একটি বোয়িং বিমানের দাম: এক লাখ ২৩ হাজার প্রবাসীর এক বছরের ঘাম


ছবি: বোয়িং
২৫টি বিমানের দাম সাড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। যে দেশের ভাগ্য এখন বিদেশে পাচক, রাজমিস্ত্রি, গৃহকর্মীর পাঠানো টাকায়, সে দেশের হিসাবের খাতায় শ্রমিকদের নিয়ে হিসাবটি করে দেখা প্রয়োজন।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি কাগজে সই হয়েছে। কাগজের এক পাশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান, অন্য পাশে বোয়িংয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। হাততালি পড়েছে, ছবি ছাপা হয়েছে, ঘোষণা এসেছে: বোয়িং থেকে আরও ১১টি বিমান কিনছে বিমান বাংলাদেশ, যার মধ্যে পাঁচটি 787-10 ড্রিমলাইনার আর ছয়টি 737-8। এপ্রিলের ১৪টি বিমানের চুক্তির সঙ্গে যোগ করলে জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে এখন বোয়িংয়ের বিমান ২৫টি।
চুক্তির বিবরণ ঘাঁটলে যা পাওয়া যায়, তা এই রকম: ৩০ এপ্রিলের ১৪টি বিমানের চিহ্নিত মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যেগুলোর ডেলিভারি ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে। অর্থায়নের ভার নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক। ২৩ সেপ্টেম্বরের ১১টি বিমানের দাম, অর্থায়ন আর ডেলিভারি সময় প্রকাশ করা হয়নি। এপ্রিলের চুক্তির গড় হিসাবে এগোলে ওই ১১টির কাগজে লেখা মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ হলো ২৫টি বিমানের মোট চিহ্নিত মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বেসরকারি ইউএস-বাংলা ২১টি বোয়িং বিমানের জন্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি বিমান কেনার প্রস্তাবও ঝুলে আছে। নতুন করে বিমান কেনার দুটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমটি বিদ্যমান বাস্তবতা। বিমান বাংলাদেশের ১৯টি বিমানের বহর বয়সের ভার বইছে। দূরপাল্লার নতুন রুটে বিমান দরকার। এমন বাস্তবতায় এ ক্রয় না হলে বহর ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয় কারণটি কূটনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি ৩৭ শতাংশ শুল্কের চাপ কমাতে ঢাকা বোয়িংয়ের অর্ডারকে হাতিয়ার বানিয়েছে। সে দিক থেকে এটি কেবল বিমান ক্রয় নয়; শুল্কছাড়ের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেনা বাণিজ্যিক এক নথি। বিমান কেনার এ টাকা এলো কোথা থেকে? ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট নাগাদ ছয় মাসে দেশে আসে ১৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব একাই পাঠিয়েছে ২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ও মালয়েশিয়া থেকে আসে ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন।
শীর্ষ পাঁচ দেশ মিলিয়ে আসে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ। সেসব দেশে বাংলাদেশিরা কাজ করেন মূলত নির্মাণ, পরিবহন ও গৃহস্থালির কাজে। অর্থাৎ যে রেমিট্যান্স দিয়ে জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানের ড্রিমলাইনার কেনা হচ্ছে, তার বড় অংশ এসেছে উপসাগরের ২০/২৫ তলা ভবনের ছাদে দাঁড়ানো শ্রমিকের কাছ থেকে, যাঁর নিজের ঘরে এখনও দুই ছাদের চাল হয়নি। প্রবাসী আয়ের হিসাব ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাময়িক হিসাবে যা আগের অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। প্রবাসে থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা সরকারি হিসাবে ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখের মধ্যে।
১ কোটি ৩০ লাখ ধরে ভাগ করলে জনপ্রতি বছরে রেমিট্যান্স পড়ে প্রায় ২ হাজার ৭৩৫ ডলার, যা মাসে প্রায় ২২৮ ডলার। অর্থাৎ এই গড়ের হিসাবে প্রবাসী চিকিৎসক আর সৌদির রাজমিস্ত্রি একই সারিতে দাঁড়িয়ে যান। দেড় লাখ শ্রমিকের এক বছরের কষ্টার্জিত আয় আসল হিসাবটিই এখন বলার সময়। বোয়িংয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী একটি 787-10 ড্রিমলাইনারের দাম ৩৩৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার, যা টাকায় প্রায় ৪ হাজার ১২৮ কোটি। জনপ্রতি বছরে ২ হাজার ৭৩৫ ডলারের হিসাবে এ টাকা তুলতে এক লাখ ২৩ হাজার ৭১২ প্রবাসী শ্রমিকের লাগে পুরো একটা বছর। একটি 737-8 বিমানের দাম ১২১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। সেটির পেছনে ৪৪ হাজার ৪৫৪ জন শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকেন এক বছরের পুরো আয় নিয়ে।
অন্য কথায়, বোয়িংয়ের ফ্যাক্টরিতে তৈরি হওয়া একটি ড্রিমলাইনারের দাম তুলতে বাংলাদেশকে পাঠাতে হয় এক লাখ ২৩ হাজার শ্রমিককে। গড় হিসাবটি কিন্তু শ্রমিকের পক্ষে করুণাও বটে। প্রবাসে কেবল স্বল্প দক্ষ শ্রমিকেরা আছেন তা নয়; প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের পাঠানো বড় অঙ্কের টাকাও এ গড়ে মিশে আছে। এ কারণে গড়ের ধাক্কায় স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের অংশের আসল সংখ্যা আরও বেশি। উপসাগরীয় দেশের নির্মাণক্ষেত্র বা গৃহকর্মে মাসিক আয় ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার। সেখান থেকে সংসার চালিয়ে যাওয়া-আসার খরচ মিটিয়ে মাসে ১৫০ থেকে ২০০ ডলারের বেশি পাঠানো সম্ভব হয় না। অর্থাৎ একটি 787-10 কেনার জন্য এক লাখ ২৩ হাজার নয়, প্রকৃত হিসাবে দেড় লাখের বেশি শ্রমিকের এক বছরের ঘাম লাগবে।
বিদেশে যাওয়ার খরচের হিসাবটি এর চেয়েও নির্মম। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের বিদেশ যাওয়ার গড় খরচ প্রায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। সৌদি আরবে যাওয়া শ্রমিকের সেই খরচ উঠে আসতে লাগে প্রায় ১৯ দশমিক ৭ মাস। অর্থাৎ প্রথম দেড় থেকে দুই বছরের পুরো আয় খরচ করে শ্রমিক নিজের যাওয়ার দেনা শোধ করেন।
তারপর শুরু হয় ঘরে টাকা পাঠানো। সে খরচের অঙ্ক মেলালে চমকে উঠতে হয়। এক লাখ ২৩ হাজার শ্রমিকের বিদেশ যাওয়ার খরচ টাকা প্রায় ৫ হাজার ৭২৮ কোটি, যা ওই একটি বিমানের দামের চেয়েও ৩৯ শতাংশ বেশি। যারা বিমানটি কেনার অর্থ জোগান দেন, তারা কেবল বিদেশে পৌঁছাতেই বিমানের দামের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেন। এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর তুলনাটি থেমে থাকে। বিদেশ যাওয়ার এ গড় খরচ ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ধরলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ১৩ লাখ শ্রমিককে বিদেশে পাঠাতে বছরে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়—প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা—সেটি বিমান ক্রয়ের মোট অঙ্কের ৮১ শতাংশের সমান। অর্থাৎ শূন্য খরচে বিদেশে পাঠানোর একটি নীতি চালু করতে পারলে যে টাকা বাঁচত, তার প্রায় পুরোটাই একটি বিমান বহরের দাম।
বিদেশগামী শ্রমিকের কাছ থেকে ওই টাকা আদায় বন্ধ করা তাই কোনো মানবিক আবেদন নয়, এটি দেশের বিনিয়োগ-হিসাবের প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তরটি সরাসরি চাইলে সংখ্যাটা আরও স্পষ্ট হয়। ১০ হাজার শ্রমিক লাগলে একটি ড্রিমলাইনার কেনার পুরো টাকা তুলতে সময় লাগবে ১২ দশমিক ৪ বছর। এক হাজার শ্রমিক লাগলে সময় হবে ১২৪ বছর। আর ২৫টি বিমানের হিসাব করতে গেলে সময়ের মাপ বদলে যায়–২২ লাখ ৩৮ হাজার শ্রমিকের এক বছরের পুরো আয়। অর্থাৎ ১০ হাজার শ্রমিক লাগলে লাগবে প্রায় ২২৪ বছর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে গেছেন ৯ লাখ ৬৯ হাজার শ্রমিক। তারা এক টাকাও খরচ না করে পুরো আয় দেশে পাঠালে ২৫টি বিমানের দাম ওঠাতে সময় লাগবে ২ দশমিক ৩ বছর।
তুলনার ক্ষেত্রে আরেকটি হিসাব ধরলে বিষয়টি আরও খোলাসা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, প্রতিদিন গড়ে যা ৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ একটি 787-10 ড্রিমলাইনার কেনা মানে সারা দেশের এক দিনের নয়; ৩ দশমিক ৫ দিনের পুরো রেমিট্যান্স। ২৫টি বিমান মানে প্রায় ৬৩ দিন তথা দুই মাসের বেশি সময়ের সমুদয় রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা একটি বিমানের দামের ১ শতাংশের মতো। এটি বিমান কেনা আটকানোর পক্ষের লেখা নয়। জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানের বয়সী বিমান, বন্ধ হয়ে যাওয়া রুট, অনিয়মিত শিডিউল—সবই বাস্তব সমস্যা।
আর বিমান ঠিকমতো চালাতে পারলে সেটি নিজেই ডলার আয় করে। রেমিট্যান্স আজ পোশাক রপ্তানির পর দেশের দ্বিতীয় বড় বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। প্রবাসী আয়ে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ দাঁড়িয়ে থাকে। শুল্কের চাপ কমাতে বিমান কেনাকে হাতিয়ার করাটাও নতুন কৌশল নয়। সমালোচনা কেবল একটি জায়গায়। আর সেটি হিসাবের খাতা নিয়ে। এ বিনিয়োগের রিটার্ন কত হবে, কোন রুটে কত বছর চালালে বিমান নিজের দাম ফেরত দেবে, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণের কিস্তি বছরে কত, সেটি এখনও কোনো প্রকাশ্য নথিতে নেই।
অথচ বিমানগুলো আসবে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আর কিস্তির বোঝা বর্তাবে আজকের শ্রমিকদের সন্তানদের ঘাড়ে। বিমান বানাতে বোয়িংয়ের কারখানায় কত শ্রমিকের কত মাস লাগে, সেটি খবরের কাগজে আসে, কিন্তু একটি বিমান কিনতে বাংলাদেশের কতজন শ্রমিকের কত বছরের খাটুনি লাগে, সে হিসাব কোনো সংবাদ সম্মেলনে আসে না। যে ২৫টি বিমান আজ শুল্ক ছাড়াতে সহায়ক হলো, তার প্রতিটি ডানার নিচে বসে থাকবে লাখো প্রবাসীর অজানা একটা বছর। কঠিন এ সত্যটি স্বীকার করে নেওয়াটাই হবে হিসাবের প্রথম ধাপ।
লেখক: তথ্য প্রযুক্তি উদ্যােক্তা ও এন্টারপ্রাইজ এআই পরামর্শক



