ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে দেশ: ঢাকা পরিণত হবে নরকে

আরিফুজ্জামান তুহিন
আরিফুজ্জামান তুহিন
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৭পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে দেশ: ঢাকা পরিণত হবে নরকে
শেয়ার করুন:

প্রকৃতি বারবার আমাদের পায়ের নিচের মাটি কাঁপিয়ে চরম সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। টেকটোনিক প্লেটের অমোঘ নিয়মে বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশে হবেই—প্রশ্নটা ‘হবে কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটা হলো ‘কবে হবে’। আমরা প্রকৃতিকে থামাতে পারব না, কিন্তু নিজেদের অবহেলাজনিত নরক তৈরি হওয়া কিছুটা হলেও ঠেকাতে পারি।

ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে দেশ: ঢাকা পরিণত হবে নরকে


দেশে যেকোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে রিখটার স্কেলে ৭ বা তার চেয়েও বড় মাত্রার এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। আর সেই ভূকম্পন ঘটলে দুই কোটিরও বেশি মানুষের রাজধানী ঢাকা রূপ নেবে আক্ষরিক এক জীবন্ত নরকে। শহরের ভৌগোলিক বিন্যাস ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঢাকাকে এমন এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যেখানে বসুন্ধরা, আফতাবনগর, বনশ্রী, রামপুরা, কামরাঙ্গীরচর ও পূর্বাচলের মতো জলাশয় ও প্লাবনভূমি বালু দিয়ে ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকাগুলোতে কোনো বাড়িঘর টিকে থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে—মাটি তরল হয়ে চোখের পলকে দেবে যাবে ও ধসে কাদায় তলিয়ে যাবে একের পর এক বহুতল অট্টালিকা। অন্যদিকে পুরান ঢাকা, মিরপুর, বাড্ডা কিংবা নাখালপাড়ার মতো বাদবাকি ঘনবসতিপূর্ণ অংশে ভবনগুলো যদি কিছুটা দাঁড়িয়েও থাকে, তবুও মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো যাবে না। কারণ সেসব এলাকায় সরু গলি ও চতুর্মুখী ধ্বংসস্তূপের প্রাচীরের কারণে উদ্ধারকাজ শুরু করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে; ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিত মানুষগুলোকে কোনো সাহায্য পৌঁছানোর আগেই ধুঁকে ধুঁকে তাদের করুণ মৃত্যু ঘটবে।


মাটির নিচের ঘুমন্ত দানব: টেকটোনিক ফাঁদে বাংলাদেশ


কয়েকদিনের ব্যবধানে পরপর অনুভূত হওয়া মৃদু কম্পনগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো মাটির গভীরে জমে ওঠা তীব্র ক্ষোভের জানান দিচ্ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত বিপজ্জনক তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে—উত্তরে শক্তিশালী ইউরেশিয়ান প্লেট, নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মা প্লেট। বিজ্ঞানীদের মতে, শত শত বছর ধরে ইন্ডিয়ান প্লেটটি বার্মা ও ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার করে ঢুকে যাচ্ছে। এই অবিরাম ঘর্ষণে প্লেটগুলোর সংযোগস্থলে—বিশেষ করে সিলেটের ‘ডাউকি ফল্ট’ এবং উত্তর-মধ্যাঞ্চলের ‘মধুপুর ফল্টে’—বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়েছে।


টেকটোনিক নিয়মানুযায়ী, ভূগর্ভে জমে থাকা এই শক্তি অনন্তকাল আটকে থাকতে পারে না; একে কোনো না কোনো সময় মুক্ত হতেই হয়। গত এক থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বড় কোনো শক্তি নির্গত হয়নি। এর অর্থ হলো, মাটির নিচের দানবটি দীর্ঘকাল ধরে শক্তি সঞ্চয় করে কেবল উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছে। যেকোনো মুহূর্তে এই ফল্টগুলোতে বড় আকারের ফাটল তৈরি হলে যে প্রলয়ংকরী কম্পন সৃষ্টি হবে, তার প্রথম ও প্রধান শিকার হবে ভঙ্গুর রাজধানী ঢাকা।


ইতিহাসের সতর্কবার্তা: শতবর্ষ আগের চেয়ে আজ পরিস্থিতি শতগুণ ভয়ানক


অতীতেও এই ভূখণ্ড বড় বড় ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়েছে। ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সন্নিকটে মানিকগঞ্জ ফল্টে আঘাত হেনেছিল ৭.০ মাত্রার ‘বেঙ্গল ভূমিকম্প’। এর মাত্র এক যুগ পর, ১৮৯৭ সালের ১২ জুন আসামের শিলং মালভূমিতে ঘটে ৮.০ থেকে ৮.১ মাত্রার ঐতিহাসিক ‘গ্রেট আসাম ভূমিকম্প’। এছাড়া ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প কিংবা ১৯৩০ সালের ধুবড়ির ৭.১ মাত্রার কম্পন এই অঞ্চলের মাটিকে তছনছ করে দিয়েছিল। ১৮৯৭ সালের সেই ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের পাকা দালানকোঠা ভেঙে পড়েছিল, বুড়িগঙ্গার জলস্তর উপচে উঠেছিল এবং মাটি ফেটে বালু ও কাদা বের হয়ে এসেছিল।

​তবে তখনকার ঢাকার সঙ্গে আজকের ঢাকার তুলনা করা এক চরম আত্মঘাতী ভুল। ১৮৮৫ বা ১৮৯৭ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল এক লাখেরও কম। বাড়িঘর ছিল মূলত একতলা বা দোতলা, কাঠের ও চুন-সুরকির তৈরি; আর শহরের চারপাশে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, উন্মুক্ত বিল ও প্রবহমান খাল। ফলে ঘর ভেঙে পড়লেও মানুষ খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে পেরেছিল। অথচ আজকের ঢাকা দুই কোটিরও বেশি মানুষের এক নিশ্ছিদ্র কংক্রিটের জঙ্গল। কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ছাড়া জলাভূমি ভরাট করে গগনচুম্বী দালান তোলা হয়েছে। ফলে ১৮৯৭ সালের চেয়েও কম শক্তির একটি ভূমিকম্পও আজকের ঢাকাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট।


উত্তরবঙ্গে অতীতের প্রলয়: মানচিত্র বদল ও নদ-নদীর মৃত্যু


ভূমিকম্পের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই ভূখণ্ডে সবচেয়ে বিধ্বংসী আঘাতগুলো বারবার সইতে হয়েছে উত্তরবঙ্গকে। ১৭৮৭ সালের প্রলয়ংকরী ভূকম্পন ও আকস্মিক বন্যায় এই অঞ্চলের মানচিত্র আক্ষরিক অর্থেই চিরতরে পাল্টে গিয়েছিল। ওই এক ধাক্কায় তিস্তা নদী তার শত শত বছরের পুরোনো গতিপথ বদলে গঙ্গার দিক থেকে সরে এসে সরাসরি ব্রহ্মপুত্র নদে আছড়ে পড়ে। এর অভিঘাতে মূল ব্রহ্মপুত্র নদ তার ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ অভিমুখী পুরোনো পথ হারিয়ে যমুনা নদী হিসেবে নতুন এক বিশাল চ্যানেলে প্রবাহিত হতে শুরু করে।


নদীর এই দিকবদলের শিকার হয়ে উত্তরবঙ্গের অনেক নদী চিরতরে হারিয়ে যায়। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের গতি পরিবর্তনের ফলে করতোয়া ও বাঙালি নদীর মতো খরস্রোতা নদ-নদীগুলো পলি পড়ে শুকিয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঙালি নদী কার্যত ধীরে ধীরে মরে যায় এবং একসময়ের প্রমত্তা করতোয়া পরিণত হয় শীর্ণ নালায়।


পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯৩০ সালের ধুবড়ি ভূমিকম্পে রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও বগুড়ায় যে তাণ্ডব চলেছিল, তা আজও রোমহর্ষক। মাটির নিচ থেকে প্রবল বেগে বালু ও ঘোলা পানির ফোয়ারা ছুটে ফসলি জমি ও গ্রামকে গ্রাম বালুর নিচে চাপা পড়েছিল। নদীর তলদেশ হঠাৎ উঁচু হয়ে যাওয়ায় কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল, শত শত কিলোমিটার রেলপথ দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল এবং প্রাচীন উত্তরবঙ্গের প্রায় প্রতিটি পাকা দালানকোঠা মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। অতীতে ফাঁকা প্রান্তরে এমন প্রলয় ঘটলেও আজ ঘনবসতির কারণে ঠিক একই ঘটনা ঘটলে পুরো উত্তরাঞ্চল এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।


বসুন্ধরা ও আফতাবনগরের পরিণতি: ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটির তরলীকরণ


ভূমিকম্পে ঢাকার যে অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, তার শীর্ষে রয়েছে বালুভরাট করে গড়ে তোলা আধুনিক আবাসন এলাকাগুলো। বিশেষ করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, আফতাবনগর, বনশ্রী, রামপুরা, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর এবং উত্তর ও পূর্বাচলের নিচু জলাভূমি। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানে একটি মারাত্মক প্রক্রিয়া রয়েছে, যার নাম ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটির তরলীকরণ।


নদী, খাল বা বিলের নরম মাটিতে যখন উপর থেকে বালু ফেলে তড়িঘড়ি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়, তখন ভূগর্ভস্থ মাটির কণাগুলোর মাঝে বিপুল পরিমাণ পানি জমে থাকে। ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে মাটির কণাগুলো সংকুচিত হওয়ার চেষ্টা করে, যার ফলে পানির চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে শক্ত মাটি তার ভারবহন ক্ষমতা হারিয়ে ঘন তরল কাদার মতো আচরণ করতে শুরু করে।


এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। বসুন্ধরা ও আফতাবনগরের মতো এলাকায় ভবনগুলোর হয়তো রড-সিমেন্টের কোনো ক্ষতিও হবে না, কিন্তু পায়ের নিচের মাটি তরল হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ-ত্রিশ তলা ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তি হারাবে। কোনোটি সোজা মাটির নিচে কয়েক তলা পর্যন্ত দেবে যাবে, কোনোটি খেলনা বাড়ির মতো একপাশে পুরো উল্টে কাদায় নিমজ্জিত হবে। মাটির নিচ থেকে বালু ও পানির ফোয়ারা ছুটে রাস্তাঘাট ধসে যাবে। আক্ষরিক অর্থেই এসব এলাকায় কোনো অক্ষত অবকাঠামো খুঁজে পাওয়া যাবে না।


উদ্ধার অভিযান শুরুর আগেই মৃত্যু: কেন ধ্বংসস্তূপেই থামবে জীবিতদের নিঃশ্বাস?


ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ঘটে তার পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের মোক্ষম সময় হলো প্রথম ‘৭২ ঘণ্টা’, যাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় এই ৭২ ঘণ্টায় উদ্ধারকাজ শুরু করাই এক অসম্ভব কল্পনা।


পুরান ঢাকা, মিরপুর, নাখালপাড়া, কাফরুল বা বাড্ডার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার অধিকাংশ গলি মাত্র ৫ থেকে ১০ ফুট চওড়া। একটি ছয় বা সাততলা ভবন যদি ভেঙে পড়ে, তবে সেই সরু রাস্তার ওপর শত শত টন ওজনের কংক্রিটের দেয়াল ও ছাদ আছড়ে পড়বে। পুরো রাস্তা মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যাবে। এই ধ্বংসস্তূপের প্রাচীর ভেদ করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, সেনাবাহিনীর ভারী উদ্ধারকারী ক্রেন, এক্সকাভেটর কিংবা পে-লোডার পৌঁছানোর কোনো বাস্তব পথই থাকবে না।


ভেঙে পড়া একেকটি ছাদের স্ল্যাব হাত দিয়ে বা সাধারণ শাবল-গাইতি দিয়ে সরানো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ভেতরে আটকে থাকা শত শত জীবিত মানুষ যখন বাঁচার আকুতি জানিয়ে আর্তনাদ করবে, তখন স্বজন বা প্রতিবেশীদের কেবল ধ্বংসস্তূপের বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায় কান্না ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। উদ্ধারকারী দল প্রবেশের পথ তৈরি করতেই পার হয়ে যাবে দিনের পর দিন। ফলে শ্বাসরোধ হয়ে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কিংবা পানির তৃষ্ণায় কোটি কোটি টাকার কংক্রিটের নিচে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাবে হাজারো তাজা প্রাণ।


‘সফট স্টোরি’ ও ভবনের তাসের ঘরের মতো পতন


​ঢাকায় ভবন নির্মাণের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো ‘সফট স্টোরি’। শহরের সিংহভাগ বহুতল ভবনের নিচতলায় কোনো দেয়াল থাকে না; গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কেবল কয়েকটি সরু কংক্রিটের পিলারের ওপর পুরো ভবনটি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। কোনো ‘শিয়ার ওয়াল’ না থাকায় ভূমিকম্পের শক্তিশালী আনুভূমিক ধাক্কায় এই পিলারগুলোর গোড়া মটকে যাবে। ফলে নিচতলা গুঁড়িয়ে গিয়ে পুরো ভবনটি স্যান্ডউইচের মতো একের পর এক ছাদের ওপর আছড়ে পড়বে, যাকে প্রকৌশল বিদ্যায় বলে ‘প্যানকেক কলাপ্স’।


এর সঙ্গে যুক্ত হবে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি-কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকার অধিকাংশ ভবন তৈরি হয়েছে পাশাপাশি গায়ে গা ঘেঁষে। দুই ভবনের মাঝে ন্যূনতম যে ফাঁকা জায়গা বা ‘সেটব্যাক’ থাকার কথা, তা মানা হয়নি। ফলে একটি দুর্বল ভবন হেলে পড়লে তা পাশের ভবনের ওপর ভর করবে, সেটি আবার তার পাশেরটিকে আঘাত করবে। তাসের ঘরের মতো এক সারির সবকটি ভবন একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে শত শত মানুষকে এক নিমেষে পিষে ফেলবে।


আগুনের লেলিহান শিখা ও গ্যাসের মরণফাঁদ


ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি থেমে যাওয়ার পর শুরু হবে দ্বিতীয় ও আরও ভয়াল বিপর্যয়—আগুনের তাণ্ডব। ঢাকার মাটির নিচ দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার কিলোমিটার তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন লাইন। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে মাটির নিচের এই পাইপলাইনগুলো শত শত জায়গায় ফেটে যাবে। একই সাথে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ এবং বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্ট সার্কিট ঘটবে।


বাতাসে ছড়িয়ে পড়া গ্যাস আর আগুনের স্পার্ক মিলে শহরের অলিগলিতে তৈরি হবে অগ্নিকুণ্ড। ধ্বংসস্তূপের নিচে যারা জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় আটকে থাকবে, তারা এবার মুখোমুখি হবে জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার বিভীষিকার। গ্যাস পাইপলাইনের আগুন আর ধোঁয়া ঢুকে পড়বে ধ্বংসস্তূপের ফাঁকফোকরে। বহু মানুষ অক্সিজেন না পেয়ে বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। অন্যদিকে পানির প্রধান পাইপলাইনগুলোও ভূমিকম্পে ফেটে যাবে, যার ফলে ফায়ার সার্ভিস চেষ্টা করলেও আগুন নেভানোর জন্য কোথাও এক ফোঁটা পানি পাবে না। গোটা শহর পরিণত হবে জ্বলন্ত এক চিতায়।


স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধস ও লাশের স্তূপ


বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে ঢাকার ভঙ্গুর চিকিৎসাব্যবস্থা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) কিংবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মতো প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর বহু ভবনই অত্যন্ত প্রাচীন ও ঝুঁকিপূর্ণ। বড় ভূমিকম্পে এসব হাসপাতাল নিজেই বিধ্বস্ত হতে পারে।


হাসপাতালগুলো আংশিক টিকে থাকলেও সেখানে লাখ লাখ মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসার কোনো পরিবেশ থাকবে না। বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণ বিপর্যয়ে পড়বে, ফলে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর বা জরুরি অস্ত্রোপচার কক্ষগুলো অচল হয়ে যাবে। কোনো রক্ত বা জীবন রক্ষাকারী স্যালাইন-ওষুধ অবশিষ্ট থাকবে না। সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসা বা ব্যান্ডেজের অভাবে হাজার হাজার আহত মানুষ রক্তক্ষরণেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। শহরের রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় দেশের বাইরে বা ঢাকার বাইরে থেকে জরুরি ত্রাণ বা ফিল্ড হাসপাতাল নিয়ে আসাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে রাজধানীর রাস্তাঘাট ও অলিগলি রূপ নেবে পচাগলা মরদেহের ভাগাড়ে।

​সমীক্ষার সংখ্যাতত্ত্বে মহাপ্রলয়ের ছবি


এগুলো কোনো মনগড়া দুঃস্বপ্ন নয়, বরং সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে আসা নির্মম পূর্বাভাস। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ‘কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা সিডিএমপি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাইকা-র যৌথ সমীক্ষায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল: মধুপুর বা মানিকগঞ্জ ফল্টে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূকম্পন হলে ঢাকার কমপক্ষে ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি ধসে পড়বে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শহরের আরও লক্ষাধিক স্থাপনা। ​তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারাবে কমপক্ষে ১ থেকে দেড় লাখ মানুষ, আর আহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে তিন লাখ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চরম সংকটে কয়েকদিনের মধ্যে তৈরি হবে মানবিক মহামারী, যা ঢাকাকে আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন একটি পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে রূপান্তরিত করবে।


প্রকৃতি বারবার আমাদের পায়ের নিচের মাটি কাঁপিয়ে চরম সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। টেকটোনিক প্লেটের অমোঘ নিয়মে বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশে হবেই—প্রশ্নটা ‘হবে কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটা হলো ‘কবে হবে’। আমরা প্রকৃতিকে থামাতে পারব না, কিন্তু নিজেদের অবহেলাজনিত নরক তৈরি হওয়া কিছুটা হলেও ঠেকাতে পারি। এখনো যদি নতুন ভবনগুলোতে কড়াভাবে বিল্ডিং কোড প্রয়োগ না করা হয়, বালুভরাট নরম মাটিতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ না করা হয়, শহরের গ্যাস লাইনগুলোতে স্বয়ংক্রিয় ‘অটো-শাটঅফ ভালভ’ না বসানো হয় এবং পাড়া-মহল্লায় প্রশিক্ষিত স্থানীয় উদ্ধারকারী দল গড়ে না তোলা হয়—তবে সেই অনিবার্য দিনে ঢাকাবাসী দেখবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অসহায়তম পরিণতি। উদ্ধারহীন এক দুঃস্বপ্নের কংক্রিট-কবরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে এই শহরের লাখ লাখ প্রাণকে।


____

*লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।

ইমেইল: [email protected]


শেয়ার করুন: