‘সবার আগে বিদেশী স্বার্থ: খাদের কিনারায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ

অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষা করতে না পারা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া, ব্যাংক খাতের ঋণখেলাপিদের দায় জনগণের করের ওপর চাপানো, লাভজনক বন্দর বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং ঋণের টাকায় বিলাসী বিমান কেনার নীতি—এই হলো তথাকথিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এর প্রকৃত বাস্তবতা।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—রাজনৈতিক মঞ্চে স্লোগানটি শুনতে দারুণ দেশপ্রেমিক আর আবেগী শোনায়। কিন্তু রাজনীতির চটকদার কথার বাইরে এসে অর্থনীতির বাস্তব ময়দানে দাঁড়ালে খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন জাগে: এই রাষ্ট্রযন্ত্র আসলে কার স্বার্থকে সবার আগে রাখছে? কারখানার কাজ হারানো শ্রমিকের, উৎপাদন খরচে পিষ্ট কৃষকের, বেকার তরুণের, নাকি রাষ্ট্রীয় নীতি ও ব্যাংকের সম্পদ আত্মসাৎকারী সুবিধাভোগী বৃহৎ পুঁজির?
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ ও ‘ম্যাক্রো পোভার্টি আউটলুক’ (অক্টোবর ২০২৬) আমাদের অর্থনীতির যে চেহারা উন্মোচন করেছে, তা একটি কাঠামোগত দেউলিয়াত্বের প্রামাণ্য রূপ। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমে ঠেকেছে ৩.৪ শতাংশে। আগামী অর্থবছরেও এই স্থবিরতা কাটার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যের হার (দিনে ৩ ডলারের নিচে আয়) লাফিয়ে ১০.১ শতাংশে উঠেছে, যা আগামী অর্থবছরে ১০.৫ শতাংশে পৌঁছাবে। দিনে ৪.২০ ডলারের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় নিলে দারিদ্র্যের হার এখন ২৪.৪ শতাংশ। এক বছরেই নতুন করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ।
সবচেয়ে উদ্বেগের তথ্যটি লুকিয়ে আছে অন্য এক পরিসংখ্যানে। বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে—দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৩২ লাখ বা সোয়া ৬ কোটি মানুষ এখন বাস করছে দারিদ্র্যসীমার ঠিক কিনারায় (ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী)। এদের কোনো সঞ্চয় নেই, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ন্যূনতম কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম কিংবা সামান্য পারিবারিক অসুস্থতার একটি ধাক্কাতেই এই সোয়া ৬ কোটি মানুষ এক নিমেষে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে।
অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের বোঝাচ্ছে—সব দোষ নাকি ‘বৈশ্বিক সংকটের’ আর ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মন্দার’। কিন্তু ঘরের ভেতরের অর্থনীতিকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করা হলো, তার দায় কার?
কারখানা ধ্বংস, কর্মসংস্থানহীনতা ও উৎপাদন ধস
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবর্তনের যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো গাজী টায়ার্সের মতো সুবিশাল কারখানা। অথচ গাজী টায়ার্স দেশে উৎপাদন করায় ভারত থেকে টায়ার আমদানি প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। কারখানাটি পুড়িয়ে দিয়ে লাভটা আসলে কার হলো? শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় বন্ধ করে দিয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করা হলো?
একই চিত্র বেক্সিমকোসহ ছোট-বড় কয়েকশ কারখানায়। মালিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা দুর্নীতির বিচার অবশ্যই আইনের আওতায় হবে; কিন্তু কারখানা তো জাতীয় সম্পদ, হাজার হাজার শ্রমিকের রুটিরুজি! বেক্সিমকোর পোশাক কারখানাগুলো সচল রাখলে শুধু ৫০ হাজার শ্রমিকের পেটে ভাত জুটত না, তাদের আয়ের টাকায় পণ্য কেনাবেচা চালু থাকত, ভ্যাট পেত সরকার, সচল থাকত অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাকা। এটিই বাজারব্যবস্থার টিকে থাকার প্রাথমিক শর্ত।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আর পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত বিএনপি সরকার—কেউই এই ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে বা বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারেনি। উল্টো এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজিরবিহীন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। জ্বালানির অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এখন অর্ধেকে নেমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত ০.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
এর সরাসরি আঘাত এসেছে শ্রমিকের পেটে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমেছে ০.৫ শতাংশ, আর শিল্প খাতে এই মজুরি পতন ঘটেছে ০.৭ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিক কাজ করলেও মাস শেষে আগের চেয়ে গরিব হচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষ বেড়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ, কিন্তু কাজ তৈরি হয়েছিল মাত্র ৮৭ লাখ। আর এখন কলকারখানা বন্ধ হয়ে শিল্পে কর্মসংস্থান উল্টো কমছে। শিল্প ও সেবা খাত থেকে বিতাড়িত হয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে কম আয়ের ও কম উৎপাদনশীলতার কৃষিতে গিয়ে ভিড় করছে। বিশ্বব্যাংকের চোখে এটি ‘অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিপরীত যাত্রা’। আর এই সংকটের প্রথম শিকার হয়েছেন নারীরা—পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ নারী শ্রমবাজার থেকেই পুরোপুরি ছিটকে গেছেন।
