ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের টানাপোড়েন


ছবি: পিক্সেল
দুই মিত্র দেশের মধ্যে গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে চিত্রটি পরিষ্কার হয়: ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে চাইছেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখতে চান। এই নীতিগত ফাটল থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রকাশ্য বাক্যবিনিময়ের জন্ম।
রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের জন্ম ও টিকে থাকার অন্যতম শর্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার (১৪ই মে ১৯৪৮) ১১ মিনিটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র স্বিকৃতি দেয়। সে হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের আজন্ম মিত্র বলা যায়। গত ৭৮ বছরের ইতিহাসে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে রয়েছে। বলা তবে মধ্য প্রচ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে কখনও কখনও সে সম্পর্কে যে তিক্ততার জন্ম হয়নি, তা বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি
└─────────────────────────────┘
▼ ▼ ▼
ইসরায়েলের সুরক্ষা পেট্রোডলারের সুরক্ষা ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক
ও কৌশলগত জোট আধিপত্য (ইরান দমন)
যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণে আরব দেশগুলোর ভূখন্ড ব্যবহার করছে। এর ফলে ইরানের সাথে অন্যান্য আরব দেশগুলোর সম্পর্কে স্থায়ী অবিশ্বাসের বীজ বপন সম্ভব হয়েছে বলা যায়। এর বিপরীতে সেই ইরানকে কেন্দ্র করেই আজ উল্টো ওয়াশিংটন – তেল আবিব সম্পর্কে অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। Axios বা Times of Israel এর মত সংবাদ মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, গত ১ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে হওয়া এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে 'ক্ষ্যাপা' ও 'কৃতজ্ঞতাহীন' বলে অভিহিত করেন । মাত্র কয়েকদিন পর, পেন্টাগন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি তৎপরতা জোরদারের প্রমাণ পেয়ে সতর্কতার মাত্রা সর্বোচ্চ (Critical) স্তরে উন্নীত করে ।
দুই মিত্র দেশের মধ্যে গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে চিত্রটি পরিষ্কার হয়: ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে চাইছেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখতে চান। এই নীতিগত ফাটল থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রকাশ্য বাক্যবিনিময়ের জন্ম।
দ্বন্দ্বের পটভূমি: যুদ্ধ বনাম আলোচনা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়। ট্রাম্প প্রশাসন চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে সামনে রেখে তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে চলমান সংঘাত ও ইরানের ওপর হামলা জোরদারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বারবার আলোচনার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে ইসরায়েল।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এই নীতিগত দ্বন্দ্বই সাম্প্রতিক সব টানাপোড়েনের মূল কারণ। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সময় নিশ্চিত করতে চান যে, ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা যাতে সেই প্রক্রিয়াকে পণ্ড না করে।
উত্তপ্ত ফোনালাপ: ‘আমি না থাকলে তুমি জেলে থাকতে’
এই নীতিগত দূরত্বের প্রেক্ষাপটেই ঘটে গত সপ্তাহের উত্তপ্ত ফোনালাপ। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "তুমি ক্ষ্যাপা। আমি যদি না থাকতাম, তুমি এখন জেলে থাকতে। আমি তোমার আসল রক্ষাকারী। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে"। একপর্যায়ে তিনি নেতানিয়াহুকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, "তুমি কী করছো?"
ধারণা করা যায়, লেবাননে ইসরায়েলের অতিরিক্ত সামরিক তৎপরতা ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় চরম বিরক্ত ছিলেন ট্রাম্প। উত্তপ্ত আলাপের পরই ইরানের কাছে ‘আস্থা’ ফেরাতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কার্যত ‘ম্যানেজ’ করতে বাধ্য হন এবং ফোনালাপের তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে ইরানকে ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যুদ্ধ শেষ করতে চায়।
গুপ্তচরবৃত্তির প্রমাণ: ‘ক্রিটিক্যাল’ সতর্কতা
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ফাঁস হয় আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পেন্টাগনের গোয়েন্দা শাখা ডিআইএ (DIA) ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তির হুমকির মাত্রা ‘ক্রিটিক্যাল’ (সর্বোচ্চ) পর্যায়ে উন্নীত করেছে ।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও আল জাজিরা জানাচ্ছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের (যেমন- ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও পেন্টাগনের কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি) ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। লক্ষ্য ছিল হোয়াইট হাউসের ইরান নিয়ে ভাবনা ও কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। ডিআইএ’র মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ‘হিউম্যান এস্পিওনেজ’ ও ‘টেকনিক্যাল ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ’ করার ক্ষমতা বর্তমানে ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে একাধিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন কর্মকর্তাদের ডিভাইসে গুপ্তচর ম্যালওয়্যার স্থাপনের চেষ্টা ও শীর্ষ কূটনীতিকদের বার্তা ইন্টারসেপ্ট করার ঘটনা।
নতুন সংযোজন: সামনে মার্কিন নির্বাচন ও ঘরোয়া রাজনীতির সমীকরণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম দ্বন্দ্বের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, প্রায় সবার ধারণা এই নির্বাচনে ভরাডুবি হবে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু বিষয়ে তখন তাঁকে আরো বেশী নির্বাহি ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ওই সব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নাও করতে পারেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করছেন, তার অন্যতম হলো- তিনি মার্কিন ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তহীন যুদ্ধ থেকে মুক্ত করবেন। অথচ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়েছে। এবং ঠিক কোন কোন মার্কনি স্বার্থ রক্ষার জন্য এই যুদ্ধ তা গত ১০০ দিনে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থ হয়েছেন। মার্কিন নাগরকিদের মধ্যে পরিচালিত জরিপেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে জড়ানোটাকে তাঁরা অপ্রয়জনীয় মনে করছেন। জোর সমালোচনা রয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় হোয়াইট হাউস ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ায়। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই যেকোনো মূল্যে ইরানের সাথে একটি শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করতে চান, যা নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী বলছে?
ট্রাম্প প্রশাসন এখন তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জোট ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনা সফল করতে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হতে হলে ইসরায়েলের ‘সহযোগিতা’বা চুপ থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, কোনো মিত্র দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তি আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির লঙ্ঘন। ইসরায়েলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যদিও ইসরায়েলি দূতাবাসের মুখপাত্র এই অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন এবং হোয়াইট হাউজও জনসমক্ষে এটি অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে।
ট্রাম্প নিজে অবশ্য জনসমক্ষে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে বলেছেন যে, তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পছন্দ করেন’ এবং ‘ভালো কাজ করেন’। কিন্তু গোয়েন্দা সতর্কতার স্তর, ব্যক্তিগত ফোনালাপের রুক্ষ ভাষা এবং সামনে মার্কিন নির্বাচনের তীব্র চাপ ইঙ্গিত দেয়—চলতি যুদ্ধের গতিপথ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনগুলোতে এই দুই মিত্রের সম্পর্ক আরও টালমাটাল হতে পারে।”
তবে থিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতাকে সরাসরি ব্যাহত না করলেও, ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের মনে ইসরায়েলের "অতি-আক্রমণাত্মক গোয়েন্দা সংস্থা" সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট আরও গভীর করবে।
_____________________
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References):
1. Axios / Times of Israel Report: গত ১ জুনের ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপ, যেখানে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে "পাগল" (Crazy) ও "কৃতজ্ঞতাহীন" বলেন এবং "আমি না থাকলে তুমি জেলে থাকতে" বলে মন্তব্য করেন, তা মার্কিন রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সূত্রে প্রথম ফাঁস হয়। [Times of Israel - Trump reported to blast Netanyahu in tense call]
2. The New York Times / Al Jazeera Report: পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (DIA) কর্তৃক ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তির সতর্কতা 'ক্রিটিক্যাল' স্তরে উন্নীত করা এবং স্টিভ উইটকফ ও এলব্রিজ কোলবির ওপর নজরদারির সাত পৃষ্ঠার গোপন নথি ফাঁসের খবর। [Al Jazeera - Pentagon said to raise threat level on Israel spying to critical]
3. The Times of Israel (June 2026): ইরান কর্তৃক ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুকে পাল্টা হামলা না করার সরাসরি নির্দেশ, যেখানে ট্রাম্প বলেন "সিদ্ধান্ত আমি নিচ্ছি, নেতানিয়াহু নয়" এবং ওয়াশিংটনের তেহরান চুক্তির অগ্রগতি বিষয়ক প্রতিবেদন। [Times of Israel - Iran fires missiles at Israel, Trump tells Netanyahu not to retaliate]
*লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা পেপার্স
ইমেইল: [email protected]



