চাকরি ফাঁদে লাহোরে গিয়ে কিডনি হারাচ্ছে বাংলাদেশিরা


ভূক্তভোগী বাংলাদেশি শ্রমিক মীর তালহা জুবায়ের আদনান ও মামুন মিয়া
রফিকুলের মত তিনজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে ঢাকা পেপার্সের কথা হয়েছে, তারা জানিয়েছে একটি চক্র বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে কিডনি নিয়ে নিচ্ছে এই প্রতারক চক্র। এরকম অন্তত ১০ জনের খবর জানা গেছে, যারা পাকিস্তানে গিয়ে কিডনি হারিয়েছে।
নরসিংদীর এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান রফিকুল ইসলাম (৩০)। অভাবের সংসারে দায়িত্ব নিতে গিয়ে ২০০৮ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। এরপর নানা কাজ করেও জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে পারেননি। বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলের আশায় শেষ পর্যন্ত গত বছর এক দালালের মাধ্যমে পাকিস্তানের লাহোরে পাড়ি জমান। সেখানে একটি হাসপাতালের ‘মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট’ নামক গালভরা পদে মাসে ৬০০ ডলার বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তাকে। ওভারটাইম হলে আয় দাঁড়াতে পারে হাজার ডলারে—দেখানো হয় এমন প্রলোভনও!
কিন্তু লাহোরে পৌঁছানোর এক মাসের মধ্যেই ভেঙে যায় রফিকুলের সব স্বপ্ন। ঢাকা পেপারসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আহাজারি করে বলেন, “একটি প্রতারক চক্র আমাকে এক মাস ধরে নির্জন কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। পরে গত বছরের আগস্টে আমাকে জোর করে একটি কিডনি দানে বাধ্য করে তারা।”
রফিকুলের মত তিনজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে ঢাকা পেপার্সের কথা হয়েছে, তারা জানিয়েছে একটি চক্র বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে কিডনি নিয়ে নিচ্ছে এই প্রতারক চক্র। এরকম অন্তত ১০ জনের খবর জানা গেছে, যারা পাকিস্তানে গিয়ে কিডনি হারিয়েছে।
রফিকুল ঢাকা পেপার্সসকে জানিয়েছে, অপারেশনের আগে তাকে জানানো হয়েছিল, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকা পাঠানো হবে। তবে অপারেশনের দিন তাকে নগদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং বলা হয় ব্যাংকের কাজের সময় শেষ হয়ে গেছে। পরে বাকি টাকাও আর দেওয়া হয়নি।
রফিকুল বলেন, “আমাকে বলা হয়েছিল, টাকা রেডি আছে, ব্যাংক খুললেই বাকি টাকা অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এরপর আর কোনো টাকাই পাইনি। কোনোভাবে সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে পাসপোর্ট হাতে পেয়েই চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে ফিরে আসি।”
“লোকলজ্জার ভয়ে পরিবার-আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কাউকে কিছু বলতে পারিনি,” যোগ করেন ভাগ্যহত এই যুবক।
তিনি আরও জানান, লাহোরে থাকার সময় তার মতো আরও চার-পাঁচজন বাংলাদেশিকে তিনি একই ধরনের পরিস্থিতিতে দেখতে পান। তাদেরও নানা প্রলোভনে আটকে রেখে কিডনি দানে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কিডনি পাচার: টার্গেট গ্রুপ বাংলাদেশি শ্রমিক
রফিকুলের অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে ঢাকা পেপারস জানতে পেরেছে, একই চক্রের খপ্পরে পড়ে গত এক বছরে অন্তত ১০ বাংলাদেশি শ্রমিক লাহোরে জিম্মি অবস্থায় কিডনি “বিক্রি করতে” বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া কাগজপত্রে এসব কিডনি “আত্মীয়-স্বজনের অনুদান” হিসেবে দেখানো হয় বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি শ্রমিক লাহোর পুলিশে অভিযোগ করলে বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাসেও আলোড়ন তোলে।
লাহোর পুলিশ অভিযানে দুই অভিযোগকারী বাংলাদেশি শ্রমিক মীর তালহা জুবায়ের আদনান ও মামুন মিয়ার পাসপোর্ট উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযুক্ত জাকির হোসেন পাকিস্তানে নিবন্ধিত জাকির ট্রেডার্স (প্রাইভেট) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী বলে কোম্পানির সনদে উল্লেখ আছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশি রোগীদের পাকিস্তানে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার দাবি করে আসছে বলেও জানা গেছে। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানবপাচার ও কিডনি পাচারের একটি চক্র সক্রিয় ছিল কি না, তা তদন্তে পরিষ্কার হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেট গ্রুপ ভূয়া কাগজপত্র বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ‘সত্যায়িত’ করার পরেই লাহোরের হাসপাতালগুলো ‘অঙ্গ প্রতিস্থাপনের’ মতো স্পর্শকাতর অপরারেশন করে।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এই দুই ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাদের “ভালো কাজের সুযোগ”, “বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি” বা “সহজে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা”র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাদের ভিসা, ট্রানজিট এবং আর্থিক সংকটকে ব্যবহার করে ফাঁদে ফেলা হয়। এক পর্যায়ে তাদের শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে কিডনি বিক্রির জন্য চাপ দেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের বলা হয়, একটি কিডনি বিক্রি করলে তারা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পাবে, যা তাদের জীবনের দারিদ্র্য দূর করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রতিশ্রুত অর্থের একটি বড় অংশ দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা নিয়ে নেয়। কেউ কেউ অপারেশনের পর গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে, আবার অনেকে চিকিৎসা সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনেক সময় ভুক্তভোগীদের বৈধ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার নামে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতি বা নৈতিক প্রটোকল মানা হয় না। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও তা গোপনে চালানো হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার বদলের প্রেক্ষাপটে গত বছর দুয়েক ধরে ভারতে বাংলাদেশিদের ভিসা সুবিধা সংকুচিত করা হয়েছে। এ জন্য ‘কাছের বিদেশ’ পাকিস্তানে সম্প্রসারিত হয়েছে চিকিৎসা সেবা। আর ‘অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেনাবেচার’ সিন্ডিকেট চক্র ভারতের পর এখন বেছে নিয়েছে পাকিস্তান, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশকে।
যা বলেছেন ভূক্তভোগিরা
ভূক্তভোগি তালহা ভিডিও বার্তায় ঢাকা পেপারসকে জানান, তার বাড়ি মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার আরপাড়ায়। তার অভিযোগ, মো. জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তি তাকে রোগীর সেবাদানকারী হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাকিস্তানে নিয়ে আসেন। পরে পাসপোর্ট আটকে রেখে কিডনি দিতে চাপ দেওয়া হয়। বিনিময়ে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার।
তালহা বলেন, “এক পর্যায়ে মানসিক চাপে আমি সম্মতি দিতে বাধ্য হই। পরে জানতে পারি, আমাকে রোগীর আত্মীয় হিসেবে দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবে রোগীর সঙ্গে আমার কোনো পারিবারিক বা রক্তের সম্পর্ক ছিল না।”
লাহোর পুলিশে দায়ের করা এজাহারেও তিনি একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। একইভাবে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতলী এলাকার মামুন মিয়া, লাহোর পুলিশকে দেওয়া অভিযোগেও একই ধরনের দাবি করেছেন। তিনিও ভিডিও বার্তায় দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।
তদন্তে নেমেছে লাহোর পুলিশ ও দূতাবাস
ইসলামাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলারের ব্যক্তিগত সহকারি আবু কাউসার টিটু ঢাকা পেপারসকে বলেন, লাহোর পুলিশের তৎপরতার পর দূতাবাস অভিযুক্তদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। তিনি বলেন, “দূতাবাস মানবিক সহায়তায় কাজ করছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।”
তিনি আরও জানান, পুলিশ ও দূতাবাস—দু’পক্ষই পৃথকভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে। অভিযুক্ত জাকির হোসেনকে একাধিক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তার ভিসা এজেন্টকেও তলব করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
লাহোর পুলিশ সুপার হাসান বিল্লালও ঢাকা পেপারসকে জানিয়েছেন, তারা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত জাকিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং অভিযোগকারী দুই বাংলাদেশির পাসপোর্ট উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যা বলছে আন্তর্জাতিক আইন
এই ঘটনায় পাকিস্তানে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দালালচক্রের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মানবপাচার, অঙ্গ পাচার ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে শ্রমিকদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ এখন দুই দেশের কর্তৃপক্ষের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অঙ্গ পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহু বছর ধরে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। তবে সীমান্ত পেরিয়ে সংঘটিত হওয়ায় এই অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যা সমাধানে একক কোনো দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ভুক্তভোগী জানেনই না যে কিডনি বিক্রি আইনত ও নৈতিকভাবে গুরুতর অপরাধ এবং এতে তাদের জীবন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় লাহোরকে ঘিরে কিডনি পাচারের অভিযোগ শুধু একটি শহরের বা দেশের সমস্যা নয়—এটি বৈশ্বিক মানবপাচার ও অঙ্গ বাণিজ্যের একটি কঠিন বাস্তবতা, যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো সহজ সমাধান নেই।