ব্যাংক খাতের সংকট ও ঋণাত্মক বিনিয়োগ
শিল্পের চাকা ঘোরানোর যে আর্থিক মেরুদণ্ড, সেই ব্যাংক খাত আজ চরম সংকটে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৮ শতাংশে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এই হার ৪৩ শতাংশের ওপরে আর ইসলামী ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৫৯ শতাংশ। ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) নেমে গেছে ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়মে থাকার কথা ন্যূনতম ১০ শতাংশ। প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের সঞ্চিতি ঘাটতি ঝুলিয়ে রেখে ব্যাংকের আসল দুর্বলতা চেপে রাখা হচ্ছে।
আমানতকারী আতঙ্কে ব্যাংকে টাকা রাখলেও সেই টাকা কোনো উৎপাদনশীল শিল্পে যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো—মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে গেছে (ঋণ সংকোচন হয়েছে ৪.৬ শতাংশ)। বেসরকারি বিনিয়োগ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকুচিত হয়েছে। খেলাপি ঋণের ভয়ে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারের ট্রেজারি বিলে টাকা খাটাচ্ছে। আর সরকার? রাজস্ব তুলতে ব্যর্থ হয়ে বাজেট চালাতে ব্যাংক থেকে দেদার ঋণ নিচ্ছে, যার প্রবৃদ্ধি ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বেসরকারি খাতের মূলধন প্রবাহ আটকে দেওয়া হচ্ছে। আর এই ঋণখেলাপিদের আর্থিক ঘাটতি মেটাতে শেষ পর্যন্ত বাজেট থেকে জনগণের করের টাকাই ঢালা হচ্ছে।
রাজস্ব সংকট ও চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা
দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আদায় মাত্র ৮.৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক সুরক্ষায় খরচ করার মতো নিজস্ব পর্যাপ্ত তহবিল রাষ্ট্রের হাতে নেই। রাষ্ট্র ধনী ও করপোরেটদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় করতে পারছে না, তাই সহজ পথ বেছে নিয়ে ভ্যাট আর পরোক্ষ কর বসিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এই চরম রাজস্ব সংকটের সময়ে রাষ্ট্র কী করছে? চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক অবকাঠামো—নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)—বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। যে টার্মিনাল থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ বাদ দিয়ে কনটেইনারপ্রতি ১০৫ ডলারের বেশি নিট আয় করত এবং বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো, সেই নগদ বৈদেশিক আয়ের উৎস বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার এই আয়োজন কার স্বার্থে? শ্রমিক ও বন্দর রক্ষা কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে লাভজনক টার্মিনাল হস্তান্তর কোনো টেকসই উন্নয়ন নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম আয়ের পথ সংকুচিত করার এক অসম বন্দোবস্ত।
ভর্তুকির বৈষম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা
ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষার নামে রাষ্ট্র যা করছে, তা স্পষ্টতই এক চরম বৈষম্য। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা দেখাচ্ছে, দেশে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশই কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পায় না। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ১৮ শতাংশ ঠিকই এই সুবিধার ভাগ পায়।
বিদ্যুৎ ভর্তুকির চিত্র আরও অসম। আবাসিক খাতের বিদ্যুৎ ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) ভোগ করছে শীর্ষ ২০ শতাংশ ধনী পরিবার; আর সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১৫.৪ শতাংশ। সচ্ছল ব্যক্তিরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সুবিধার ওপর রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পাচ্ছেন, আর দরিদ্র মানুষ চাল-ডালের পরোক্ষ কর দিয়ে সেই অর্থের জোগান দিচ্ছেন। বিকল্প আর্থিক সুরক্ষা ছাড়া একতরফা বিদ্যুৎ ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে তাৎক্ষণিকভাবে আরও ৪৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে বলে বিশ্বব্যাংক নিজেই সতর্ক করেছে।
একই বৈষম্য দেখা যাচ্ছে কৃষিতেও। শিল্পে কর্মসংস্থান কমায় কৃষি বহু মানুষের শেষ অবলম্বন। কিন্তু সেই কৃষি নিজেই সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জলবায়ুগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সারের ভর্তুকি কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সার ও কৃষি সহায়তার বিতরণব্যবস্থা যদি মূলত বড় উৎপাদকদের অনুকূলে থাকে, তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উৎপাদন ব্যয় সামলাতে ব্যর্থ হন। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। তাই শুধু ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না, সেই সহায়তা যেন প্রান্তিক কৃষকের হাতেই পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঋণের উড়োজাহাজ ও ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
দেশের অর্থনীতি যখন স্থবির, কারখানা যখন বন্ধ আর সাধারণ মানুষ যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাষ্ট্র মেতে উঠেছে বিলাসী কেনাকাটায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে বোয়িং আর ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সুবিধা দিতে এয়ারবাস কেনার প্রতিযোগিতা চলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঋণের টাকায় চীনা যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তুতি।
জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত ইতিমধ্যেই ৪০.৫ শতাংশে উঠে গেছে, যা ২০২৮ নাগাদ ৪৫.২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। রাজস্ব আদায় তলানিতে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও কাটেনি—এই অবস্থায় শত শত কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ নিয়ে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ আর যুদ্ধবিমান কেনার যৌক্তিকতা কোথায়? সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা দরকার, পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক মনস্তুষ্টি বিধানের চেয়ে দেশের সাধারণ মানুষের সস্তা চাল, জ্বালানি আর কাজের সংস্থান করা অনেক বেশি জরুরি। যে ঋণের কিস্তি টানতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বাড়তি দেনার বোঝা চাপবে, সেই অর্থ দিয়ে উড়োজাহাজ কেনা ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতার পরিচায়ক।
২০৩০-এর সম্ভাব্য মহামন্দা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট
দেশের ভেতরের এই সংকটপূর্ণ নীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতির প্রাথমিক নিয়ম হলো—কারখানায় পণ্য উৎপাদন হবে, মানুষ মজুরি পাবে, সেই উপার্জনের টাকায় বাজারে কেনাকাটা চলবে এবং এভাবেই অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল থাকবে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির অনির্দিষ্ট বিস্তার সেই ভারসাম্যে আঘাত করছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন আসেমোগ্লু দেখিয়েছেন, কম্পিউটার প্রযুক্তির লাগামহীন বিস্তার শ্রমিকের কর্মসংস্থান কমিয়ে সাময়িকভাবে মালিকের ব্যয় কমাতে পারে, কিন্তু তা জাতীয় আয়ে সাধারণ শ্রমিকের অংশ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ সতর্ক করেছেন, সম্পদ যখন গুটিকয়েক বৃহৎ সংস্থার হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন সামগ্রিক বাজারে আর্থিক লেনদেন কমে যায় এবং কার্যকর বাজারের চাহিদা সংকুচিত হয়। নোরিয়েল রুবিনি হোয়াইট-কলার চাকরির বিলুপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি দেনার ফাঁদ নিয়ে সতর্ক করছেন, ল্যারি সামার্স দেখাচ্ছেন মেধাভিত্তিক পেশাজীবীদের অবমূল্যায়ন, আর ইয়ানিস ভারুফাকিস তুলে ধরছেন কীভাবে তথাকথিত মুক্তবাজার সরে গিয়ে ডিজিটাল কর্তৃত্ব তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের আর্থিক স্থবিরতা বা মন্দার মুখে পড়তে পারে। একদিকে বৈশ্বিক দেনার বিপুল পাহাড়, প্রবীণ জনসংখ্যার ভার; অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাবে কোটি কোটি মানুষের উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়া। বিশ্ববাজারে যখন কার্যকর চাহিদা কমবে, পশ্চিমা বিশ্বের নাগরিকরা কেনাকাটা কমিয়ে দেবেন, তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কার কাছে পণ্য রপ্তানি করবে? প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যদি চাপে পড়ে, তখন এই উড়োজাহাজ আর সামরিক ঋণের বৈদেশিক মুদ্রা কীভাবে শোধ হবে?
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—কিন্তু এ দেশের সাধারণ মানুষ কোথায়?
অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষা করতে না পারা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া, ব্যাংক খাতের ঋণখেলাপিদের দায় জনগণের করের ওপর চাপানো, লাভজনক বন্দর বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং ঋণের টাকায় বিলাসী বিমান কেনার নীতি—এই হলো তথাকথিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এর প্রকৃত বাস্তবতা।
বাইরে যখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় ধরনের মন্দার ঝুঁকি, ভেতরে তখন সোয়া ৬ কোটি মানুষকে অর্থনৈতিক ঝুঁকির কিনারায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এই ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে সামরিক ও বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ মূলত ভুল অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিণতি। স্লোগান যত চড়া সুরেই প্রচার করা হোক না কেন—রাষ্ট্র আজ সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী ও আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
____
*লেখক: নূজিয়া হাসিন রাশা
লেখক ও সংগঠক



