ফারাক্কা দিবস: পদ্মায় পানি ফিরবে কবে?

ডিপি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১৪:২৩পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
ফারাক্কা দিবস: পদ্মায় পানি ফিরবে কবে?

ফারাক্কা লংমার্চের জনসভায় মওলানা ভাসানীর ভাষণ, লংমার্চ

শেয়ার করুন:

মওলানা ভাসানীর লংমার্চ মূলত একটি বার্তাই দিয়েছিল—নদী ও পানির প্রশ্ন কেবল পরিবেশগত নয়, এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্ন। অর্ধশতক পরেও সেই বার্তার গুরুত্ব এতটুকু কমেনি।

 

আজ (১৬ মে) ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই লংমার্চ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং বাংলাদেশের নদী, পরিবেশ ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশ্লেষণ বলছে, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরেই বাংলাদেশ বুঝতে শুরু করে, অভিন্ন নদীর উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার দেশের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সেই বাস্তবতা থেকেই রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয়েছিল লাখো মানুষের ঐতিহাসিক পদযাত্রা।

মওলানা ভাসানীর লংমার্চ মূলত একটি বার্তাই দিয়েছিল—নদী ও পানির প্রশ্ন কেবল পরিবেশগত নয়, এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্ন। অর্ধশতক পরেও সেই বার্তার গুরুত্ব এতটুকু কমেনি।

 

ইতিহাস বলছে, লংমার্চের মূল ইস্যু ছিল ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এলাকায় নির্মিত এই বাঁধ ১৯৭৫ সালে চালু হওয়ার পর থেকেই গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির প্রবাহ কমতে শুরু করে। বাংলাদেশ অভিযোগ করে আসছে, শুষ্ক মৌসুমে ভারত গঙ্গার পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নেয়ায় পদ্মায় মারাত্মক পানি সংকট তৈরি হয়। এর ফলে নদীর নাব্যতা কমে যায়, চর জেগে ওঠে, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে।

 

ফারাক্কা লংমার্চের তাৎপর্য ছিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ভাসানী সেই সময় সরাসরি ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের জন্য ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কানসাটের জনসভায় তার বজ্রকণ্ঠের ভাষণ লাখো মানুষকে আন্দোলিত করেছিল। সেই আন্দোলনের প্রভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

 

পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যেখানে পানির প্রবাহ কমে গেলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য।

 

তবে পরবর্তী সময়ে সেই অবস্থান আর ধরে রাখা যায়নি। ১৯৮২ সালের সমঝোতা স্মারকে গ্যারান্টি ক্লজ বাদ পড়ে যায়। পরে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার প্রশ্ন পুরোপুরি সমাধান হয়নি। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রস্তুতির প্রশ্ন সামনে এসেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক্কার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পদ্মা নদীর বড় অংশ শুকিয়ে গিয়ে বিস্তীর্ণ চর জেগেছে। একসময় যে নদীতে সারা বছর প্রবল স্রোত বইত, সেখানে এখন শুষ্ক মৌসুমে হাঁটাপথ তৈরি হয়। নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদনও ব্যাপকভাবে কমেছে। গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়ালসহ অনেক জলজ প্রাণী প্রায় বিলুপ্তির পথে। পদ্মার ইলিশও এখন আগের মতো দেখা যায় না।

 

শুধু নদী নয়, ফারাক্কার প্রভাব পড়েছে দেশের কৃষি ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও। উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনেক গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। সেচ সংকটে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দক্ষিণাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যার প্রভাব সুন্দরবন পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সুন্দরী গাছসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

 

ফারাক্কা ইস্যুতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক নদী আইন। পানি বিশেষজ্ঞ ও আন্দোলনকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি সনদকে কার্যকরভাবে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভাটির দেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে ভারত প্রায়ই একতরফা সিদ্ধান্ত নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন চুক্তির আগে বাংলাদেশকে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক শক্তিশালী প্রস্তুতি নিতে হবে।

 

ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তিতে তাই আন্দোলনের ইতিহাস নতুন করে সামনে এসেছে। এটি শুধু অতীতের একটি রাজনৈতিক স্মৃতি নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তার প্রশ্নেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, নদীভাঙন ও পানিসংকটের বাস্তবতায় গঙ্গা-পদ্মার ন্যায্য প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় জাতীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে।

 

শেয়ার করুন: