জুলাই অভ্যুত্থান কেন ‘অক্টোবর বিপ্লব’ হলো না


জুলাই গণ-অভ্যূত্থান বিষয়ে ঢাকা পেপারসের সম্পাদকীয় অবস্থান
১৯১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। রাশিয়ার তৎকালীন রাজধানী পেত্রোগ্রাদের বাতাস শীতে জমে গেছে। মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শরীরের ভেতরের রক্ত জমা হওয়ার দশা। শহরের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তখন পর্যন্ত ১৮ লাখ রুশ সেনা নিহত, ২৫ লাখ বন্দি বা নিখোঁজ। সেনাদের পরিবার খাদ্যর জন্য রুটির দোকানে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। গোটা রাশিয়ায় মৃত্যু, নিখোঁজ ও যুদ্ধে ক্লান্ত সেনাদের পরিবারের ভয়াবহ বিষণ্ণতা আর ক্ষোভের বারুদ স্তূপাকারে জমে আছে পাহাড় হয়ে।
২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে হুট করে প্রকৃতিতে যেন এক রহস্যময় পরিবর্তন এল। এদিন আকাশ পরিষ্কার করে সূর্য উঠল, তাপমাত্রা হুট করে মাইনাস ১৫ থেকে মাইনাস ৫ ডিগ্রিতে উঠে এল। কিন্তু কে জানত, সেই উষ্ণতা তিনশো বছরের পুরোনো রোমানভ রাজবংশের সিংহাসন পুড়িয়ে ছাই করে দেবে?
রাশিয়ার পুরোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সেদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী দিবেসের শোভাযাত্রা পরিণত হলো খাদ্যর দাবি ও যুদ্ধ বিরোধী স্লোগানে। এই ধরনের কর্মসূচি পালন করতে খোদ লেনিনের বলশেভিক পার্টির নেতারা সেদিন নারীদের নিষেধ করেছিল। তবে নারীরা সেই সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি।
নেভস্কায়া কারখানার নারী শ্রমিক আনা ভাসিলিয়েভা লাল কাপড়ের এক টুকরোকে লাঠির মাথায় বেঁধে রাজপথে প্রথম গর্জে উঠলেন, ‘শান্তি ও রুটি’ স্লোগানে। তাত্ত্বিক স্লোগানের বিপরীতে স্রেফ দুটি শব্দের দাবি—‘শান্তি ও রুটি’ যখন উচ্চারিত হচ্ছিল তখন মস্কো-পেত্রোগ্রাদের বলশেভিক নেতারা স্তম্ভিত। রুটি ও শান্তির দাবির স্লোগান দেওয়া বিক্ষোভকারীদের বলশেভিকরা কর্মসূচি না করতে অনুরোধ করেছিলেন। কারণ বলশেভিকরা মনে করতেন, ১ মে শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে তারা একটি সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি নিয়েছে, তার আগে এ ধরনের কর্মসূচি তাদের আসন্ন বিপ্লবকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বলশেভিকদের বাধা উপেক্ষা করে নারী শ্রমিক আনা ভাসিলিয়েভা পাশের মেটাল কারখানার পুরুষ শ্রমিকদের রীতিমতো রাস্তায় বের করে আনলেন। রাস্তায় যখন ট্রাম চলাচল করে আন্দোলনকে বাধা দিচ্ছিল, তখন ট্রাম ডিপোর সাহসী মেকানিক ও চালক নাদেজদা প্রুসাখোভা আড়াআড়িভাবে ট্রাম থামিয়ে দিয়ে সেটির যন্ত্রাংশ খুলে ব্যারিকেড গড়ে তুললেন। এটিই ছিল আন্দোলনের প্রথম সফল প্রতিরোধ।
এরপর ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় যখন জারের ভয়ংকর ‘কসাক’ বাহিনী বন্দুক উঁচিয়ে সামনে আসে। জারের আদেশে এই বাহিনী রক্তবন্যা বইয়ে দিতে দ্বিধা করত না। ১৯০৫ সালের ব্যর্থ বিপ্লবের সময় কসাকদের ভূমিকা ছিল এমনটাই। তবে ২৫ ফেব্রুয়ারি কসাকদের চেনা চরিত্রের উল্টো দৃশ্য ধরা পড়ল।
পেত্রোগ্রাদের রাজপথে মারিয়া প্রিভিলেজভা নামের এক সাধারণ নারী শ্রমিক অশ্বারোহী কসাক বাহিনীর ঘোড়ার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, "আমাদের ভাই-স্বামীরা সীমান্তে মরছে, আর তোমরা এখানে আমাদের না-খেতে-পাওয়া পেটে গুলি মারতে এসেছ?" এই আবেগঘন ও মানবিক আহ্বান কুখ্যাত হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কসাক সেনাদের মনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ফেলল। ভয়ংকর কসাক বাহিনী রাইফেল নিচু করল। সেদিনই প্রথম জারের রক্ষীবাহিনীর নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল। পরিস্থিতি যে ভয়াবহ দিকে মোড় নিচ্ছে এটা আন্দাজ করেই পরেরদিন বলশেভিকরা আন্দোলনে যোগ দিলেন।
জারের শেষ আদেশে ২৬ ফেব্রুয়ারি যখন আবারও সেনারা গুলি চালাল, ২৭ ফেব্রুয়ারি তা বিদ্রোহে রূপ নিল। পেত্রোগ্রাদের মূল বাহিনীগুলো শুধু যে গুলি চালাতে অস্বীকার করল তা-ই নয়, তারা ব্যারাকে অফিসারদের বন্দি করে বিদ্রোহীদের সাথে হাত মেলাল। কয়েক হাজার সেনা জারের আদেশ অমান্য করে শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিল।
২ মার্চ জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং একই দিন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরদিন, ৩ মার্চ, তাঁর ভাই গ্র্যান্ড ডিউক মিখাইল সিংহাসন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তিন শতাব্দীর রোমানভ রাজবংশের শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
ঠিক ১০০ বছরের বেশি সময় পর, ২০২৪ সালের জুলাই মাস। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মধ্যে বাংলাদেশের রাজপথে যে আন্দোলনের শুরু হয়েছিল, তার চলনও ছিল ঠিক একই রকম। শুরুতে এটি ছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ এক শ্রেণির শিক্ষার্থীর আন্দোলন। কিন্তু এর আগের সাড়ে ১৫ বছরের একাধিপত্যবাদী শাসনের নিচে জমে থাকা মানুষের নিঃশব্দ ক্ষোভের আগুন ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ঢাকা থেকে পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই অভ্যুত্থানটি জুলাইয়ের প্রখর রোদে যে বিপুল সংখ্যক মানুষের রক্তে প্লাবিত হলো, সেখানে কেবল ছাত্র ছিল না, ছিল লাখ লাখ সাধারণ শ্রমজীবী ও দলহীন মানুষ।
জুলাইয়ের এই রাজপথের মরণপণ লড়াইয়ে আমরা ঠিক ১০৭ বছর আগের পেত্রোগ্রাদের প্রতিচ্ছবি দেখলাম বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে। ছাত্র-জনতার ওপর যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল তখন দেশের সামরিক বাহিনীর ভেতরেও একটি নীরব ও প্রবল প্রতিরোধের ঢেউ ওঠে। বিশেষ করে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
৩ এবং ৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর সিনিয়র পর্যায়ের একটি সম্মেলনে দেশের বর্তমান তরুণ লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন ও মেজরদের পক্ষ থেকে এমন সংবাদ পৌঁছায় যে, তারা নিজ দেশের সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের ওপর আর গুলি চালাবেন না। জুনিয়র কর্মকর্তাদের এই প্রকাশ্য অবাধ্যতা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণে শীর্ষ কর্মকর্তারা বাধ্য হন একটি নতুন পথ খুঁজতে। ৪ আগস্ট সেনা সদরের ভেতর হওয়া সেই গোপন অস্বস্তি আর সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবিতে তরুণ সেনাদের একাত্মতা প্রকাশের ফলে ৫ আগস্ট সেনাপ্রধানের বিবৃতি অন্য মাত্রা পেল। সেনাদের এই নৈতিক বিদ্রোহ গোটা আন্দোলনে বাস্তবের একটা সামরিক শক্তি পেল সাধারণ মানুষ। পেত্রোগ্রাদের কসাক বাহিনীর রাইফেল নিচু করার দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল ঢাকার জুলাইয়ে।
ব্যানারহীন মানুষের রক্ত ও ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার
হাসিনা সরকারের পতনের জন্য যারা প্রাণ দিল, পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায় তারা এক অর্থে ‘ব্যানারহীন’ বা দলহীন। কোনো দলীয় পরিচয়ে সেদিন তারা রাজপথে নামেনি। রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় যে নারীরা প্রথম স্লোগান তুলেছিল বলশেভিক পার্টির নিষেধের পরও, সেই নারী নিজে বলশেভিক হলেও তখন আর তাকে বলশেভিক বলা যায় না। তার বলশেভিক সত্তা বরং খারিজ করেই সেদিন তারা মাঠে নেমেছিল। বাংলাদেশে জুলাইতে যারা মাঠে নেমেছিল কোনো রকম রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা না ধরে, তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে কিন্তু সেদিন তারা নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে মাটিচাপা দিয়েই রাজপথে নেমেছিল।
যারা জুলাই ও আগস্ট মাসে জীবন দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ এমন মানুষ, যাদের জীবনে বিসিএসসহ কোনো সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করার মতোই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। নিহত প্রায় এক হাজার মানুষের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি হলেন এই নিম্নবিত্ত প্রান্তিক পেশাজীবী। ৪০ জনের বেশি রিকশাচালক মারা গেছেন ঢাকা ও এর আশেপাশে। এরা কেউ কোটা সুবিধার জন্য বা বিসিএস পদের জন্য রাস্তায় মরেনি। এরা মরেছে মুক্তির স্বাদে—ঠিক সেই রুটি আর শান্তির জন্য যেমনটি ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার মানুষ মরেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, বিপ্লবে যারা প্রাণ দেয়, সেই রাজপথের আসল বিপ্লবীরা কোনো কালেই সরকার গঠন করতে পারে না। ২ মার্চ রাশিয়ায় যে অন্তর্বর্তী সরকার হলো, তাতে জারের পালঙ্ক উল্টে দিয়ে যারা গদিতে বসল, তারা ছিল শিক্ষিত ধনিক ও মধ্যবিত্ত লিবারেল সমাজ। রাশিয়ার লিবারেল দল ‘ক্যাডেট’ ও মেনশেভিকরাই মূলত এই নতুন শাসন দখল করে নিল। তারা শ্রমিকদের প্রাণের চেয়ে রাজনৈতিক কূটনীতিকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ড থেকে ট্রেনের ভেতর লুকিয়ে রাশিয়ায় ফিরলেন এক ‘পাগলাটে’ নেতা—ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। ৪ এপ্রিল তিনি পেত্রোগ্রাদে নেমেই এক বিখ্যাত ভাষণ দেন যা ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
এপ্রিল থিসিসের ৩টি প্রধান দফা:
১. অন্তর্বর্তী সরকারকে সম্পূর্ণ বর্জন: লেনিন বললেন, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর গঠিত এই বুর্জোয়া সরকারকে কোনো সমর্থন দেওয়া যাবে না। তারা শ্রমিকদের শত্রু এবং বিপ্লবের অসমাপ্ত রূপ মাত্র। তাদের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে জনগণের পরিষদ বা ‘সোভিয়েত’-এর হাতে দিতে হবে।
২. শান্তি ও রুটি (অবিলম্বে যুদ্ধের অবসান): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল ধনিকদের যুদ্ধ। লেনিন জোর দিলেন রাশিয়াকে এই যুদ্ধ এখনই ছাড়তে হবে যাতে মানুষ খাদ্যের জোগান পায়।
৩. ভূমি ও ব্যাংক জাতীয়করণ: ব্যক্তিমালিকানাধীন সমস্ত আবাদি জমি ও ধনিকদের ব্যাংক বাজেয়াপ্ত করে তা সাধারণ চাষি ও শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল ব্যাংক বা গণ-তহবিল গঠন করতে হবে।
এপ্রিল থিসিসের সেই ঐতিহাসিক ভাষনের দিন পেত্রোগ্রাদের রাজনৈতিক নেতারা লেনিনকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর নিজ দলের নেতারা যেমন লেভ কামেনেভ, জোসেফ স্তালিন, গ্রিগরি জিনোভিয়েভ, মিখাইল কালিনিন পর্যন্ত লেনিনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
এর মধ্যে জিনোভিয়েভ লেনিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সাথে একই ট্রেনে সুইজারল্যান্ড থেকে ফেরা সত্ত্বেও, জিনোভিয়েভও প্রথমে লেনিনের এমন চরম পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি কামেনেভের মতোই বুর্জোয়া বিপ্লবের ধাপগুলো আগে শেষ হওয়ার পক্ষে ছিলেন।
এপ্রিল থিসিস পেশ করার পর বলশেভিক দলের ভেতরে লেভ কামেনেভের মতো অনেক "পুরোনো বলশেভিক" অভিযোগ করেছিলেন যে, লেনিন নিজেই এখন 'ট্রটস্কিবাদী' হয়ে গেছেন এবং তিনি ট্রটস্কির 'স্থায়ী বিপ্লব' তত্ত্ব চুরি করেছেন!
লেনিন এবং ট্রটস্কির মাঝে দীর্ঘদিন ধরে বিপ্লবের ধাপ নিয়ে যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব ছিল, লেনিনের "এপ্রিল থিসিস" তা মুছে দেয়। ট্রটস্কি বুঝতে পারেন যে লেনিনের এবং তাঁর লক্ষ্য এখন সম্পূর্ণ অভিন্ন। এই মিলনের সূত্র ধরেই ট্রটস্কি এবং তাঁর অনুসারীরা মেজরাইওনতসি (রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি। রাশিয়ার বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা ফ্রন্ট) ১৯১৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বলশেভিক দলে যোগ দেন। পরবর্তীতে লেনিনের বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লব সংগঠিত হয়।
এপ্রিল থিসিসটি বলশেভিকদের পার্টি পত্রিকা প্রাভদায় ছাপার সময় সম্পাদক ডিসক্লেইমার জুড়ে দিয়েছিলেন যে এটি লেনিনের একান্ত ‘ব্যক্তিগত মত’। কিন্তু তিন মাস লড়ে লেনিন তৃণমূল কর্মীদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই লিবারেল বুর্জোয়ারা জনগণের ক্ষুধা মেটাবে না। শেষ পর্যন্ত সেই ‘থিসিস’ বলশেভিকদের গাইডলাইন হয় এবং নভেম্বর (পুরাতন অক্টোবর) বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠিত হয়।
কেন জুলাই অভ্যুত্থান অক্টোবর বিপ্লব হলো না?
৮ আগস্ট ২০২৪ সালে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। সেখানে ছাত্রদের প্রতিনিধি ছিল মাত্র ২ জন। আর যারা সেখানে উপদেষ্টা হলেন তারা কেউ রাজপথের আন্দোলনের লোক না, শ্রমিক ও ছাত্রদের প্রতিনিধি না।
শ্রেণিগতভাবে ডক্টর ইউনূস কিংবা উপদেষ্টা পরিষদের বড় অংশই রাশিয়ার সেই ‘ক্যাডেট’ বা লিবারেল সমাজের কাছাকাছি। তাঁরা শিক্ষিত, বৈশ্বিক এলিট সমাজভুক্ত এবং সংস্কার বলতে তারা বোঝেন প্রথাগত লিবারেল ডেমোক্রেসি। তাঁরা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত প্রতিনিধি। ফলে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শেখ হাসিনা সরকার উৎখাত হলেও আরও বড় ডাকাত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেল গোটা দেশ।
জুলাই আন্দোলনে যারা বুক চিতিয়ে মরল—সেই রিকশাচালক, গার্মেন্ট কর্মী, ফুটপাথের হকার, ছোট দোকানের কর্মচারী, মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ কিংবা অখ্যাত সব মানুষের জীবনের ভাগ্যের কী মৌলিক পরিবর্তন আসবে তার রূপরেখা কোথাও স্পষ্ট ছিল না। বরং ইউনূস সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের এমন এক দাসত্বের চুক্তি করল যা নতুন করে বাংলাদেশকে সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশে পরিণত করল।
হাসিনার পতনের পরই রাজপথে জেগে উঠল সালাফিস্ট ও ধর্মান্ধ উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো। যে নারীরা মধ্যরাতে গুলি খেয়ে হাসিনা হঠালেন, পতনের দুদিন পরেই তাঁদের পোশাক, তাঁদের চলাফেরা এবং তাঁদের নাগরিক স্বাধীনতাকে টুঁটি চেপে ধরার এক নোংরা খেলা শুরু করল এই জিহাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ঠিক এখান থেকেই অভ্যুত্থান তার অক্টোবর বিপ্লবের স্তরে যাওয়ার সুযোগ হারালো। জুলাই অভ্যুত্থানের পুরো নেতৃত্ব ও ক্ষমতা সুসংহত হলো ফার রাইট ইসলামপন্থীদের হাতে।
এরপর দেশের একের পর এক মাজার ভাঙা হলো, পীরকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হলো, হিন্দু দীপু চন্দ্র দাশকে পুড়িয়ে মারা হলো। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের ওপর আক্রমণ হলো। দেশের বড় দুই মিডিয়া প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুন লাগানো হলো, উদীচী ছায়ানটকে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটল। এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ অক্টোবর বিপ্লবের ঠিক উল্টোমুখে হেঁটে একটা ব্যর্থ সিরিয়ার দিকে পা বাড়াল।
জুলাই এখন অবস্থান করছে ‘পুরাতন ব্যবস্থার সংস্কার’ আর ‘অন্ধকারের প্রত্যাবর্তন’ এই দুই মেরুর মধ্যে।
আমাদের রাজনীতির সাবেক বামপন্থীদের একটা বড় অংশ লেনিনীয় শিক্ষা ভুলে অন্তর্বর্তী সরকারের মোক্ষ লাভে ব্যস্ত থেকেছে। তরুণ ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সেভাবে পোক্ত না হয়ে ওঠায় তারা ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি দিয়ে গোটা আন্দোলনের ফল নিজ নিজ স্বার্থে ব্যবহার করল।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে লেনিন ফিরতি পথ দেখিয়েছিলেন তাঁর ‘এপ্রিল থিসিস’ দিয়ে। বাংলাদেশের সামনেও এরকম একটি সুযোগ ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পর, সেই ট্রেন মিস করেছে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তি। সামনে আরেকটি বড় ঢেউ আসন্ন। আর এবার সেই ঢেউয়ে ফার রাইটদের উত্থান আরও গতি নিয়ে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে, সাথে আমেরিকা-তুরস্ক রয়েছে। সেই ঢেউয়ে গোটা বাংলাদেশ একটি অকার্যকর ব্যর্থ রাষ্ট্র হলেও অবাক হবার কিছু নেই। কারণ আমাদের বামপন্থী প্রগতিশীলদের কোনো প্রস্তুতি তো দূরে থাক, এটা নিয়ে ভাবনাগুলোও পরিষ্কার না।
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।
ইমেইল: [email protected]



