বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে চলনবিলের এক অধ্যক্ষের অনালোচিত ভূমিকার কথা

আনিস রায়হান
আনিস রায়হান
প্রকাশ: ৯ আগস্ট ২০২৬, ৯:৩৯পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে চলনবিলের এক অধ্যক্ষের অনালোচিত ভূমিকার কথা

বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নকারী অধ্যক্ষ এম এ হামিদ

শেয়ার করুন:

বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে বাংলা একাডেমি ও তকীয়ূল্লাহর নাম আলোচিত হলেও এর মূল প্রাণপুরুষ ছিলেন চলনবিলের অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। পঞ্জিকা সংস্কারে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ও উপেক্ষিত জীবনের গল্প নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ।

বাংলা বর্ষপঞ্জি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা কম নয়। তা সত্ত্বেও বর্ষপঞ্জির একটি স্বীকৃত সংস্করণ রয়েছে এবং নানা কাজে এর ব্যবহারও হচ্ছে। কিন্তু এই বর্ষপঞ্জির প্রেক্ষাপট, প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা নিয়ে যে পরিমাণ আলাপ জারি আছে, তার তুলনায় সামান্য আলাপও শোনা যায় না বর্তমানে প্রচলিত এই বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে।

যদিও এই বর্ষপঞ্জি প্রণেতা হিসেবে খানিকটা আলোচিত হয়েছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ভাষাসৈনিক আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। তবে বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও কার্যত বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রচলনের প্রকৃত প্রাণপুরুষ ছিলেন চলনবিলের পাড়ে বেড়ে ওঠা রসায়নশাস্ত্রের এক শিক্ষক।

মধ্যযুগের মহান শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের মতো ‘চলনবিলের আলোর মশাল’ খ্যাত নাটোরের গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘের সভাপতি অধ্যক্ষ এম এ হামিদেরও রয়েছে বহুমুখী পরিচয়। অধ্যাপনার ধারাবাহিকতায় অধ্যক্ষ হয়েই তিনি জীবন সমাপ্ত করেননি, বরং স্বীয় চেষ্টায় হয়ে উঠেছেন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, সাংবাদিক ও লেখক। রাজনীতিসচেতনতা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম শক্তিশালী দিক এবং তিনি ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক। এম এ হামিদ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার আগে আলোকপাত করা যাক প্রচলিত বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে তার অবদানের বিষয়ে।

বহুমুখী অবদানের মধ্যে এম এ হামিদের যে কীর্তিটি জাতীয় চরিত্র ধারণ করেছে, মানুষ জানুক বা না জানুক যে সেবা সকলেই পাচ্ছে, তা হলো বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে তার অনন্যসাধারণ ভূমিকা। বশীর আলহেলাল প্রণীত ‘বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলা বর্ষপঞ্জি আজ আমরা যেভাবে দেখি, মাসগুলো আজ যেভাবে গণনা করা হয় তার মূল উদ্যোগটি ছিল অধ্যক্ষ এম এ হামিদ এমএসসির।

১৯৫৯ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে ফুলস্ক্যাপ মাপের কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় মুদ্রিত একটি প্রচারপত্র বিলি করেন। তাতে তিনি লেখেন, পাকিস্তানের উভয় অংশে সরকারী ও বেসরকারী অফিসসমূহে ইংরাজী তারিখ ব্যবহৃত হওয়ায় বাংলা তারিখের খোঁজ-খবর চাকুরিজীবীরা প্রায়ই রাখেন না।... কিন্তু পূর্ব্ব পাকিস্তানের অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত জনসাধারণ বাংলা তারিখ ছাড়া চলতে পারেন না।... এখন এই বাংলা তারিখ ব্যবহার করতে লোকদের যে অসুবিধায় পড়তে হয় সেইটেই সমস্যা। প্রথম কথা বাংলা কোন মাস কত দিনে হয় পঞ্জিকা না দেখে কেউই বলতে পারবেন না।

একই মাস কোন বৎসরে ২৯ দিনে, কোন বৎসর ৩০ দিনে আবার কোন বৎসর ৩১ দিনে দেখা যায়।... আপনি যদি বিভিন্ন প্রকাশকের ৪/৫ খানা পঞ্জিকা দেখেন, ইংরাজী কোন নির্দ্দিষ্ট তারিখে বাংলা পৃথক পৃথক তারিখ পেতে পারেন।... বাংলা তারিখের জন্য এরূপ বিভ্রাট অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে, যার জন্য বাংলাপ্রিয় বাঙ্গালীকে অনেক জব্দ ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

এম এ হামিদ এই প্রচারপত্রে আরও উল্লেখ করেন, ভারতীয় পঞ্জিকা ছাপা না হওয়া পর্যন্ত এখানকার পঞ্জিকা ছাপা হয় না। পাকিস্তানে প্রকাশিত পঞ্জিকার তারিখে গোলমাল থাকার ভয়ে এখানকার মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছাপা হওয়া পঞ্জিকা বেশি দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য হয়। তিনি লেখেন, ‘আর কতদিন আমরা কলকাতার পঞ্জিকার দিকে হা করে চেয়ে থাকব? আমরা কি বঙ্গাব্দের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্দ্দিষ্ট করে দিতে পারি না?’ সন্দেহ নেই যে, সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য যে এটা কোনো সুখকর ব্যাপার ছিল না, সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

একই প্রচারপত্রে তিনি দুটি বিকল্প প্রস্তাব করে বলেন, এই হিসাব মতে ইংরাজী বৎসরের ন্যায় বাংলা বৎসর ৩৬৫ দিনে এবং অতিবর্ষ অর্থাৎ লীপইয়ার ৩৬৬ দিনে হয়। সহজ হিসাব, গোলমালের অবকাশ নাই। সামান্য শিক্ষিত লোকও এই হিসাব মতে পঞ্জিকা লিখতে বা ক্যালেণ্ডার তৈরি করতে পারেন।... যদি অশিক্ষিত লোকের পক্ষে এই হিসাব মনে রাখা কঠিন হয় তা হ’লে বৈশাখ হতে ভাদ্র পর্য্যন্ত প্রত্যেক মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন হতে চৈত্র্য পর্য্যন্ত প্রত্যেক মাস ৩০ দিনে আর অতিবর্ষ ক্ষেত্রে চৈত্র ৩০ দিন ধরলে হিসাব আরও সহজ হয়।... মোট কথা বাংলা মাসের তারিখ নির্দ্দিষ্ট করাই কাম্য।... তবে আমার একটি কথা, আমাদের বঙ্গাব্দ যেভাবে চল্ছে তাই ঠিক রাখা উচিত।

‘পাক বঙ্গাব্দ’ বা ‘পাক অব্দ’ নাম দিয়ে নতুন কছু করতে যাওয়া উচিত মনে করি না। লোকের বহু দলিল দস্তাবেজ কাগজপত্র বাংলা তারিখের হিসাবে রক্ষিত আছে-আবার নূতন একটি অব্দের অবতারণা করে জনসাধারণকে বিব্রত না করে বঙ্গাব্দকে ঠিক রেখে শুধু মাসের তারিখ নির্দ্দিষ্ট করে দিলেই গোলমাল চুকে যায়।

এখানে এম এ হামিদের কার্যধারার একটি দিক সম্বন্ধে আলোচনা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে জানা যায় বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বর্ণনা থেকে। এম এ হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইটির আশীর্বাণী লিখতে গিয়ে তিনি বর্ণনা করেন, আব্দুল হামিদ একজন সাহিত্যসেবী এবং সমাজসেবক।... প্রতিদিন রাতের খাওয়া শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিনি তাঁর অনুসারী ও গুণগ্রাহীদের কাছে অজস্র চিঠি লিখে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতেন। চিঠির উত্তর না পেলে প্রাপককে ভর্ৎসনা করে মনের জ্বালা নিবারণ করতেন।

ঠিক একই উপায়ে তিনি এই প্রচারপত্রটিও সর্বমহলে প্রেরণ করেন এবং জনমত সংগঠিত করতে থাকেন। বিভিন্নজনের কাছে তিনি এই প্রচারপত্র পাঠাতেন এবং জবাব না পেলে তাদের ভর্ৎসনা করতে কসুর করতেন না। স্বাভাবিকভাবেই তার এই প্রস্তাব বাংলা একাডেমিতেও এসে পৌঁছাল। তিনি ছিলেন একাডেমির ৭৪ নং আজীবন সদস্য। ১৫ নভেম্বর ১৯৫৯ অনুষ্ঠেয় একাডেমির ২য় বার্ষিক সাধারণ সভায় তার বক্তব্যকে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপনের অনুরোধ করেন। তার পত্রের গায়ে ড. মু. এনামুল হক সমর্থনমূলক অনুস্বাক্ষর করেন। কিন্তু বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তাকে চিঠি দিয়ে এই প্রস্তাবকে সুনির্দিষ্ট নয় বলে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানায় এবং বিষয়টি বাংলা একাডেমির আওতাভুক্ত নয় বলে সিদ্ধান্ত দেয়।

বাংলা একাডেমি শুরুতে এম এ হামিদের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলেও ১৯৬২ সালের ১০ জুন একাডেমির তৃতীয় বার্ষিক সভায় ‘বাংলা সালের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণ করা হউক’ মর্মে প্রস্তাব গ্রহণ করে। এরপর এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠিত হয়। এক পর্যায়ে কমিটির সভাপতি হন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের সহজাত চরিত্র যেমন— কমিটি এম এ হামিদের কথা উল্লেখ না করে তার প্রচারিত পূর্বোল্লিখিত দ্বিতীয় প্রস্তাবটিকে হুবহু অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশের জন্য প্রেরণ করে।

এম এ হামিদ নিজের নাম না দেখে একটুও ক্ষুব্ধ হন না, বরং এই সিদ্ধান্তে ‘আপ্লুত হয়ে’ আবার একটি প্রচারপত্র মুদ্রিত করে একাডেমির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং তাতে নতুন প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, “ইংরাজী বৎসরের ন্যায় চার দ্বারা বিভাজ্য বঙ্গাব্দকে লিপ-ইয়ার ধরিলে ইংরাজী সালের সঙ্গে একটা মিল থাকে।” এরপর একপর্যায়ে একাডেমির গঠিত কমিটি তাদের চূড়ান্ত সভায় এম এ হামিদকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি সেখানে উপস্থিত হন।

ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়,

১. যেহেতু রাশি, নক্ষত্র এবং ঋতুর সঙ্গে বাংলা মাসের পর্যায়ক্রম নির্ণয় করা হয় সেজন্য বৈশাখ মাস ১লা এপ্রিল হইতে গণনা করা সম্ভবপর নহে।

২. ইংরেজী মাস ২৮, ৩০ কিংবা ৩১ দিনে হয়। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্তে বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ মাস হইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিন হিসাবে এবং আশ্বিন মাস হইতে চৈত্র মাস পর্যন্ত ৩০ দিন হিসাবে গননা করা হইবে।

৩. অতিবর্ষে (লিপ-ইয়ারে) চৈত্র মাস ৩১ দিন হইবে। ৪ দিয়ে যে সাল বিভাজ্য তাহাই অতিবর্ষ বলিয়া পরিগণিত হইবে।

৪. মোগল আমলে বাদশাহ আকবরের সময় যে বঙ্গাব্দ প্রচলিত করা হইয়াছিল তাহা হইতেই বৎসর গণনা করিতে হইবে এবং সেই হিসাবে আগামী ১লা বৈশাখ হইবে ১৩৭৩ বাংলা সাল।

৫. বাংলা একাডেমীর তরফ হইতে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩৭৩ সালের জন্য একটি দেওয়ালপঞ্জী তৈয়ার করিতে হইবে।

এ পর্যায়ে বাংলা একাডেমি প্রণীত বর্ষপঞ্জি কোনো কোনো পত্রিকা অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু ব্যাপকভিত্তিক প্রচলন না ঘটায় তারা আবার পুরোনো পঞ্জিকায় ফেরত যায়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান আগের রীতিতেই অটল থাকে। এর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের চেতনাও ছিল। নতুন প্রণীত পঞ্জি চালু হলে ভারতীয় পঞ্জিকা বিক্রির ব্যবসা শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখেও তারা এই নতুন প্রচলনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এম এ হামিদ এর প্রেক্ষিতে আরেকটি প্রচারপত্র বিলি করেন।

যেখানে বলা হয়, ‘অত্যন্ত দুঃখের কথা, পূর্ব-পাকিস্তানের পঞ্জিকা বা পাঁজীপুঁথি প্রকাশকগণ ‘বাংলা একাডেমী’ কর্তৃক গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে আদৌ সম্মান দিতেছেন না। তাঁহারা ভারতের পঞ্জিকা নকল করিয়া পঞ্জিকা প্রকাশের ব্যবসা এখনও পরিত্যাগ করেন নাই।’ কিন্তু তার এই ওজর-আপত্তিতে সমস্যার সুরাহা হয় না।

অল্পকালের মধ্যেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকগণ এরপর দফায় দফায় সরকারের কাছে আবদার জানায় নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করার জন্য। কারণ পুরোনো বর্ষপঞ্জির কারণে বাংলা মাসের তারিখ নিয়ে জটিলতা লেগেই ছিল। কয়েকবার এ নিয়ে সরকারের কমিটি গঠিত হয়।

কিন্তু কেউই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয় না। ধারণা করা যায়, এর কারণ ছিল পাকিস্তান চেতনার বিরোধিতা। বাংলাদেশ গঠনের পর পাকিস্তান আমলের সব সংস্কার উদ্যোগকেই নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। যার মধ্যে এই উদ্যোগটিও পড়ে। এমন অবস্থায় এই উদ্যোগকে বাংলা বর্ষপঞ্জির ইসলামীকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকতে পারে।

অবশেষে এই উদ্যোগটি বাস্তব রূপ পায় ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশ সরকার সে বছর বঙ্গাব্দ ১৪০২-১৪০৩ বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে। তখন এর নাম দেওয়া হয় ‘শহীদুল্লাহ পঞ্জিকা’। জানা যায়, এর আগে ১৯৮৮-৮৯ সালে বাংলাদেশে একটি সমন্বিত বিজ্ঞানসম্মত বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের কথা মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ও অন্যান্য লেখকরা বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতে থাকেন। মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্যালেন্ডার তৈরি করেন এবং তা বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটিতে পেশ করে দেখান যে, এর কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে দেরিতে হলেও সম্মান জানায়। তবে সর্বশেষ উদ্যোগে তকীয়ূল্লাহর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় নতুন বাংলা বর্ষ রীতির প্রাণপুরুষ অধ্যক্ষ এম এ হামিদ ছাড়া আর কেউ নন। যদিও কোনো সম্মাননা দূরে থাক, তার অবদানের স্বীকৃতিই এখনও মেলেনি, আজ অবধি তিনি উপেক্ষিত।

‘চলনবিলের ইতিকথা’, ‘চলনবিলের লোকসাহিত্য’সহ তথ্যসমৃদ্ধ ২৬টি গ্রন্থের প্রণেতা সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ ১৯৩০ সালের ১ মার্চ তৎকালীন রাজশাহী ও বর্তমান নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামের এক অবস্থাসম্পন্ন কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি রসায়নশাস্ত্রে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তার কর্মজীবন বর্ণাঢ্য। সাংবাদিকতা, অধ্যাপনা, সমাজসেবা ও অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গঠনে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজ, যশোরের মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজের মতো খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন। অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বগুড়া আজিজুল হক কলেজে।

সাংবাদিকতায় তার অবদানের বর্ণনা মেলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা এম এ হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইটির আশীর্বাণী থেকে, তাঁর রচিত বহু সদগ্রন্থের মধ্যে তাঁর নবমতম অবদান “চলনবিলের ইতিকথা” একটি গবেষণামূলক তথ্যপূর্ণ রচনা। এছাড়াও তিনি মহান পেশা সাংবাদিকতার পথকে অবহেলিত চলনবিলের দ্বারপ্রান্তে উন্মেষ ঘটানোর লক্ষ্যে মাসিক “আমাদের দেশ” পত্রিকা, “বার্ষিক অভিযান” ও “সোপান” পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং “চলনবিলের ঢেউ”, পাকিস্তানের কোয়েটা থেকে প্রকাশিত “বোলানের ডাক”, বড়াইগ্রামের “নয়াজিন্দেগী”, নাটোরের “নবারুণ”, পাকিস্তানের লয়ালপুরের মাসিক “হামারা ওয়াতন”, লন্ডনের মাসিক “আওয়ার হোম” প্রভৃতি পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং “দৈনিক সংগ্রাম ও দৈনিক পয়গামের” নিয়োগপ্রাপ্ত ধুরন্ধর সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

সমাজসংস্কারক হিসেবেও এম এ হামিদের অবদান অনন্য। চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে খুবজিপুর গ্রামে ১৯৭৮ সালে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় চলনবিল জাদুঘর। এটি এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্বাধীনে থাকলেও চরম অবহেলার শিকার হয়ে ধ্বংসের মুখে। তার গঠিত গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘ ছিল সেকালের আলোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া সেরাজুল হক সাহিত্য পরিষদ, পাবনা বিজ্ঞান পরিষদ ও চলনবিল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ কর্মজীবনে যেখানে যখন ছিলেন সেখানেই কিছু না কিছু গড়ে তুলেছেন।

চলনবিলের জনগণের কাছ থেকে ‘বিলচলনী’ ও ‘চলনবিলের আলোর মশাল’ নামে খ্যাতি পাওয়া এই কৃতি অধ্যাপক কেবল সমাজসেবা বা সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবক নন, রাজনীতির প্রশ্নেও ছিলেন সচেতন। তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্টে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাকে তমঘায়ে খেদমত (টিকে) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা পাক স্বৈরাচার বাহিনীর হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে নির্মমভাবে শহীদ হলে তার প্রতিবাদস্বরূপ ঘৃণাভরে ওই খেতাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু খেতাব বর্জন করেই তিনি শান্ত থাকেননি। গুরুদাসপুর থানা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে শহীদ জোহার স্মৃতির স্মরণে গুরুদাসপুর উপজেলা সদরে ‘বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট এম এ হামিদ বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু অদ্যাবধি তিনি রয়ে গেছেন সবার আড়ালে। বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে ওঠা এই গবেষক, ভাষাসৈনিক ও সমাজকর্মী তার জীবদ্দশায় সরকারি-বেসরকারি তেমন কোনো স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে জানা যায় না। বাংলা নববর্ষ পালনের সময় বা বাংলা বর্ষপঞ্জি বিষয়ক কোনো আলোচনায় তার নাম উচ্চারিত হয় না। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি আমলে নেবেন এবং তাকে প্রাপ্য মর্যাদায় ভূষিত করবেন, এটাই চাওয়া।

_________

*আনিস রায়হান: লেখক ও গবেষক 

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন: