‘দ্য ডিসেন্ট’ এর ‘ফ্রেমিং’-এর কোপানলে প্রথম আলোসহ লিবারেল মিডিয়া

আরিফুজ্জামান তুহিন
আরিফুজ্জামান তুহিন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ৯:০০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
‘দ্য ডিসেন্ট’ এর ‘ফ্রেমিং’-এর কোপানলে প্রথম আলোসহ লিবারেল মিডিয়া

ছবি: ফেসবুক পেজ

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় যেটির চর্চা হয় তা হলো স্রেফ 'সেনসেশনালিজম’ বা চাঞ্চল্যবাদ। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক শ্যান্তো আয়েঙ্গার তাঁর "Is Anyone Responsible?" (১৯৯১) গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন যে, আমেরিকান মিডিয়া কীভাবে সমাজ ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে সম্পূর্ণ 'এপিসোডিক' বা খণ্ডিত করে স্রেফ নাটকীয়তায় পরিণত করে। বাংলাদেশে শিরোনাম তৈরির পদ্ধতিটিও একইভাবে কাজ করে।  

 

গত ১৩ জুন ফ্যাক্ট চেক ও নিউজ সাইট প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য ডিসেন্ট’ (The Dissent)-এ  রবি রবি হোসাইনের "শিরোনামে ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সুবিধা দিচ্ছে প্রথম আলো?" শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশিত হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রথম আলো ও অন্যান্য মূলধারার গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের সংবাদ কাঠামো বা  ফ্রেমিং-এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনকে 'সফট ফ্রেমিং' বা সাধারণ ইতিবাচক পরিচিতি দিয়ে সুরক্ষা দিচ্ছে; এবং বিপরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের বা জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের অতীত ইতিহাস বা বক্তব্য টেনে এনে নেতিবাচক ও অবমাননাকর ফ্রেমে বন্দি করছে।

 

সাধারণ পাঠকের চোখে এবং আবেগের মানদণ্ডে লেখাটি সুলিখিত ও যুক্তিনির্ভর মনে হতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিদ্যা, বৈশ্বিক গণমাধ্যমের তুলনামূলক মডেল এবং সমসাময়িক কয়েক শ সংবাদের ডেটাসেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রবন্ধটি পদ্ধতিগতভাবে চরম ইচ্ছামতো বা সুবিধাজনক ডেটা বাছাই করা যা 'Selection Bias' এবং তাত্ত্বিক ভুল ধারণার বা False Equivalency  ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর মূল অভিযোগগুলোকে অবিকল উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা তত্ত্ব ও প্রায় ১০০টি বাস্তবিক সংবাদ-আর্কাইভের ডেটার আলোকে লেখাটির অ্যাকাডেমিক রিবাটাল তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।

 

প্যারাডক্স, মিডিয়া মডেল ও মনোযোগ অর্থনীতি

 

দ্য ডিসেন্টের বক্তব্য হলো, "প্রথম আলোর শিরোনামের ফ্রেমিংয়ের কারণে মাহদীর (যিনি বলেছিলেন 'থানা পুড়িয়ে দিয়েছি') আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি বেশিরভাগ পাঠকের কাছে হাস্যরসের উপাদান হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যম শুধু স্ববিরোধী প্যারাডক্সটি (থানা পুড়ানোর দাবি করে আবার সেখানেই আশ্রয় নেয়া) সঠিকভাবে পয়েন্ট আউট করেছে এবং পাঠকের সুখানুভূতি নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।" লেখাটিতে আরও দাবি করা হয়, ওইদিন দেশের অন্য ১২টি মিডিয়া যে প্রথম আলোর মতো একই শিরোনাম করেছে, তার পুরো কৃতিত্ব প্রথম আলোর; অর্থাৎ এটি তাদের এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক এজেন্ডা।

 

দ্য ডিসেন্টের এই দাবিটি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত পুঁজিনির্ভর সংবাদমাধ্যমের রীতিনীতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। অ্যাকাডেমিক স্কলার ড্যানিয়েল সি. হ্যালিন এবং পাওলো মানচিনির বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ "Comparing Media Systems: Three Models of Media and Politics" (Cambridge University Press, ২০০৪) অনুযায়ী, বিশ্বে সাংবাদিকতার ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোগত সংস্কৃতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত দুটি মডেল হলো— সোশ্যাল কর্পোরেট বা নর্ডিক মডেল (সুইডেন ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ) এবং লিবারেল কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক মিডিয়া মডেল (আমেরিকা ও কানাডা)।

 

নর্ডিক মডেল বা সুইডিশ প্রেস এথিক্সে একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়। সেখানে একজন অচেনা সাধারণ মানুষ চরম কোনো ভাইরাল উক্তি করলেও, সংবাদমাধ্যম কখনোই তার অতীত রেকর্ড টেনে "অমুক কথা বলা সেই ব্যক্তি" ফ্রেমে ফেলে সংবাদ বানায় না। সেখানে সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে লেখা হয়, "স্টকহোমের ৩২ বছর বয়সী এক যুবক পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন।"

 

কিন্তু বাংলাদেশ কাঠামোগতভাবে আমেরিকান বাণিজ্যিক মিডিয়া মডেলকে হুবহু অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা পুরোপুরি নির্ভর করে 'অ্যাটেনশন ইকোনমি' (Attention Economy) বা মনোযোগ-অর্থনীতির ওপর। এ বিষয়ে নরওয়ের প্রখ্যাত গবেষক ইয়োহান গালটুং ও মারি রুজের ক্ল্যাসিক পেপার "The Structure of Foreign News" (১৯৬৫)-এ উল্লেখিত নিউজ ভ্যালুর ফর্মুলাই ব্যবহার করা হয়, যেখানে 'নেতিবাচকতা' এবং 'অদ্ভুতুড়ে স্ববিরোধিতা'কেই (Oddity) সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়। প্রথম আলো বা অন্য ১২টি পত্রিকা 'থানা পুড়ানোর' বক্তব্যটি ব্যবহার করেছে, কারণ এটি পাঠকের মস্তিষ্ককে খুব দ্রুত আকর্ষণ বা 'হুক' করে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সাধারণ কোনো ব্যক্তি ভাইরাল বা বিতর্কিত হলে তাকে চিরজীবনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাচফ্রেজ দিয়ে ট্যাগ করে ফেলা হয়। এর কয়েকটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হলো:

 

১. আমেরিকার একটি টিভি শোতে এক কিশোরী সামান্য একটি আপত্তিকর মন্তব্য করেছিল, ("Cash me outside")। সেই বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর মার্কিন পত্রিকা দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সিএনএন—সব জায়গায় আজীবন ওই কিশোরীর যেকোনো খবরের শিরোনাম করা হয়েছে "The 'Catch Me Outside' teen..."।

 

২. আমেরিকায় সেন্ট্রাল পার্কে এক শ্বেতাঙ্গ নারী পুলিশে ফেক কল করে ভাইরাল হয়েছিলেন। পরে তাঁর চাকরি হারানো বা অন্য খবরের বেলাতেও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস নামের বদলে ট্যাগ বসিয়েছে: "Viral 'Central Park Karen' loses lawsuit."

 

৩. কানাডায় বারান্দা থেকে চেয়ার ছুঁড়ে ফেলে ভাইরাল হওয়া মেয়েকে টরন্টো স্টার আজও শিরোনাম করে "Chair girl" হিসেবে। আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় সামান্য বাদাম পরিবেশন নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া কোরিয়ান এয়ারলাইন্সের নারী নির্বাহীকে বছরের পর বছর কোরিয়া হেরাল্ড ছেপেছে: "The 'nut rage' executive loses suit" বলে।

 

অর্থাৎ, প্রথম আলো থেকে শুরু করে যমুনা টিভিসহ ১২টি আউটলেট মিলে মাহদী নামের অচেনা এক স্থানীয় ব্যক্তিকে "থানা পুড়িয়েছি বলা সেই মাহদী" লিখেছে ঠিক এই পশ্চিমা পুঁজিনির্ভর সংবাদ কাঠামোর কারণেই, কোনো 'সুখানুভূতি দেওয়া'র ষড়যন্ত্রের জন্য নয়।

 

পরিচিতির অর্থনীতি ও ভুল সমীকরণের ফাঁদ (Apples-to-Oranges Fallacy)

 

দ্য ডিসেন্ট বলছে, প্রথম আলো আন্দোলনকারী মাহদীর ‘অতীত অপকর্ম’ তার বর্তমান হামলার সংবাদের শিরোনামে ঠিকই জুড়ে দিয়েছে। অথচ ওবায়দুল কাদের, সাদ্দাম হোসেন বা শামীম ওসমানের মতো বড় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে হামলার খবরে তাঁদের জুলাই আন্দোলনে ‘গুলিতে নির্দেশ দেওয়ার অতীত অপকর্মগুলো’ শিরোনামে কেন হাইলাইট করা হলো না?

 

এখানে লেখক রবি হোসাইন একটি অখ্যাত স্থানীয় ছাত্রের (মাহদী) সঙ্গে অত্যন্ত সুপরিচিত জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নিউজভ্যালুর তুলনা করে সরাসরি মেথডোলজিক্যাল ক্রাইম বা 'ভুল তুলনার ফাঁদে' পা দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকতার অপরিহার্য তত্ত্ব 'পরিচিতির অর্থনীতি' বা 'Economy of Recognition'-কে ভুল বুঝেছেন। মিডিয়া সোশিওলজির প্রবাদপুরুষ হাওয়ার্ড বেকার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Outsiders: Studies in the Sociology of Deviance" (১৯৬৩)-তে ব্যাখ্যা করেছেন যে, সমাজ-স্বীকৃত বিখ্যাত মানুষকে মিডিয়া কীভাবে দেখে আর একজন অচেনা মানুষের ক্ষেত্রে কীভাবে সূচকীয় 'লেবেল' লাগায়।

 

ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমান বা ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। সংবাদপত্রের একটি সুনির্দিষ্ট জায়গার বাধ্যবাধকতা (Economy of space) থাকে। সাধারণ পাঠকের মুখস্থ আছে যে, এই নেতারা জুলাই-আগস্টের গণহত্যায় ঠিক কী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই নামের সাথে "জুলাই মাসে গুলির নির্দেশদাতা শামীম ওসমান" জুড়লে তা 'নিউজ ভ্যালু'-এর দৃষ্টিতে স্পেস অপচয় মাত্র।

 

কালের কন্ঠ, প্রথম আলো বা দেশ রুপান্তরসহ শীর্ষ পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে একটি শব্দ বারবার শুনেছি, সেটা হলো ‘নিউজ ভ্যালু’। রিপোর্টটি ছাপলে কী পাবলিক ইন্টারেস্ট সার্ভ করবে বা লাভ হবে, তার কোনো একটি থাকতে হবে। প্রতিদিনের আড্ডার কোনো সংবাদমূল্য নেই। কিন্তু সেই আড্ডা থেকে কেউ নোবেল পেলে, তখন নোবেল লরিয়েট আড্ডায় কী বলতেন, তা-ও সংবাদমূল্য পেয়ে যায়।

 

এছাড়া, পত্রিকায় একটি রিপোর্ট কত শব্দের হবে, তা আগেই ঠিক থাকে। প্রথম আলোর প্রথম পেজে প্রতি কলাম ইঞ্চি কালার বিজ্ঞাপনের রেট ৩০ হাজার টাকা। ফলে তারা শব্দ খরচ করার ক্ষেত্রে খুবই রক্ষণশীল। এটাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির আদর্শ। ওদিকে অখ্যাত 'মাহদী'-এর এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক খ্যাতি নেই যে শুধু নাম লিখলেই মানুষ চিনবে। তাই তাঁর ক্ষেত্রে মিডিয়া ‘সূচকীয় শনাক্তকরণ’ (Indexical Identification) ব্যবহার করেছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের সমালোচনায় কখনোই লেখে না— "গোপনে মন্ত্রীত্ব বাগিয়ে নেওয়া সেই মরিসন আজকে বের হয়েছেন", তারা স্রেফ "স্কট মরিসন" নামেই হেডলাইন সারে। আবার 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস' ক্যাপিটলে উসকানির দায়ে অভিযুক্ত ট্রাম্প কোর্টে গেলে শিরোনাম করে না "দাঙ্গা বাঁধানোর নির্দেশদাতা ট্রাম্প আজ আদালতে"; তারা লেখে "Donald Trump arrives at court", কারণ ট্রাম্প নামটিই সমগ্র নেতিবাচকতা বহন করে।

 

কিন্তু ওই ৬ জানুয়ারি দাঙ্গায় স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ডেস্কের ওপর জুতো সমেত পা তুলে দিয়ে বসা সেই সাধারণ লোকটির (রিচার্ড বার্নেট) যখন কারাদণ্ড হয়, তখন অবিকল মাহদীর মতো সূচকীয় ফ্রেমিং ব্যবহার করে নিউইয়র্ক টাইমস লেখে— "The man who put his feet on Pelosi’s desk found guilty." সুতরাং, কাদেরকে ট্যাগ না দিয়ে মাহদীকে ট্যাগ দেওয়াটা সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক বৈষম্য নয়, এটি জাতীয় পরিচিতি ও অপরিচিতির সংঘাত মাত্র।

 

প্যাসিভ ফ্রেমিং, চেরি-পিকিং এবং প্যানোরামিক ডেটা বিশ্লেষণ

 

দ্য ডিসেন্টের দাবি, আওয়ামীপন্থী লোক মার খেলে বা মামলা হলে দলীয় পরিচয় বাদ দিয়ে সফ্ট এবং পজিটিভ পরিচয় (যেমন— অধ্যাপক, মুক্তিযোদ্ধা) সামনে আনা হয়। ধানমন্ডি ৩২-এ আক্রান্ত হলে শিরোনাম হয় "মারধরের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন", অথবা কারও গলায় জুতার মালা পরালে তাঁকে বানানো হয় "বীর মুক্তিযোদ্ধা"।

 

এই দাবিটি সাংবাদিকতার 'স্যালিয়েন্স তত্ত্ব' এবং প্রচণ্ড আকারের 'সিলেকশন বায়াস'-এর ফলাফল। রবার্ট এন্টম্যান তাঁর বহুল উদ্ধৃত থিওরি "Framing: Toward Clarification of a Fractured Paradigm" (১৯৯৩)-তে বলেছেন, ফ্রেমিং হলো খবরের একটি অংশ বাছাই করা এবং সেই অংশটিকে পাঠকের সামনে প্রকট ও নজরকাড়া করে তোলা (Salience)।

 

আওয়ামী লীগের পতনের পর একজন স্থানীয় আ.লীগ নেতার রাস্তায় মার খাওয়া এখন 'নিউ নরমাল'; এটি সাধারণ অবস্থায় পাঠক টানে না। কিন্তু যিনি আক্রান্ত হয়েছেন, তিনি যদি একজন "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক" হন, অথবা যাঁকে জুতার মালা পরানো হচ্ছে তিনি একজন "বীর মুক্তিযোদ্ধা" হন—তখন ঘটনার ট্র্যাজেডি বা সমাজের চিরায়ত মনস্তত্ত্বে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। সম্পাদনা ডেস্ক ওই ধাক্কাটি পুঁজি করে খবরটি দর্শনীয় বানাতেই ওই তকমা হেডলাইনে ফোকাস করে; এখানে কোনো বিশেষ দলবাজি নেই।

 

দ্য ডিসেন্টের সবচেয়ে বড় মেথডোলজিক্যাল ভুল হলো—তারা তত্ত্ব প্রমাণে ৩-৪টি বেছে নেওয়া খবর সামনে এনেছে। অথচ গত কয়েক মাসে অগুণিত তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতার খবরে শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো যে ভয়ংকর নেতিবাচক ও অবমাননাকর (Punitive) শব্দ জুড়ে দিয়েছে, তার বিশালাকার ডেটাসেট লেখক আড়াল করে গেছেন। ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে সাম্প্রতিক কালের অন্তত ৫০টি স্থানীয় খবরের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ‘সফট ফ্রেমিং’-এর দাবিটি ধোপে টেকে না।

 

প্রথম আলো, যুগান্তর, ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪ ও যমুনা টিভিসহ শীর্ষ গণমাধ্যমের ২৫টি আওয়ামী লীগের খবরের ডেটাসেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়— অন্তত ৮৪% সংবাদে সরাসরি "পলাতক", "নিষিদ্ধ সংগঠন" এবং "হত্যা মামলার আসামি"র মতো কঠোর ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন— ‘সাভারে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার পলাতক আসামি আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার’ (প্রথম আলো), বা ‘চাঁদপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিমান্ডে’ (ডেইলি স্টার)। অর্থাৎ আ.লীগ নেতাদের অপরাধ ও আইনি তকমাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

বিপরীতে, সমন্বয়কদের ২৫টি সংবাদের ক্ষেত্রে মিডিয়া পশ্চিমা স্টাইলে মানুষের "আচরণের সূচক" টেনে শনাক্তকরণ করেছে। যেমন— ‘ভুয়া সমন্বয়ক সেজে চাঁদাবাজির সময় যুবককে গণপিটুনি’ (বিডিনিউজ২৪)। অর্থাৎ দুই পক্ষের খবরের ডেটা পাশাপাশি রাখলে পরিষ্কার হয় যে, মিডিয়া কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি, অপরাধ ও বিতর্কের কাঠামো দিয়েই সমাজকে খবর খাওয়ানো হচ্ছে।

 

নির্দিষ্ট দিনের ক্রস-মিডিয়া কভারেজ এবং স্যালিয়েন্স থিওরির প্রয়োগ

 

মিডিয়া সত্যি সত্যিই আওয়ামী লীগের লোক ধরা পড়লে কোনো সফট প্রোটোকল দেয় কিনা, তা নির্দিষ্ট ঘটনার দিনভিত্তিক ডেটা দিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে।

 

ইভেন্ট ১: আওয়ামী লীগ নেত্রীর ধরা পড়ার নজরকাড়া বা 'পানির ট্যাংক' নাটক: গত ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রী নাজনীন সরওয়ার কাবেরী নিজ বাসায় ছাদের পানির ট্যাংকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। ডিসেন্টের তত্ত্ব অনুযায়ী সম্মান বাঁচাতে বা আড়াল করতে "সাবেক নারী নেত্রী আটক" লেখা উচিত ছিল। কিন্তু ওইদিন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ইত্তেফাক থেকে চ্যানেল ২৪ সহ দেশের ২০টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিটিই নেত্রীর পদবির চেয়ে লুকিয়ে থাকার হাস্যকর স্থানটিকে হাইলাইট করে। প্রথম আলোর লিড ছিল 'ছাদের পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার...'। আর যুগান্তর, ঢাকা টাইমস, কিংবা যমুনা টিভির শিরোনাম ছিল— "পানির ট্যাংকের ভেতরে লুকিয়েও রক্ষা পেলেন না আ. লীগ নেত্রী" বা "পুলিশের তাড়া খেয়ে পানির ট্যাংক থেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেপ্তার"। এটিই স্যালিয়েন্সকে পুঁজিতে পরিণত করা।

 

ইভেন্ট ২: নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার ডেটা: ডিসেন্টের দাবি ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে মিডিয়া রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে। অথচ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর, ১৩-১৪ জুন ২০২৬ তারিখে রাজধানীর কুড়িলে দলটির কর্মীদের অতর্কিত ঝটিকা মিছিল ও ১৪ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর থেকে শুরু করে ২০টি প্রধান আউটলেটের একটিও নামের আগে শুধু "ছাত্র সংগঠন" লিখেনি। প্রত্যেকটি গণমাধ্যম অত্যন্ত শক্ত আইনি শব্দ প্রয়োগ করে লিখেছে: "রাজধানীর কুড়িলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিলের সময় ১৪ জন গ্রেপ্তার" বা "নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ১৪ কর্মী কারাগারে"।

 

প্রায় ৪০টি প্রথম সারির শিরোনাম পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই সিদ্ধান্তে আসা যাবে যে, পোস্ট-৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের জন্য মিডিয়া আলাদা কোনো দরদ তুলে রাখেনি। হার্ডকোর রিপোর্টিংয়ের বর্তমান ন্যারেটিভ তা-ই প্রমাণ করছে। কোনো পত্রিকা সাহস করে সম্পাদকীয় বা মূল খবরে দিনের পর দিন বলেনি যে, কারাগারে থাকা কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে বিনা বিচারে আটকে রাখা যায় না, জামিন বা বিচার দিন। এই নীরবতা প্রমাণ করে মিডিয়া রাষ্ট্র ও সেনসেশনের সমান্তরালেই হাঁটে।

 

বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় যেটির চর্চা হয় তা হলো স্রেফ 'সেনসেশনালিজম’ বা চাঞ্চল্যবাদ। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক শ্যান্তো আয়েঙ্গার তাঁর "Is Anyone Responsible?" (১৯৯১) গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন যে, আমেরিকান মিডিয়া কীভাবে সমাজ ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে সম্পূর্ণ 'এপিসোডিক' বা খণ্ডিত করে স্রেফ নাটকীয়তায় পরিণত করে। বাংলাদেশে শিরোনাম তৈরির পদ্ধতিটিও একইভাবে কাজ করে।

 

‘দ্য ডিসেন্ট’-এ লেখক রবি হোসাইন পদ্ধতিগত দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন কারণ তারা এই মূল ক্যাপিটালিস্ট মেকানিজম বা সাংবাদিকতার ভাইরালিটি-ভিত্তিক ব্যাকরণটিকে বুঝতেই ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো নেতার ভারতে পালানো, কোনো নেত্রীর পানির ট্যাংক থেকে ধরা পড়া, কিংবা সমন্বয়কের থানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য—সবকিছুই নিউজ ডেস্কের কাছে 'সেলযোগ্য বস্তু' মাত্র। লেখক সত্যিকার ফ্রেমিংয়ের মূল্যায়ন করতে চাইলে তাঁকে শত শত আওয়ামী লীগ ও সমন্বয়কের ডেটাকে সমান্তরালে তুলনা করতে হতো। তা না করে, সিলেক্টিভ কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে প্রথম আলো বা লিবারেল মিডিয়ার ঘাড়ে রাজনৈতিকভাবে ‘দালাল’ হওয়ার তকমা লাগানোর এই অপচেষ্টা মেথডোলজিক্যাল ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়।

___

*লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপার্স

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন: