আলী খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে : বুকার ওমোলে

কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী) একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল। আমরা আয়াতুল্লাহ খামেনির ধর্মীয় বিশ্বদর্শন অনুসরণ করি না, এবং সমাজকে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করি না। তবে ‘বৈপ্লবিক সততা’ দাবি করে যে, যারা ধারাবাহিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং নিপীড়িত দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছেন, আমাদের অবশ্যই তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে।
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক বুকার ওমোলে ৪ জুলাই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে বিস্তারিত মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে তিনি খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী বলে
অভিহিত করেছেন এবং তাঁকে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক অমোচনীয় প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থান এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রতিরোধের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নিচে বিবৃতিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য দেওয়া হলো:
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের
চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক বুকার ওমোলে-এর দেওয়া বিবৃতি, ৪ জুলাই ২০২৬:
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী)-এর কেন্দ্রীয় কমিটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির পরিবার এবং বিশ্বের সব প্রগতিশীল, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে, যখন তারা আমাদের সময়ের অন্যতম এক নির্ধারক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বিদায় জানাচ্ছে।
তার মৃত্যু বিশ্ব ইতিহাসের এমন একটি নির্ধারক মুহূর্তে ঘটল, যখন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা আরো গভীর সংকটে প্রবেশ করছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলো ক্রমাগত তীব্র হচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের সার্বভৌম অধিকার জোরালো করছে; অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া একমেরু বিশ্বব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের মুখে পড়ছে।
ঠিক এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন না; তিনি সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তার কণ্ঠস্বর ইরানের সীমানা পেরিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। অসংখ্য নিপীড়িত মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড চাপের মুখে অবিচলতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অটল অঙ্গীকারের এক মূর্ত প্রতীক।
তিনি ছিলেন নিপীড়িত বিশ্বের অকৃত্রিম বন্ধু। এমন এক সময়ে যখন অনেক সরকারই সাম্রাজ্যবাদী হুমকির সামনে মাথা নত করেছিল, আয়াতুল্লাহ খামেনি দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কেবল ইরানের সীমানায় আটকে রাখা যায় না, কিংবা তাকে শুধু তার ধর্মীয় পরিচয়েও সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ‘গ্লোবাল সাউথ’ (বৈশ্বিক দক্ষিণ)-এর মানুষের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জাতিকে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই নির্ধারণের সার্বভৌম অধিকার রক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী) একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল। আমরা আয়াতুল্লাহ খামেনির ধর্মীয় বিশ্বদর্শন অনুসরণ করি না, এবং সমাজকে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করি না। তবে ‘বৈপ্লবিক সততা’ দাবি করে যে, যারা ধারাবাহিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং নিপীড়িত দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছেন, আমাদের অবশ্যই তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি আমাদের এই শ্রদ্ধাবোধ কখনই ধর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। এটি গড়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদ, জায়নবাদ, ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং বিশ্বের জনগণকে শোষণকারী ক্ষমতাদর্পী রাষ্ট্রগুলোর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে তার আপসহীন বিরোধিতার ভিত্তিতে।
এই রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা আদর্শিক ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এবং এদের দার্শনিক ভিত্তিও আলাদা। তাই আমাদের এই সংহতি কোনো দর্শন, ধর্ম বা সামাজিক সংগঠনের সকল বিষয়ে ঐকমত্যের কারণে তৈরি হয়নি। বরং বর্তমান যুগে নিপীড়িত জাতিগুলোর মুখোমুখি হওয়া প্রধান দ্বন্দ্বটির একটি বাস্তব বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এর জন্ম। জনগণ যেখানেই সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিরোধ করে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করে, সেখানেই মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অভিন্ন বস্তুগত পরিস্থিতি একটি যৌথ সংগ্রামের পটভূমি তৈরি করে। এটি নিছক কোনো কৌশলগত সুযোগ সন্ধান নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক অন্তর্নিহিত দ্বান্দ্বিক রূপ।
দশকের পর দশক ধরে অবরোধ, হুমকি, নাশকতা, গুপ্তহত্যা ও অব্যাহত অপপ্রচারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাকে একঘরে ও দানব হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।
তবুও, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কোনো প্রচারণাই তাকে সেই লাখ লাখ মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে সফল হয়নি, যারা তাকে জাতীয় স্বাধীনতার এক অটল রক্ষক মনে করত। অগণিত নিপীড়িত মানুষের মাঝে তার এই নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব টিকে ছিল কারণ এর ভিত্তি কৌশলগত সুবিধালাভ ছিল না, ছিল অবিচল নীতিবোধ।
তার আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্য হলো ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার আপসহীন অবস্থান। আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হওয়ার বহু আগেই আয়াতুল্লাহ খামেনি ধারাবাহিকভাবে উচ্চারণ করে গেছেন যে, ফিলিস্তিনের সংকট মূলত বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদ, দখলদারিত্ব এবং একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার শামিল। ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি তার এই দৃঢ় সমর্থন তাকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও বাস্তুচ্যুতির শিকার কোটি মানুষের কাছে আশার আলোতে পরিণত করেছিল।
দশকের পর দশক ধরে, যখন বহু সরকার জায়নবাদী সত্তার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে কিংবা ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো বর্বরতার সামনে নিশ্চুপ থেকেছে, তখন আয়াতুল্লাহ খামেনি বারবার স্মরণ করিয়েছেন যে— পশ্চিম এশিয়ায় ন্যায়বিচারের প্রধান ও কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হলো ফিলিস্তিন। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ফিলিস্তিনের সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন জাতীয় ইস্যু নয়; বরং তা ঔপনিবেশিক আধিপত্য, জাতিগত নিপীড়ন এবং সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ।
এর মাধ্যমেই তিনি বিশ্বজুড়ে যারা অবৈধ দখলদারিত্ব এবং বর্ণবাদ মানতে অস্বীকার করেছিল, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছিলেন।
তার সেই বাণীগুলো আজও তাদের অনুপ্রেরণা জোগায়, যারা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করে:
“প্রতিরোধই হলো একমাত্র উপায় যা শত্রুর আগ্রাসনকে কমাতে পারে।”
“ইরানি জাতি দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা কখনোই আধিপত্য ও বলপ্রয়োগের সামনে আত্মসমর্পণ করবে না।”
এগুলো নিছক রাজনৈতিক স্লোগান ছিল গঠন। সামরিক শক্তির ভরকেন্দ্র যেমনই হোক না কেন, কোনো জাতি বিদেশি আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে না—এটি ছিল সেই নীতির প্রতি তাঁর আজীবনের প্রতিশ্রুতির জ্বলন্ত রূপ।
মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসেবে আমরা জানি, শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের ভেতর দিয়েই ইতিহাস এগিয়ে যায়। আমাদের দার্শনিক ভিত্তি ভিন্ন হতে পারে, তবে আমরা এটাও বুঝি যে একটি সাধারণ শত্রুর মোকাবিলায় বাস্তব পরিস্থিতি প্রায়ই নানা রাজনৈতিক শক্তিকে এক কাতারে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন কখনোই একই ছাঁচে ঢালা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে আবদ্ধ ছিল না। ইতিহাস জুড়ে এটি শ্রমিক, কৃষক, স্বাধীনতা আন্দোলন, প্রগতিশীল সরকার ও দেশপ্রেমিকদের একত্র করেছে, ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ধ্বংসের প্রয়োজনে যাদের তাৎক্ষণিক ঐক্য গড়ে ওঠা অনিবার্য ছিল। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি একটি অবিচ্ছেদ্য নাম।
সাম্রাজ্যবাদের পতনের দ্বান্দ্বিক রূপ
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক চিন্তাধারার একটি অনবদ্য দিক ছিল শক্তিকে কোনো স্থির কিছু হিসেবে না ভেবে, তাকে অন্তর্দ্বন্দ্বের আলোকে বিশ্লেষণ করার সামর্থ্য। এক উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণে তিনি জানিয়েছিলেন, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ঘাঁটিগুলোর যে সুবিশাল বলয় গড়ে তুলেছে, সেটি শক্তির বদলে শেষ পর্যন্ত দুর্বলতার উৎসে পরিণত হবে। এটি কেবল কোনো সামরিক পর্যালোচনা ছিল না। এটি ছিল দ্বান্দ্বিক প্রজ্ঞার প্রতিফলন—যেখানে বলা হয়,
বাহ্যিকভাবে যতো বিপুল শক্তিই মনে হোক, প্রত্যেক শক্তির কেন্দ্রেই অভ্যন্তরীণ অসংগতি থাকে, যা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে সাথে মারাত্মক দুর্বলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সামরিক রেষারেষি যেন তার সেই মতকেই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণ করেছে। অঞ্চলটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা প্রভাব বিস্তারের গ্যারান্টি হওয়ার বদলে, এই বিস্তীর্ণ সামরিক উপস্থিতি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই এক বিপজ্জনক এবং জটিল অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলেছে। এর ফলে শুধু যে মার্কিন সেনা ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে তা-ই নয়, পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কার প্রমাণিত হয়—সাম্রাজ্যবাদ তার নিজস্ব সীমানাকে যতো বিস্তৃত করবে, ততোই এটি এমন অবস্থার জন্ম দেবে যা তার নিজস্ব স্থায়িত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যুদ্ধ আরও একবার প্রমাণ করেছে যে, সাম্রাজ্যবাদের হাতে হয়তো অপরিসীম ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা আছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক বৈধতা কমতে শুরু করেছে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব একটি শহর ধসিয়ে দিতে পারে, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করতে পারে, এবং ব্যাপক অবকাঠামো মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারে, কিন্তু নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর কোনো মানুষের মনে সামরিক বল প্রয়োগ বিন্দুমাত্র আনুগত্য উৎপাদন করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক সামরিক জোর ও হ্রাসমান রাজনৈতিক বৈধতার বিপরীতমুখী এই দ্বন্দ্বটিই আজকের যুগে সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান পর্যায়টিকে স্পষ্ট করে তোলে।
ঐতিহাসিক বিকাশের মৌলিক নিয়ম হিসেবে মার্কসবাদীরা এটিই ব্যাখ্যা করেন। প্রত্যেক সামাজিক ব্যবস্থাই এর নিজস্ব রূপান্তরের বা পতনের নিয়ামকগুলো নিজের ভেতরেই তৈরি করে। পুঁজিবাদের পথ বেয়েই তৈরি হয়েছে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, আর এই একচেটিয়াত্ব জন্ম দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের। এই সাম্রাজ্যবাদ আজ বিশ্বকে নিপীড়ক ও নিপীড়িতের মধ্যে দুই ভাগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তার নিজস্ব বিলুপ্তির উপাদানও তৈরি করে চলেছে। ঠিক এভাবেই, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি চমৎকার দ্বান্দ্বিক সক্ষমতা দেখিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, মাত্রাতিরিক্ত সাম্রাজ্যবাদী সীমানা বিস্তার কীভাবে তার কৌশলগত অর্জনগুলোকে তার চরম দুর্বলতায় রূপ দেয়। এর পেছনে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন থাকুক কিংবা কোনো তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি— সব মিলিয়ে তাঁর মূল্যায়ন শেষমেশ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সেই সূত্রের সাথেই মিলে যায়, যা বলে: পরিমাণগত বিস্তৃতি সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা গুণগত রূপান্তর (বা পতন) ডেকে আনে।
ভ্লাদিমির লেনিন প্রমাণ করেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ স্তর, যার বৈশিষ্ট্য হলো— একচেটিয়া আধিপত্য, অর্থপুঁজির প্রাধান্য, পুঁজিবাদী লগ্নি, বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মাঝে ক্ষমতার বিভাজন এবং বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সারা বিশ্বকে বাঁটোয়ারা করার প্রয়াস। এগুলো সাময়িক বা অস্থায়ী কোনো সরকারি পলিসি নয়; এগুলো একচেটিয়া পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত কাঠামোগত আইন থেকেই তৈরি হয়।
সুতরাং, আগ্রাসন ত্যাগ করলে সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদই থাকে না। ফলে সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘেরাও মূলত কোনো বিক্ষিপ্ত পলিসি নয়, এগুলো সেই সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার পদ্ধতিগত বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
আয়াতুল্লাহ খামেনির দেওয়া কৌশলগত মূল্যায়ন পশ্চিম এশিয়ার বাস্তবতা থেকে বারবার প্রমাণ করেছে যে কীভাবে এই দ্বন্দ্বগুলো আত্মপ্রকাশ করে। তার বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদ কখনোই অনির্দিষ্টকালের জন্য পৃথিবীতে আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারবে না; কারণ তারা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে যে পদ্ধতি প্রয়োগ করে, তা সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে। প্রতিটি সামরিক আগ্রাসন নতুন প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। প্রতিটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশগুলোকে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুসন্ধানে ঠেলে দেয়। স্বাধীন কোনো জাতিকে একঘরে করার প্রতিটি চেষ্টা পরাশক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন বলয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সুতরাং, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যেসব হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়, ক্রমান্বয়ে সেগুলিই সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করার যন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্রাজ্যবাদের এসব অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ‘অসম উন্নয়নের নিয়মের’ মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। লেনিন দেখিয়েছিলেন যে পুঁজিবাদী উন্নয়ন অসমভাবে অগ্রসর হয়, যার ফলে ক্রমাগত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তির ভারসাম্য বদলাতে থাকে। কোনো সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয় না, কারণ একচেটিয়া পুঁজিবাদের গতিশীলতা থেকেই উৎপাদনের নতুন নতুন কেন্দ্র, নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রতিরোধের নতুন কাঠামোগুলো জন্ম নেয়। বর্তমান বিশ্ব এই বাস্তবতারই ক্রমবর্ধমান প্রতিফলন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে একচেটিয়া বিশ্বব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তা ক্রমশ একটি আরও জটিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে; যেখানে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের জাতিগুলো অনেক জোরালোভাবে নিজেদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করছে।
পরিবর্তনশীল এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, পশ্চিম এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। দশকের পর দশক ধরে অবরোধ, সামরিক হুমকি, নাশকতা, গুপ্তহত্যা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও, ইরান নিজেদের সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করতে কিংবা ফিলিস্তিনি জনগণ ও অন্যান্য নিপীড়িত জাতির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে
সাম্রাজ্যবাদের ক্ষমতা অসীম বা অপরিবর্তনীয় কোনো বিষয় নয়। জবরদস্তির প্রতিটি পদক্ষেপই নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে। একঘরে করার প্রতিটি অপচেষ্টা সেই রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সহযোগিতার নতুন ভিত্তি মজবুত করেছে, যারা কৌশলগতভাবে আত্মনির্ভর হতে চায়। আর প্রতিটি সামরিক উসকানি সাম্রাজ্যবাদীদের বিনা বাধায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ফলানোর সক্ষমতার পতনের বিষয়টিকেই উন্মোচিত করেছে।
সুতরাং একটি অধিকতর বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উত্থানকে কোনোভাবেই সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্ধান হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। সমসাময়িক বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজও প্রধান আগ্রাসী শক্তি এবং সামরিক, আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও মতাদর্শিক দিক থেকে তারা অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। তবে মার্কসবাদ শেখায় যে ঐতিহাসিক শক্তির বড়াইকে কখনোই চিরস্থায়ী বলে ভাবলে চলবে না। সাম্রাজ্যবাদের ক্রমবর্ধমান এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক সূচক বা সামরিক ব্যয় দিয়ে পরিমাপ করা হয় না, বরং রাজনৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করতে তাদের হ্রাসমান সক্ষমতা, জবরদস্তির ওপর বাড়তি নির্ভরতা, খোদ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মাঝে তীব্রতর হতে থাকা দ্বন্দ্ব এবং নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে নিপীড়িত মানুষের অটল আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমেই পরিমাপ করা হয়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের প্রমাণ, যা পরিচালিত হচ্ছে এমন সব অন্তর্দ্বন্দ্বের মাধ্যমে, যাকে কোনো শাসকশ্রেণী চিরকালের জন্য রুখতে পারে না।
ইতিহাসের বৃহত্তর এই গতিপ্রবাহের প্রেক্ষাপটেই আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে হবে। মার্কসবাদীদের সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তির যতো পার্থক্যই থাকুক না কেন, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁর এই ধারাবাহিক অবস্থান বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংগ্রামের এমন একটি অংশ ছিল, যার মাধ্যমে নিপীড়িত জাতিগুলো বিশ্বশক্তির ভারসাম্যকে নতুন করে গড়ে তুলছে। অবিসংবাদিত সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের যুগ ক্রমশ সরে গিয়ে যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জোরালো প্রতিরোধ এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের আত্মপ্রকাশের যুগ তৈরি হচ্ছে— খামেনির রাজনৈতিক জীবন বৃহত্তর সেই ঐতিহাসিক প্রবণতারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী)-এর কাছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের শিক্ষা কেবল সামরিক পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আবারও এই বাস্তবতাকে নিশ্চিত করে যে—যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অস্ত্রাগার যতোই ভয়ংকর হোক না কেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কোনো জনগণের ওপর তারা অনন্তকাল ধরে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদ হয়তো ভয়াবহ হিংস্রতা চালিয়ে ইতিহাসের গতিপথকে কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে, তবে পুরোপুরি থমকে দিতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদী যুগের সংজ্ঞা নির্ধারক দ্বন্দ্বগুলো প্রতিনিয়ত আরও গভীর হচ্ছে, আর এর বিপরীতে নিপীড়িত জনগণের সংগঠিত হওয়ার, রুখে দাঁড়ানোর এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সামর্থ্য ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। ঠিক এ কারণেই ইতিহাস আধিপত্যবাদীদের নয়, বরং চিরকাল সেইসব মুক্তিকামী মানুষের পক্ষেই অবস্থান নেয়।
ইতিহাস তার রায় দেবে
ইতিহাস শেখায় যে, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা যতোই পরাক্রমশালী মনে হোক না কেন, তা নিজের ভেতরেই এমন সব দ্বন্দ্ব লালন করে যা শেষ পর্যন্ত এর পতন ঘটায়। সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে। সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের অজেয় বলে ধারণা করতে শুরু করে। কিন্তু যে দ্বন্দ্বগুলো তাদের বিস্তার ঘটায়, শেষমেশ সেগুলিই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে নিপীড়িত মানুষ টিকে থাকে, সংগঠিত হয় এবং নিজেদের অনুকূলে ইতিহাস রূপান্তরের সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি অনুধাবন করেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদ কখনোই কাউকে সত্যিকারের স্বাধীনতা উপহার দেয় না। বরং, দৃঢ় সংকল্প, আত্মত্যাগ এবং নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে অটল আত্মবিশ্বাস নিয়েই এই স্বাধীনতাকে অর্জন ও রক্ষা করতে হয়।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার আপসহীন প্রতিরক্ষা, ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার অটল সমর্থন এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধই তাকে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিসত্তায় পরিণত করেছে।
সামরিক আগ্রাসন হয়তো অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হয়তো চরম দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে। গুপ্তহত্যা হয়তো নেতৃবৃন্দকে সরিয়ে দিতে পারে। অপপ্রচার হয়তো বাস্তবতাকে বিকৃত করতে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই ওইসব লাখ লাখ নিপীড়িত মানুষের মনের গভীরে শেকড় গড়া কোনো রাজনৈতিক চিন্তাকে মুছে ফেলতে পারে না।
ব্যক্তির মৃত্যু হয়। কিন্তু আদর্শ টিকে থাকে।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি যেসব নীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সেগুলোকে বোমা, নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ বা হুমকি দিয়ে সমাহিত করা যাবে না; কারণ সেগুলো আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা বিশ্ববাসীর সমষ্টিগত রাজনৈতিক চেতনার অংশে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো আদর্শ সাধারণ জনতার মনে জায়গা করে নেয় এবং তা একটি সংগঠিত সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়, তখন সেটি এমন এক ঐতিহাসিক শক্তিতে পরিণত হয়, যাকে কোনো সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে পরাজিত করতে পারে না।
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী) বিশ্বাস করে যে, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে— যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, জায়নবাদ এবং জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর উত্তরাধিকার এখন কেবল আর ইরানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা এবং মানবমুক্তির বৃহত্তর ঐতিহাসিক সংগ্রামের অংশ।
ইতিহাস নেতাদের কেবল তাদের উচ্চ পদে অধিষ্ঠান, সেনাবাহিনীর ওপর কমান্ড করা অথবা রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগের জন্য মনে রাখে না। ইতিহাস শুধু তাদের মনে রাখে—যাঁরা সময়ের সংকটময় মুহূর্তে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে একটি উপযুক্ত রাজনৈতিক ভাষা দিতে পারেন এবং প্রতিরোধ করার চেয়ে আত্মসমর্পণ করাটা যখন সবচেয়ে সহজ মনে হয়, তখনও দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিটি দিক গ্রহণ করবে কি্বা না—সে প্রশ্নটির উত্তর ভবিষ্যতেই ইতিহাস খতিয়ে দেখবে। তবে যে সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই তা হলো, তিনি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক পরম প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কখনোই কোনো নির্দিষ্ট একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির আগমনের অনেক আগে থেকেই এই সংগ্রাম শুরু হয়েছে এবং আজকের সব নেতৃত্ব ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও এই লড়াই চলবে।
কারণ ইতিহাসের চাকা শুধু মহান ব্যক্তিসত্তার একার প্রেরণায় চলে না; এটি পরিচালিত হয় মুক্তি নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর লাখো লাখো শ্রমিক, কৃষক, তরুণ, নারী, বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিটি নিপীড়িত জাতির সংগঠিত লড়াইয়ের মাধ্যমে। দিনশেষে বৃহত্তর জনতাই নতুন ইতিহাস তৈরি করে এবং এই সাধারণ মানুষের সংগ্রামের মাধ্যমেই প্রতিটি অহংকারী সাম্রাজ্যের বিলোপ ঘটে।
এ কারণে, শোকের এই সময়কে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ বা হতাশা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। যাঁরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন শুধু তাঁদের স্মরণ করা নয়; বরং যে উদ্দেশ্যে তাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই লড়াই অব্যাহত রাখা। প্রতিটি প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে এমন কিছু অসম্পূর্ণ কাজের উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে। আমাদের প্রজন্ম যেই কাজের উত্তরাধিকারী হয়েছে তা হলো—সাম্রাজ্যবাদকে চূর্ণ করা, ঔপনিবেশিক দাপট শেষ করা, ফিলিস্তিনের সার্বিক মুক্তি আদায় করা, সব জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচার, সমতা, নিখাদ শান্তি ও প্রকৃত আন্তর্জাতিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে একটি সমাজ নির্মাণ করা।
ইতিহাস নিজস্ব রায়টি প্রদান করবেই।
সকল সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।
জাতিগুলো নিজেদের স্বাধীন করে তুলবে।
পৃথিবীর মুক্তিপাগল মানুষ প্রতিরোধ বজায় রাখবে।
ফিলিস্তিন মুক্ত হবে।
সাম্রাজ্যবাদ পরাস্ত হবে।
এই ঐতিহাসিক যাত্রায় দেখা যাবে, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে। কারণ নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় প্রোথিত কোনো আদর্শকে বলপ্রয়োগ করে ধ্বংস করা যায় না। রাষ্ট্র হয়তো অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে পারে।
সেনাবাহিনী ভূখণ্ড দখল করতে পারে। পুরো অর্থনীতির ওপর ভয়ংকর সব অবরোধ নেমে আসতে পারে। রাষ্ট্রনায়করা মারাও যেতে পারেন। কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কোনো জাতিকে চিরতরে বিনাশ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
শোকের এই সময়টিতে আমরা ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করছি। আমরা সেই নেতাকে সম্মান জানাই, যিনি সাম্রাজ্যবাদের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছিলেন, যিনি ফিলিস্তিনের সুরক্ষায় অবিচল ছিলেন এবং লাখো মানুষকে এই আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন যে, সার্বভৌমত্ব এমন একটি অধিকার, যা প্রয়োজনে প্রাণ দিয়েও রক্ষা করতে হয় এবং আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা শুধু বৈধ নয় বরং অপরিহার্য।
ইরানের জনগণ তাদের নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষায় যেন সর্বদা অবিচল থাকে। ফিলিস্তিনের জনগণ সম্পূর্ণ জাতীয় মুক্তি অর্জন করুক। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দুনিয়ার জনগণের ঐক্য ও সংহতি আরও জোরালো রূপ লাভ করুক।
আন্তর্জাতিক সংহতি দীর্ঘজীবী হোক। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক।
ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম জয়লাভ করুক।
বিবৃতি প্রদানে:
সাধারণ সম্পাদক, সেন্ট্রাল অর্গানাইজিং কমিটি
কমিউনিস্ট পার্টি অব কেনিয়া (মার্কসবাদী)
৪ জুলাই ২০২৬



