প্রশাসনের প্রশ্রয়ে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচে ওলামা সন্ত্রাসঃ নারীর জন্য অশনিসংকেত 

নূজিয়া হাসিন রাশা
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৫২পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
প্রশাসনের প্রশ্রয়ে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচে ওলামা সন্ত্রাসঃ নারীর জন্য অশনিসংকেত 

কার্টুনঃ এআই

শেয়ার করুন:

রাষ্ট্র যখন উগ্রবাদী ও অগণতান্ত্রিক রাজনীতির মোকাবিলা করার বদলে তাকে তোষণ করে, তখন নারী ক্ষমতায়নের চকচকে উদ্যোগগুলোও শেষ পর্যন্ত প্রতীকী হয়ে পড়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নারী ক্ষমতায়নের গল্প বলা হয়, অন্যদিকে দেশের মাঠে মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে যায়

গতকাল ৫ অক্টোবর ২০২৬, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি ফুটবল ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। আয়োজকেরা আগেই প্রশাসনের অনুমতি নিয়েছিলেন, ম্যাচ নিয়ে মাইকিংও হয়েছিল। কিন্তু খেলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় একদল ওলামা আপত্তি জানান। দিরাইয়ের স্থানীয় ওলামাদের নেতৃত্বদানকারী শরিফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহিলাদের নিয়ে মাঠে নাচানাচি, অশ্লীলতা হবে, এটা আমরা মানতে পারি না। আমরা খেলাধুলার বিরোধী নই, আমরা অশ্লীলতার বিরোধী।’ ওলামাদের দাবির মুখে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলে ইউএনও। এরপর আয়োজকেরা ম্যাচ স্থগিত করেন। বলা যায়, ম্যাচ স্থগিত করা ছাড়া সরকার পক্ষ কার্যত আর কোনো পথ রাখেনি। এই ঘটনা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় তৈরি হওয়া দীর্ঘ উপন্যাসের আরেকটি অধ্যায়।


আমার প্রশ্ন, এই ‘সমঝোতা’ আসলে কার সঙ্গে, এবং কার দাবিকে স্বাভাবিক ও বৈধ ধরে নেওয়া হচ্ছে? এক পক্ষ একটি বৈধ খেলাধুলার আয়োজন করতে চেয়েছে। অন্য পক্ষ বলেছে, নারীরা মাঠে খেললে সেখানে ‘নাচানাচি’ ও ‘অশ্লীলতা’ হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল, এই আপত্তি আইন ও নাগরিক অধিকারের মানদণ্ডে যাচাই করা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেখানে প্রশাসনের প্রথম প্রতিক্রিয়াই দুই পক্ষ যেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতায় আসে। সমস্যা হলো, এই ধরনের ‘সমঝোতা’ কখনোই সমান অবস্থান থেকে হয় না। নারী ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে গেলে যাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তাঁদেরই সরে দাঁড়াতে হয়। আর যারা ধর্মীয় আপত্তি তুলে একটি বৈধ আয়োজন বন্ধ করতে চায়, তারা কার্যত তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে। দিরাইয়ে শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়েছে। একটি মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়ে গেছে। এবং ‘নারী ফুটবল অশ্লীল’ এই ধারণাটিকে রাষ্ট্র চ্যালেঞ্জ করে নি৷ উগ্র রক্ষণশীল গোষ্ঠীর দাবিকে বারবার ‘স্থানীয়দের দাবি’, ‘এলাকার মানুষের আপত্তি’ কিংবা ‘শান্তি রক্ষার স্বার্থে’ বলে প্রশাসনিক ভাষায় বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

 

আমাদের কওমী ওলামাদের ‘অশ্লীলতা’ রোধের এই ‘নৈতিক উদ্বেগ’’ অবশ্য বেশ বাছাই করা। যে ওলামারা নারী ফুটবলারের মাঠে উপস্থিতিকে অশ্লীলতা হিসেবে দেখছেন, তাঁদের আমরা দেখি না দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায়—বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের আবাসিক মাদ্রাসায়—যখন যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে, তখন সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই তীব্রতায় মাঠে নামতে। কোনো মাদ্রাসায় নারী শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সেই প্রতিষ্ঠানকে ‘অশ্লীলতার কেন্দ্র’ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার দাবি তাঁদের কাছ থেকে খুব একটা শোনা যায় না। সুতরাং দাঁড়াচ্ছে যে নারীর উপর সকল নিপীড়ন শ্লীলতা আর নারীরা মাঠে ফুটবল খেলতে চাইলে তা অশ্লীলতা। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা এই সংজ্ঞায়নের কাছে নতিস্বীকার করেছে।


২. 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে নারী ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের প্রতিবাদে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় রক্ষণশীলদের একটি মিছিল এসে মাঠের টিনের বেড়া ভাঙচুর করে। ম্যাচটি পণ্ড হয়ে যায়। এর কাছাকাছি সময়ে দিনাজপুরের হাকিমপুরে নারী ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে খেলা সমর্থনকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের সংঘর্ষ হয়। লাঠিসোঁটার হামলায় কয়েকজন আহত হন এবং খেলা শুরুর কিছুক্ষণ আগে ম্যাচ স্থগিত করা হয়।


ফেব্রুয়ারিতে রংপুর অঞ্চলেও নারী ফুটবল ম্যাচকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় পুলিশ নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তার কথা বলে তাঁদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এরপর দিরাই। এবারও যুক্তি—অশ্লীলতা, ধর্মীয় অনুভূতি, স্থানীয় আপত্তি এবং শেষ পর্যন্ত শান্তি।


আরেকটু পিছনে গিয়ে যদি চিন্তা করা যায় তাহলে ভোট কারচুপি করে ক্ষমতায় বসা হাসিনা সরকারের সময়ও নারী ফুটবলারদের একই ধরনের সামাজিক হেনস্তা ও সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার নজির পাওয়া যায়৷ ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামে নারী ফুটবলারদের ওপর হামলার ঘটনার নিশ্চিয়ই আমাদের মনে আছে৷ স্থানীয় ‘তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমি’র সঙ্গে যুক্ত এবং অনূর্ধ্ব-১৭ খুলনা বিভাগীয় দলের চার নারী ফুটবলার—সাদিয়া নাসরিন, মঙ্গলী বাগচী, হাজেরা খাতুন ও জুঁই মণ্ডল—এই ঘটনার শিকার হন। 


অর্থাৎ এখানে আমরা তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক সময়ের ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নারী ফুটবলারদের পোশাক ও অনুশীলন নিয়ে  হামলা; অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্মীয় আপত্তির মুখে নারী ফুটবল ম্যাচে হামলা ও স্থগিত; আর ২০২৬ সালে, অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের আমলেও দিরাইয়ে প্রশাসনের অনুমতি পাওয়া একটি ম্যাচ ওলামাদের আপত্তির মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া। তিন শাসনামলেই দেখা গেল নারী ফুটবলারদের পাশে রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। অনুপস্থিত নারী ফুটবলারদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্যোগ। উলটো এই রাষ্ট্র উগ্রবাদীদের মোকাবিলা করার বদলে তাঁদের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে।


৩.

এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা একের পর এক সাফল্য অর্জন করে চলেছেন। যে মেয়েদের দেশের মাঠে ‘অশ্লীলতা’র প্রতীক বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তাঁরাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ইতিহাস তৈরি করছেন। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপ ২০২৬-এর মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।  কিন্তু এই সাফল্যের সঙ্গে দেশের বাস্তবতার বৈপরীত্যটা ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন এই নারী ফুটবলারদের সাফল্যকে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন দেশের কোনো উপজেলা স্টেডিয়ামে তাঁদের খেলার অধিকার নিয়ে কয়েকজন ওলামার আপত্তিই যথেষ্ট হয়ে যায় খেলা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য।


সাম্প্রতিক সময়ে নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে পিংক বাসের উদ্যোগকেও সামনে আনা হয়েছে। নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। জাতিসংঘের মঞ্চেও বাংলাদেশের পিংক বাস উদ্যোগকে নারী ক্ষমতায়ন ও নারীর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু নারীর জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা এবং নারীর জন্য বিদ্যমান জনপরিসরকে সমানভাবে উন্মুক্ত করা এক বিষয় নয়। পিংক বাস একজন নারীকে যাতায়াতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই নারী যখন ফুটবল মাঠে নামতে চান, তখন যদি ওলামাদের আপত্তিতে ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায়; যখন আপত্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার কথা, তখন যদি প্রশাসন তাঁকেই ‘সমঝোতা’ করতে বলে—তাহলে তাঁর সামাজিক ক্ষমতায়ন কতটা ঘটল?


রাষ্ট্র যখন উগ্রবাদী ও অগণতান্ত্রিক রাজনীতির মোকাবিলা করার বদলে তাকে তোষণ করে, তখন নারী ক্ষমতায়নের চকচকে উদ্যোগগুলোও শেষ পর্যন্ত প্রতীকী হয়ে পড়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নারী ক্ষমতায়নের গল্প বলা হয়, অন্যদিকে দেশের মাঠে মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে যায়।


হামলা না হলেও যদি ধর্মীয় আপত্তির কারণে একটি বৈধ নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও রাষ্ট্র ব্যর্থ। সরকার আওয়ামী লীগ হোক, অন্তর্বর্তী সরকার হোক কিংবা বিএনপি—সরকার বদলালেই যদি শুধু ক্ষমতার মালিক বদলায়, কিন্তু নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ না থাকে, তাহলে সরকার কর্তৃক ‘জুলাইয়ের নারীরা কোথায় গেলো' সন্ধানমূলক সভা সেমিনার আরেকটি আইওয়াশ হিসেবেই গণ্য করতে হবে৷ সরকার বদলাচ্ছে কিন্তু নারীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্র বারবার হেরে যায়।


____

*লেখক: নূজিয়া হাসিন রাশা

শেয়ার করুন: