুর, জলাধার, নদী আমরা ভরাট করবো? বিষয়টি এমন যে মাথাব্যথা হয়েছে তো, তাহলে মাথা কেটে ফেলো?


গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ের পর কয়েকজনের মৃত্যু আমাদের কাঁপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা শুধু ‘কুকুরের সমস্যা’ নয়। এখানে প্রশ্ন আছে—কামড়ের পর ক্ষত ঠিকমতো সাবান-পানি দিয়ে ধোয়া হয়েছিল কি না, হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা ছিল কি না, রিগ ছিল কি না, টিকার কোল্ড চেইন ঠিক ছিল কি না, রোগীরা পূর্ণ ডোজ পেয়েছিলেন কি না। কেউ যদি বলেন, কুকুর কামড়ানোর এক দিনের মাথায় জলাতঙ্ক হয়ে মৃত্যু হয়েছে—তাহলে সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশ্নযোগ্য। কারণ জলাতঙ্কের লক্ষণ সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পরে দেখা দেয়। ক্ষতের স্থান, ভাইরাসের পরিমাণ ও চিকিৎসা শুরু হওয়ার সময়ের ওপর সময় নির্ভর করে। তাই এখানে কুকুরকে একমাত্র দায়ী করে চিকিৎসা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর আড়াল করা বিপজ্জনক।


আরেকটি প্রশ্নও এড়ানো যায় না। হামের টিকা নিয়ে যখন দেশে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যখন টিকা মজুত, সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিয়ে আদালত পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছে, যখন এক শিশুকে হাম টিকার বদলে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, ঠিক তখনই কুকুর-আতঙ্ক এত সামনে এল কেন? এটি পরিকল্পিত ছক—এমন দাবি প্রমাণ ছাড়া করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার কাজ। জনস্বাস্থ্যের বড় ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরাতে কি ছোট আতঙ্ককে বড় করে তোলা হচ্ছে? টিকা ব্যবস্থার ব্যর্থতার জায়গায় কি কুকুরকে শত্রু বানানো হচ্ছে?


এখানে “Students for Sovereignty” নামের প্ল্যাটফর্মটির ভূমিকাও আলোচনায় আসে। এই সংগঠনটি আগে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে আলোচিত হয়েছিল। পাঠ্যবইয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দসংবলিত গ্রাফিতি নিয়ে আন্দোলনের সময় তাদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে। এমনকি টিভি রিপোর্টের বরাতে দেখা যায়, সংগঠনটির কয়েকজন ‘আহত হওয়ার ভান করে মাথায় ব্যান্ডেজও লাগিয়েছিল। টিভি রিপোর্টে ওই সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছিল—এই সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সংগঠন নয়।


ফলে এই প্ল্যাটফর্মের কেউ যদি এখন কুকুর নিধনের পক্ষে স্ক্রিপ্ট বানান, সেটিকে নিছক প্রাণী বা জনস্বাস্থ্য সচেতনতা হিসেবে দেখলেই হবে না। দেখতে হবে এখানে কি আবারও একটি ‘শত্রু’ বানানোর রাজনীতি কাজ করছে? আজ আদিবাসী পরিচয়, কাল পথকুকুর, পরশু বস্তিবাসী, হকার, পথশিশু—ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ভাষায় ‘অপসারণ’ সব সময় খুব পরিচিত শব্দ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—শুরূতেই যে জিয়াউল হকের কথা বলা হয়েছিল, তিনি এমনকি কুকুর নিউটারের সলিউশনেও রাজি নন। বলেছেন, মেরেই ফেলতে হবে। অদ্ভুত না! মব তৈরি করাই তার এবং এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য।


কুকুর নিধনের ভাষা তাই শুধু প্রাণী নিয়ে নয়; এটি নাগরিক নীতির ভাষাও। যে সমাজ দুর্বলকে সরিয়ে দিতে শেখে, সে সমাজ একসময় মানুষকেও একইভাবে দেখে। “ওরা নোংরা”, “ওরা বিপজ্জনক”, “ওদের সরাতে হবে”—এই ভাষা প্রাণী থেকে মানুষে যেতে সময় নেয় না।


