বাঙালিয়ানার খোঁজে


যাত্রাপালা, ছবি: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
বাঙালির ইতিহাস আসলে রাষ্ট্র গঠন, সাম্রাজ্য বিস্তারের পশ্চিমা মাপকাঠিতে বিচার কি আদৌ যুক্তিযুক্ত?
বাঙালিয়ানা খোঁজার জার্নি তো পুরো উপমহাদেশ জুড়ে। যেমন, শচীন দেববর্মণের ত্রিপুরার কুমার বোর্ডিং স্কুল থেকে কুমিল্লার ইউসুফ স্কুল, কুমিল্লা জেলা স্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। তারপর এই বাংলার সুরকে তিনি নিয়ে গেছেন সেই বোম্বে পর্যন্ত। এই দীর্ঘ পথের মাঝের অন্যান্য ভাষাভাষীরাও বঞ্চিত হননি। আরো প্রায় ছয়-সাতটি ভাষায় বাংলা সুর পুরো ভারতবাসীর মনের সিংহাসন দখল করে ছিল দীর্ঘ দিন। আরেক জন হেমন্ত-- এই বাঙালির গানের কণ্ঠকে পুরো ভারতজুড়ে বলা হতো-- ভয়েজ অব গড।
বাঙালির ইতিহাস আসলে রাষ্ট্র গঠন, সাম্রাজ্য বিস্তারের পশ্চিমা মাপকাঠিতে বিচার কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? বাঙালি জাতি গঠনে সবসময় ছিল সংস্কৃতিক ঐক্য। বাঙালি তার নরম মাটির মন নিয়ে মনিপুর-ত্রিপুরা থেকে পুরো বৃহৎ বঙ্গ জুড়ে বসবাসকারি সবার মনের মত করে গড়ে তুলেছিল এক সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য।
ফলে বাঙালিয়ানার আলোচনায় শুধু এপার বাংলা আর ওপার বাংলা-- এই দুই অংশে নয়। বঙ্গ তো শুধু পূর্ব আর পশ্চিম নয়। উত্তর বঙ্গও আছে। অন্যভাবে দেখলে পূর্ব আর পশ্চিম বঙ্গ তো ভাগ হয়নি। দুই অংশকে ছিঁড়ে দুই দেশে ফেলা হয়েছে। আর ছেঁড়ার একটা বড় জায়গা জুড়েই বরেন্দ্রভূমি, উত্তরবঙ্গ, আসাম, শ্রীহট্ট/সিলেট, ত্রিপুরা-কুমিল্লা, বাংলা-- এই অংশগুলোতে কলকাতা-বরিশালের মত উচ্চারণের পার্থক্য নেই। পাশাপাশি দুই দেশের দুই শহরের মানুষ একই ভাষায় কথা বলেন। আমার মনে হয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তার জায়গাও এটি। এজন্য এই ছিঁড়ে যাওয়া রেখা ধরে আপনি পাবেন- লালন, আব্বাসউদ্দীন, শাহ আব্দুল করিম, হাছন রাজা, বিসমিল্লাহ খা হয়ে বর্মণ পরিবার।
বাঙালিয়ানার পরিচয় এই ছিঁড়ে যাওয়া অংশকে সুরে গেঁথে তুলতে পারলে বাঙালি এই বৃহৎ বঙ্গের সবার মনের সাথে মিলে যে আসমুদ্রহিমাচল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, তা ফেরৎ পাবে। এই সাংস্কৃতিক ঐক্যে রাষ্ট্র বা শাসনতান্ত্রিক বাধা ঐতিহাসিকভাবে তেমন কিছু করতে পারেনি, পারবেও না।
বাঙালি তো বিপুল ঐশ্বর্যেরকালেও রাষ্ট্রই বানায়নি। বাঙালি বানিয়েছে এক বিশাল সমাজ। তাই বাঙালিয়ানার খোঁজ হবে ছিঁড়ে যাওয়া এই সমাজগত ঐক্য চিম্তাটাকে শুধু জোড়া দেওয়ার প্রসঙ্গ।



