ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার: চিন্তার জগৎ নাড়া দেয়ার রাজনৈতিক বার্তা


ছবি: উইকি
সিনেমাটির মধ্যে রয়েছে সাহসিকতা, আছে উচ্চাকাঙ্খা। যারা রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি চিন্তার জগতকে একটু নাড়াচাড়া দিতে চান, তাদের জন্যই এই সিনেমা।
পৃথিবীটা এখন এমন এক সময় পার করছে যেখানে যুদ্ধই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা কি যুদ্ধ করতে করতে এখনো ক্লান্ত হই নাই? নাকি এক যুদ্ধ শেষে আমাদের আরেক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে?
২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া পল টমাস অ্যান্ডারসন পরিচালিত রাজনৈতিক অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী চলচ্চিত্র ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’ যেন আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বলে রাখা ভাল, এরই মধ্যে সিনেমাটি ১৩টি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছে এবং সেরা চলচ্চিত্রসহ ছয়টি অস্কার জিতেছে।
চলচ্চিত্রের মূলত একজন প্রাক্তন বিপ্লবী ও তার মেয়ের আত্মরক্ষার লড়াই। সেই সাথে জুড়ে দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র- মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসী শিশুদের তাদের বাবা-মা’র কাছ থেকে বিচ্ছিন্নের ঘটনা এবং মার্কিন শাসক শ্রেণির গোপন অভিযান। থমাস পিনচনের উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’-এর ছায়া অবলম্বনে অ্যান্ডারসন তৈরি করেছেন এক উদ্ভট অ্যাকশন রাজনৈতিক থ্রিলার ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’, যেখানে সংযোজন করেছেন নিজের মতাদর্শিক চিন্তা-ভাবনাও।
চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায়, ‘ফরাসি ৭৫’ নামের একটি বামপন্থী বিপ্লবী দলের সদস্য প্যাট ক্যালহুন ও পারফিডিয়া বেভারলি হিলসসহ অন্যরা অভিবাসন কেন্দ্রে হামলা, সরকারি স্থাপনায় হামলা ও ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালায়। কিন্তু তাদের এই অগ্নিঝরা যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় উচ্চাভিলাষী কর্নেল লকজ নামে এক নির্মম ও বর্ণবাদী সামরিক কর্মকর্তা। ধরা পড়ে পারফিডিয়া। তারপরই শুরু হয় বিপ্লবীদের ধরপাকড়ের অভিযান। কেউ গ্রেপ্তার হন আবার কেউ কেউ বেঘোরে মারা যান। প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে চলে যায় প্যাট ও তার কন্যা। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে চলে এই অতীত ইতিহাস।
এরপর চলে আসা হয় বর্তমানে। অর্থাৎ ১৬ বছর পরের ঘটনায়। যেখান থেকেই মুভির টার্নিং পয়েন্ট। আমরা দেখি প্যাট এখন ‘বব ফার্গুসন’ নামে ক্যালিফোর্নিয়ার এক ছোট শহরে দিন কাটাচ্ছে তার মেয়ে উইলাকে নিয়ে। বব আর সেই বিপ্লবী নেই, বরং সে একজন ছাপোষা অলস মানুষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অতীতের সেই হায়েনা লকজ আবার ফিরে আসে। তার টার্গেট এখন ববের কিশোরী মেয়ে উইলা। শুরু হয় প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান। বিপ্লবী হিসেবে ব্যর্থ হলেও বাবা বব মেয়েকে বাঁচাতে কারাতে শিক্ষক সেনসেই সের্হিওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
সিনেমাটিতে প্যাট ক্যালহুন, ওরফে বব ফার্গুসন চরিত্রে রয়েছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, কর্নেল স্টিভেন জে. লকজের চরিত্রে শন পেন, বিপ্লবী পারফিডিয়া বেভারলি হিলসের ভূমিকায় টিয়ানা টেলর, সেনসেই সের্হিওয়ের চরিত্রে বেনিসিও ডেল টরো এবং ববের কন্যা উইলার চরিত্রে চেজ ইনফিনিটি।
চলচ্চিত্রটিতে সবার অভিনয়ই অনবদ্য। তবে চৌকষ অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওকে এখানে পাই ভিন্নরূপে। এই সিনেমায় তিনি কোনো সুপার হিরো নন, বরং একজন দুর্বল, ভীত, হতাশাগ্রস্থ মানুষ। সময়ের সাথে সাথে বিপ্লবের জোশও যেন ভেসে গেছে। কিন্তু মেয়েকে বাঁচাতে বব যখন নাইটগাউন পরে উদভ্রান্তের মতো রাস্তায় দৌঁড়ান, কিংবা ফোন চার্জ করার জায়গা না থাকায় হাহাকার করেন, তখন দর্শকও নিজেকে বব মনে করতে বাধ্য হন।
আর ১৬ বছর বয়সী উইলা এই গল্পের আবেগিক কেন্দ্রবিন্দু। মা-বাবার বিশৃঙ্খল অতীতের ছায়া থেকে সে অনেকটাই আলাদা। সে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতীক। উইলা চরিত্রে প্রাণ দিয়েছেন চেজ ইনফিনিটি। পরিস্থিতি বিবেচনায় তার যে অভিব্যক্তি এবং নিজের চরিত্রকে ধরে রেখেছেন, সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
এবার আসি, আমাদের সিনোমার ভিলেন কর্নেল স্টিভেন জে. লকজ প্রসঙ্গে। তিনি একাধারে বর্বর, মানসিক বিকারগ্রস্থ ক্যারিশম্যাটিক সেনা অফিসার। শুধু একজন খলনায়কই নন বরং আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের গভীরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রতীক তিনি। আর এই কঠিন চরিত্রটিকে শন পেন এমনভাবে ফুটিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। অনবদ্য অভিনয়ের জন্য বেস্ট সাপোর্টিং ক্যারেক্টর হিসেবে তিনি জিতেছেন অস্কার।
প্রায় তিনঘন্টাব্যাপী ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’ দেখলে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে শেষের দিকে শ্বাসরুদ্ধকর গাড়ি তাড়ার দৃশ্যটি। উঁচু-নিচু পাহাড়ের মধ্য দিয়ে তিনটি গাড়ির যাত্রা এক স্বপ্নময়, সম্মোহনী বলয় তৈরি করে। সিনেমাটির মধ্যে রয়েছে সাহসিকতা, আছে উচ্চাকাঙ্খা। যারা রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি চিন্তার জগতকে একটু নাড়াচাড়া দিতে চান, তাদের জন্যই এই সিনেমা।
____
*পেনুকা সুলতানা: লেখক ও সাংবাদিক।
ইমেইল: [email protected]