ঢাকার পথকুকুর নিয়ে পুরোনো বিতর্কও আমাদের সামনে আছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সময় পথকুকুর স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাণী অধিকারকর্মীরা আদালতে যান। পরে আদালতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কুকুর সরানো হবে না। অথচ একই সময়ে ‘স্ট্রে-ডগ-ফ্রি’ উন্নত শহরের ধারণাও সামনে আনা হয়েছিল। এই দ্বৈততাই আমাদের নীতির সংকট দেখায়। উন্নত শহর মানে প্রাণীহীন শহর নয়। উন্নত শহর মানে মানুষ, প্রাণী, বর্জ্য, জল, সবুজ, জনস্বাস্থ্য—সবকিছুকে একসঙ্গে চিনতে পারা।


ঢাকায় পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে। আলোচনার সুবিধার জন্য ৩৭ হাজার পথকুকুর ধরা যাক। এই ৩৭ হাজার কুকুরকে নিয়ে ভয় ছড়ানো সহজ। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাবে, সমাধান অসম্ভব নয়। ৭০ শতাংশ টিকাদান কাভারেজের জন্য দরকার প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকার আওতায় আনা। মাঠপর্যায়ে কুকুর ধরা, টিকা, সিরিঞ্জ, কোল্ড চেইন, টিম মুভমেন্ট,标记 (মার্কিং) ও ডেটা ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে প্রতি কুকুরে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ধরলে ৭০ শতাংশ টিকাদানে খরচ হবে আনুমানিক ৫১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৭৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ৩৭ হাজার কুকুরের শতভাগ টিকাদানে খরচ হবে প্রায় ৭৪ লাখ থেকে ১ কোটি ১১ লাখ টাকা।


নিউটারিং বা নির্বীজকরণের খরচ বেশি। প্রতি কুকুরে অস্ত্রোপচার, ওষুধ, পরিবহন, অপারেশন-পরবর্তী পরিচর্যা এবং আগের এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়ার খরচসহ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হলে ৩৭ হাজার কুকুরের ৭০ শতাংশ নিউটারিংয়ে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৯ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। শতভাগ নিউটারিংয়ে খরচ হতে পারে প্রায় ৯ কোটি ২৫ লাখ থেকে ১২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।


অর্থাৎ টিকা ও নিউটারিং মিলিয়ে ঢাকায় ৭০ শতাংশ কর্মসূচির মোট খরচ হতে পারে প্রায় ৭ কোটি। শতভাগ ধরলে তা দাঁড়ায় আনুমানিক প্রায় ১০ কোটি টাকা। ঢাকার মতো মেগাসিটির জন্য এই টাকা কি সত্যিই অসম্ভব? মশা মারার ওষুধ, সৌন্দর্যবর্ধন, সড়ক সংস্কার, প্রচারণা, উৎসব আয়োজন—এসবের বাজেটের তুলনায় এটি খুব বড় অঙ্ক নয়। বরং এটি জনস্বাস্থ্য, প্রাণীকল্যাণ ও নাগরিক নিরাপত্তায় সরাসরি বিনিয়োগ।


সারা দেশের হিসাবও এমন অসম্ভব নয়, যদি রাষ্ট্র সত্যিই বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান চায়। দেশে কুকুরের সংখ্যা যদি আনুমানিক ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ধরা হয়, তাহলে ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনতে হবে অর্থাৎ প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার কুকুরকে। প্রতি কুকুরে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ধরে জাতীয় পর্যায়ে ৭০ শতাংশ টিকাদানে খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ২৩ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। শতভাগ টিকাদানে খরচ হতে পারে ৩৩ থেকে ৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু টিকাদানকে জাতীয় অগ্রাধিকার করলে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।


নিউটারিংসহ জাতীয় CNVR কর্মসূচি অবশ্য বড় বিনিয়োগ চাইবে। CNVR হলো পথকুকুরদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধের একটি বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক পদ্ধতি। এটি মূলত প্রাণী নিধনের একটি বিকল্প এবং স্থায়ী সমাধান। এর পূর্ণরূপ হলো: C - Catch (ধরা), N - Neuter / Spay (বন্ধ্যাকরণ), V - Vaccinate (টিকা প্রদান) ও R - Release (ছেড়ে দেওয়া)।


সারা দেশে ৭০ শতাংশ কুকুর নিউটার করতে খরচ হতে পারে প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। টিকা ও নিউটারিং মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ৭০ শতাংশ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা আর শতভাগ ধরলে ৬০০ কোটি টাকার মতো।


শুনতে এই অঙ্ক অনেক বেশি মনে হতে পারে কিন্তু একটি দেশের জনস্বাস্থ্য বাজেটে এই সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিশেষ করে যখন এই বিনিয়োগ মানুষকে জলাতঙ্ক থেকে, প্রাণীকে নিষ্ঠুরতা থেকে এবং শহরকে অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে পারে।


এখানে মশা নিয়ন্ত্রণের বাজেটের সঙ্গে তুলনাটি জরুরি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনগুলোতে বছরে ৩০০ কোটি টাকার মতো বাজেট থাকে মশা নিধনে। দেশের সিটি করপোরেশনে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশ নাগরিক বাস করে, তাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করা হয় ৩০০ কোটি টাকা, আর সারা বাংলাদেশের মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্য ৬০০ কোটি টাকা খুব বেশি? ১৫ শতাংশের জন্য যে টাকা ব্যয় করা হয় তাতে কি ডেঙ্গু বিদায় নিয়েছে? নেয়নি। শুধু নিধনমুখী বা রাসায়নিক-নির্ভর পদ্ধতিতে জনস্বাস্থ্য সমস্যা মেটে না, যদি উৎসস্থল, নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি ঠিক না থাকে। পথকুকুরের ক্ষেত্রেও একই কথা। কুকুর মারলে জলাতঙ্ক যাবে না, যেমন শুধু ফগিং করলেই ডেঙ্গু যায় না।


কুকুর মারার ডাক কেন এত জনপ্রিয়? কারণ এতে হিসাব দিতে হয় না। রিগ নেই কেন—এই প্রশ্ন নেই। টিকা সরবরাহ ভেঙে পড়ল কেন—এই প্রশ্ন নেই। কোল্ড চেইন ঠিক ছিল কি না—এই প্রশ্ন নেই। কামড়ের পর ক্ষত ধোয়ার বার্তা গ্রামে পৌঁছেছে কি না—এই প্রশ্ন নেই। সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডভিত্তিক কুকুর গণনা আছে কি না—এই প্রশ্ন নেই। শুধু বলা যায়: কুকুর মেরে ফেলুন। রাষ্ট্র বেঁচে যায়, ব্যর্থতা বেঁচে যায়, দায় চাপানো হয় প্রাণীর ওপর।


এই জায়গায় “Students for Sovereignty”-এর মতো প্ল্যাটফর্মের কুকুর নিধনমুখী অবস্থান আরও প্রশ্ন তৈরি করে। এই প্রচারণার পেছনে কী আছে? এটি কি সত্যিই জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ, নাকি আবারও একটি ‘শত্রু’ বানানোর রাজনীতি? কোনো ভ্যাকসিন, ওষুধ, কীটনাশক, প্রাণী অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা স্বাস্থ্য-বাণিজ্যিক স্বার্থ কি এই আতঙ্ককে বাজার বানাতে চাইছে? কোনো ফার্মা কোম্পানি, সরবরাহকারী, ঠিকাদার বা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী পক্ষ কি কুকুর-আতঙ্ক থেকে লাভবান হতে পারে? সরাসরি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু জনস্বাস্থ্য আতঙ্ক যখন হঠাৎ সংগঠিত স্ক্রিপ্টে পরিণত হয়, তখন অর্থের পথ, প্রচারণার উৎস, কনটেন্ট তৈরির পেছনের মানুষ, এবং সম্ভাব্য লাভবান পক্ষ—এসব প্রশ্ন করা জরুরি।


কারণ প্রতারণা বা বিভ্রান্তিমূলক রাজনৈতিক প্রচারণার ইতিহাস যাদের আছে, তাদের জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে নতুন নৈতিকতার মুখোশ পরে হাজির হওয়া সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। আজ তারা কুকুরকে ‘জনশত্রু’ বলছে, কাল অন্য কাউকে বলবে। এই ভাষা বিপজ্জনক। এতে বিজ্ঞান থাকে না, থাকে শিকার বাছাইয়ের রাজনীতি।


এখানেই হান্টাভাইরাস ও নগর-ইকোলজির প্রসঙ্গ আসে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ, বর্জ্যনির্ভর শহরে পথকুকুর কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাণী নয়। তারা শহরের অদৃশ্য বাস্তুতন্ত্রের অংশ। খোলা ডাস্টবিন, বাজারের উচ্ছিষ্ট, হোটেলপাড়ার খাবারবর্জ্য, ড্রেনের পাশে জমে থাকা জৈব বর্জ্য—এসবের সঙ্গে কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, মাছি, তেলাপোকা—সবই যুক্ত। এই জটিল ব্যবস্থার একটি অংশকে হঠাৎ মেরে ফেললে বাকিগুলোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।


পথকুকুর কমে গেলে ইঁদুরের খাদ্যপ্রাপ্তি ও চলাচলের সুযোগ বাড়বেই। বিশেষ করে যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। ইঁদুর বাড়লে শুধু বিরক্তি বাড়ে না; বাড়ে ইঁদুরবাহিত রোগের ঝুঁকি। হান্টাভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে আক্রান্ত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর প্রস্রাব, বিষ্ঠা বা লালার সংস্পর্শ থেকে। শুকনো মলমূত্রের কণা বাতাসে মিশে গেলে তা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে।


পথকুকুরের আরেকটি অনানুষ্ঠানিক ভূমিকা আছে। তারা শহরের কিছু খাদ্যবর্জ্য খেয়ে ফেলে। এটি কোনো আদর্শ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়; সভ্য শহরের বর্জ্য কুকুরের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিখুঁত নয়। ফলে পথকুকুরকে হঠাৎ সরিয়ে দিলে একই খাদ্যবর্জ্য পড়ে থাকবে ডাস্টবিনে, ড্রেনে, বাজারের পাশে। সেখানেই বাড়বে ইঁদুর, মাছি, তেলাপোকা। অর্থাৎ কুকুর সরিয়ে আমরা হয়তো এক দৃশ্যমান প্রাণী সরাব, কিন্তু অদৃশ্য ঝুঁকির দরজা খুলে দেব।


আরও একটি বিষয় আছে—শূন্যতাজনিত প্রভাব। কোনো এলাকা থেকে কুকুর সরিয়ে দিলে জায়গাটি স্থায়ীভাবে কুকুরহীন থাকে না। খাবার ও আশ্রয়ের উৎস থাকলে আশপাশ থেকে নতুন কুকুর ঢুকে পড়ে। পুরোনো কুকুরগুলো যদি টিকাদানকৃত, নিউটার করা ও এলাকার মানুষের চেনা হয়, তাহলে তাদের সরিয়ে নতুন, অচেনা, অনটিকাদানপ্রাপ্ত কুকুর আনা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কুকুর নিধন বা স্থানান্তর জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য জনসংখ্যাকে অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে।


যারা কুকুর নিধনের কথা বলেন, তারা কি বলতে পারবেন, নিধনের পর কী হবে? মৃত কুকুরের দেহ কোথায় যাবে? কত কুকুর মারা হবে? কে মারবে? কোন আইনে মারবে? আদালতের অবস্থান কী হবে? প্রাণী কল্যাণ আইন কী বলছে? নতুন কুকুর ঢুকলে আবার কী করা হবে? প্রতি বছর এভাবে হত্যা চলবে? আর এর মধ্যে জলাতঙ্কের টিকা, রিগ, ক্ষত ধোয়া, কোল্ড চেইন—এসবের কী হবে?


সভ্য নগর নীতি এমন হতে পারে না। ঢাকার দরকার একটি pent-up (পূর্ণাঙ্গ) পথকুকুর ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি। প্রথমে ওয়ার্ডভিত্তিক কুকুর গণনা করতে হবে। কোন এলাকায় কামড় বেশি, কোথায় স্কুল-হাসপাতাল-বাজার বেশি, কোথায় বর্জ্য বেশি—এসব চিহ্নিত করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকাদান ও নিউটারিং করতে হবে। কুকুরকে ধরে টিকা ও অস্ত্রোপচার শেষে আগের এলাকায় ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রতিটি কুকুরকে চিহ্নিত করতে হবে। ডেটাবেজ রাখতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও প্রাণীকল্যাণ সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।


Template:একই সঙ্গে মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাও শক্ত করতে হবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা ও রিগ নিশ্চিত করতে হবে। কামড়ের পর সঙ্গে সঙ্গে ১৫ মিনিট সাবান-পানি দিয়ে ক্ষত ধোয়ার বার্তা স্কুল, মসজিদ, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ওয়ার্ড অফিস—সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। টিকার কোল্ড চেইন নজরদারিতে রাখতে হবে। ভুল টিকা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।


চড়ুই পাখি মারার ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—প্রকৃতিকে শত্রু বানিয়ে রাষ্ট্র কখনো জেতে না। রাষ্ট্র সাময়িকভাবে বিজয়ের মিছিল করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি পরে হিসাব চুকায়। চীনের চড়ুই পাখির মতো ঢাকার পথকুকুরকেও যদি আমরা শুধু ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখি, তাহলে হয়তো আমরা আবারও একই ভুল করব।


কুকুর মারলে জলাতঙ্কের টিকা তৈরি হয় না। কুকুর মারলে রিগ হাসপাতালে পৌঁছায় না। কুকুর মারলে হামের টিকা কেলেঙ্কারির জবাব মেলে না। কুকুর মারলে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু কমে না। কুকুর মারলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক হয় না। কুকুর মারলে ইঁদুর কমে না। কুকুর মারলে শুধু আমাদের ব্যর্থতার ওপর রক্তের দাগ পড়ে।


বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। এক পথ আতঙ্কের—কুকুরকে শত্রু বানাও, নিধনের ডাক দাও, জনস্বাস্থ্য ব্যর্থতা আড়াল করো। আরেক পথ বিজ্ঞানের—টিকা দাও, নিউটার করো, চিকিৎসা নিশ্চিত করো, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করো, মানুষকে সচেতন করো, শহরের বাস্তুতন্ত্র বুঝে নীতি বানাও।


সভ্য রাষ্ট্র দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়। কারণ শহর নিরাপদ হয় হত্যায় নয়, ব্যবস্থাপনায়। আর মানুষ মানবিক হয় দুর্বলকে মেরে নয়, তাকে দায়িত্বের ভেতরে এনে।


ও হ্যাঁ, জিয়াউল হক সাহেবের একটি উক্তি না দিয়েই পারছি না—কুকুর পালন নাকি পশ্চিমা সভ্যতা থেকে আসছে! এই রাষ্ট্রে এই মববাজি মার্কা ফালতু কথাকে পাত্তা দেওয়ার মতো লোক আছে জেনে অবাকই লাগে।


কুকুরভীতি ঢাকতে আমরা এমনকি ধর্মের আশ্রয় নিতেও ভুলি না। নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণার এক জগৎ তৈরি হয়েছে। পৃথিবীতে ৬০ ভাগ মানুষ হয়তো বিছানায় শুয়ে মারা যায়, তাই বলে বিছানায় শোয়া ছেড়ে দিতে হবে?

__

*তন্ময় ইমরান: লেখক ও সাংবাদিক

ইমেইল:  [email protected]

শেয়ার করুন: