উপমহাদেশের বিভাজন, জিন্নাহর রাজনীতি ও ভূরাজনীতির কৌশলগত খেলা: একটি পর্যালোচনা

শফি রহমান
শফি রহমান
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ৭:১৩পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
উপমহাদেশের বিভাজন, জিন্নাহর রাজনীতি ও ভূরাজনীতির কৌশলগত খেলা: একটি পর্যালোচনা
শেয়ার করুন:

মওদুদী জিন্নাহর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে 'অ-ইসলামিক' মনে করতেন এবং জিন্নাহকে 'কায়েদে আজম'-এর বদলে 'কাফের-এ-আজম' বলেও তিরস্কার করেছিলেন। মওদুদীর মতে, ভৌগোলিক বা ভাষাগত জাতীয়তাবাদ ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং এই প্রেক্ষিতেই তিনি পাকিস্তানকে 'না-পাকিস্তান' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে ১৯৪৭ সালের সীমান্তরেখা কেবল দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক ভূরাজনীতি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উত্থান এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধাবাদের এক জটিল ফসল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রূপান্তর এবং পরবর্তীতে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে শ্রেণীস্বার্থ, ধর্মীয় রাজনীতি এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সামরিক কৌশল একটি মহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল।

জিন্নাহর রাজনীতির বাঁক-বদল: উদীয়মান জাতীয়তাবাদী থেকে ঔপনিবেশিক অক্ষ

 

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন উদারপন্থী, সংবিধানবাদী নেতা। গোপাল কৃষ্ণ গোখলে তাঁকে "হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত " হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি ১৯২০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ ও স্বরাজ আন্দোলন এবং আইন অমান্য নীতির বিরোধিতা করেন। তিনি সাংবিধানিক পন্থায় রাজনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের পক্ষে ছিলেন। খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতির গণ-সংযোগ ঘটানোর মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক কৌশলকে জিন্নাহ পছন্দ করেননি। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনলে তা চরমপন্থা ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে উস্কে দেবে। তাঁর মতে, খেলাফত আন্দোলন ছিল মূলত ভারতের বাইরের একটি বিষয় (ওসমানীয় সাম্রাজ্য রক্ষা) এবং এটি ভারতীয়দের মধ্যে যৌক্তিক রাজনৈতিক চেতনার চেয়ে ধর্মীয় আবেগকে বেশি আলোড়িত করেছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। এর ফলে ১৯২০ সালে নাগপুর কংগ্রেসে গান্ধীর নীতির সাথে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। 

১৯৩৭ সালের অবিভক্ত ভারতের প্রাদেশিক নির্বাচনে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে (বেঙ্গল, পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া) আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে লীগ ধসে পড়ে। এই রাজনৈতিক ভরাডুবি জিন্নাহর কৌশলে এক আমূল পরিবর্তন আনে।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের ভারতীয়দের সম্মতি ছাড়া যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিবাদে প্রাদেশিক সরকারগুলো থেকে পদত্যাগ করে। এই শূন্যতাকে জিন্নাহ নিখুঁত রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি ১৯৩৯ সালের ২২ ডিসেম্বরকে "মুক্তি দিবস" (Day of Deliverance) হিসেবে পালন করেন এবং তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার বিশ্বযুদ্ধের রসদ ও ভারতীয় সৈন্য সংগ্রহের জন্য জিন্নাহর সমর্থন প্রার্থনা করে। জিন্নাহ শর্ত দেন, ভারতের ভবিষ্যতের যেকোনো সাংবিধানিক সমাধানে মুসলিম লীগকে ভারতীয় মুসলমানদের "একচ্ছত্র প্রতিনিধি" হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই দরকষাকষির মধ্য দিয়েই ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং জিন্নাহ ভারতীয় রাজনীতিতে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হন। 

ধর্মীয় কার্ড, আঞ্চলিক জোট ও তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণ


১৯৪০-এর দশক থেকে জিন্নাহ তাঁর সাবেক ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক অবস্থান থেকে সরে এসে "ইসলাম বিপন্ন" শ্লোগান ও দ্বি-জাতি তত্ত্বকে রাজনীতির মূল হাতিয়ার করেন। নিজের রাজনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের পরোক্ষ সহযোগিতায় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি (পরবর্তীতে ক্ষমতাচ্যুত করে লীগকে প্রতিষ্ঠিত করা), পাঞ্জাবের ইউনিওনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতাদের, এবং সিন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মুসলিম লীগে ভিড়াতে সক্ষম হন। 


এই সময়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:

•  ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই): ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল জটিল। ১৯৪২ সালে গণপরিষদে জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কিত গঙ্গাধর অধিকারী থিসিসের (Adhikari Thesis) মাধ্যমে সিপিআই তাত্ত্বিকভাবে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর পৃথক হওয়ার অধিকারকে সমর্থন করে। জিন্নাহ কৌশলগতভাবে কমিউনিস্টদের এই অবস্থানকে নিজের দাবির সপক্ষে ব্যবহার করেছিলেন, যদিও কমিউনিস্টদের আদর্শের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্রব ছিল না।

 

•  জয়প্রকাশ নারায়ণের কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি: তারা দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করে এবং একে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিভাজন নীতির অংশ হিসেবে দেখে পূর্ণাঙ্গ গণসংগ্রামের দাবি জানায়।

•  কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতৃবৃন্দ: মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খান আবদুল গাফফার খান এবং রফি আহমেদ কিদোয়াইরা জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেন। মাওলানা আজাদ সতর্ক করেছিলেন যে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের স্থায়ী ক্ষতি করবে। জিন্নাহ ক্ষুব্ধ হয়ে মাওলানা আজাদকে "কংগ্রেসের শো-বয়" বলে আখ্যায়িত করেন।

•  কংগ্রেসের সঙ্গে জিন্নাহর বৈরিতা: জওহরলাল নেহরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে জিন্নাহর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব পৌঁছায় চরমে। নেহরুর একক কেন্দ্রমুখী ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে জিন্নাহ দাবি করেন মুসলিম স্বাধিকার।

ভারত বিভাজন ও ভূরাজনৈতিক কৌশল: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ছক

মহাত্মা গান্ধী নীতিগতভাবে বিভাজনের বিরোধী হলেও জওহরলাল নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেল একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার বিশিষ্ট অবিভক্ত ভারতের (ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা) চেয়ে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারসহ বিভক্ত ভারত গ্রহণ করাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। পাশাপাশি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ডানপন্থী অংশও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির চর্চাকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছিল। ঐতিহাসিক ও উন্মুক্ত হওয়া ব্রিটিশ সামরিক ও কূটনৈতিক দলিলপত্র (Wavell Papers, Transfer of Power documents, এবং Sir Olaf Caroe-এর মূল্যায়ন) এবং আধুনিক বিশ্লেষকদের (যেমন নরেন্দ্র সিং সারিলার The Shadow of the Great Game) গবেষণা নিশ্চিত করে যে, ভারত বিভাগ কেবল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফল ছিল না, এর পেছনে ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজের গভীর ভূরাজনৈতিক কৌশল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়।

•  সাম্যবাদ ঠেকানোর প্রাচীর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় এবং বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদের প্রসার, চীনে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিপ্লবের আসন্ন বিজয়, এবং ১৯৪৬ সালে বোম্বাইয়ে রাজকীয় ভারতীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহ, ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তেভাগা ও তেলেঙ্গানা সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান ও বামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে শংকিত করে তোলে।


•  ওলাফ ক্যারো থিসিস: কমিউনিজম ঠেকাতে ব্রিটিশ রাজের পররাষ্ট্র সচিব স্যার ওলাফ ক্যারো এবং ফিল্ড মার্শাল ওয়াভেল একটি "স্ট্র্যাটেজিক বাফার জোন" বা "ইসলামিক আর্ক" গঠনের পরিকল্পনা করেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি অনুগত, পশ্চিমামুখী এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী “পাকিস্তান” সৃষ্টি করা গেলে তা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মধ্য এশিয়ায় ও ভারত মহাসাগরে প্রভাব রুখতে বাধা দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তায় ঘাঁটি হিসেবে কাজ করবে। ফলে, ব্রিটিশরা অতি দ্রুত ও তড়িঘড়ি করে রেডক্লিফ লাইনের মাধ্যমে দেশভাগ নিশ্চিত করে প্রস্থান করে। 

•  ব্রিটিশ মিলিটারির ছক: ব্রিটিশ সামরিক নীতি নির্ধারকরা (বিশেষ করে মিডল ইস্ট ও সাউথ এশিয়ার কমান্ড) উপলব্ধি করেন যে, স্বাধীন অখণ্ড ভারতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জোটে না গিয়ে সমাজতান্ত্রিক ভাবাপন্ন ও জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করতে পারেন। এতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং পারস্য উপসাগরের তেল সম্পদে ব্রিটিশ ও পশ্চিমা আধিপত্য বজায় রাখার জন্য উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় সামরিক কৌশলগত সুবিধার জন্য “পাকিস্তান” গঠনকে ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণ করা হয়।


মওদুদী, জামায়াতে ইসলামী ও আদর্শিক চরম বৈপরীত্য

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৪৭ সালের পূর্বে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী এবং তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ছিল ঘোর বিরোধীতামূলক। মওদুদী জিন্নাহর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে 'অ-ইসলামিক' মনে করতেন এবং জিন্নাহকে 'কায়েদে আজম'-এর বদলে 'কাফের-এ-আজম' বলেও তিরস্কার করেছিলেন। মওদুদীর মতে, ভৌগোলিক বা ভাষাগত জাতীয়তাবাদ ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং এই প্রেক্ষিতেই তিনি পাকিস্তানকে 'না-পাকিস্তান' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠিত হয়ে যাওয়ার পর মওদুদী তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি ভারত থেকে পাকিস্তানে লাহোরে চলে আসেন এবং নবগঠিত রাষ্ট্রকে একটি থিওক্রেটিক বা চরমপন্থী ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করার কৌশল গ্রহণ করেন।

১৯৫৩ সালে পাঞ্জাবে কাদিয়ানী বা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে মওদুদী পুস্তিকা “কাদিয়ানি মাসআলা” প্রকাশ করেন এবং তাঁর দল সহিংস আন্দোলন শুরু করে। এই দাঙ্গায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং লাহোরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সামরিক শাসন জারি করা হয়। মওদুদীকে মূল উসকানিদাতা হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়। পরবর্তীতে সৌদি আরব সহ উগ্র রক্ষণশীল শক্তির রাজনৈতিক চাপে এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সমঝোতায় তাঁর সাজা কমিয়ে লঘুপাপ করা হয় এবং তিনি মুক্তি পান। 

মুক্তির পর মওদুদী ও তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি মিলিটারি-ব্যুরোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্টের প্রধান রাজনৈতিক সহযোগীতে পরিণত হয়। প্রগতিশীল, বামপন্থী ও ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দমন করতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা মওদুদীকে ব্যবহার করে। এই রাজনৈতিক আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে, যখন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা, এবং আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন করে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। 


রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক: জিন্নাহ, মওদুদী এবং জামায়াতের অবস্থান

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন "উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা", তখন পূর্ব পাকিস্তানের উদীয়মান বাঙালি ছাত্র-তরুণ সমাজ তা প্রত্যাখ্যান করে। এই ভাষা বিতর্কে মওদুদী ও তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বাংলা ভাষা বিরোধী। মওদুদী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর একচ্ছত্র আধিপত্যকে সমর্থন জানান। জামায়াত মনে করত, বাংলা ভাষার দাবি হলো "উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিকতাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী ষড়যন্ত্র", যা ইসলামের ঐক্যকে বিনষ্ট করবে। তারা বাঙালির ভাষার অধিকারকে 'প্রাদেশিকতা' এবং 'ইসলামের শত্রুতা' হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তান সরকারের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপকে আদর্শিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। 

পরিশেষে বলা যায়, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কৌশলগত ধর্মীয় রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজের সাম্যবাদবিরোধী ভূরাজনৈতিক নকশা, এবং সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামীর চরমপন্থী ধর্মীয় সুবিধাবাদ—এই তিনটি ধারা ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ডতাকে টুকরো টুকরো করেছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে, ধর্মকে যখনই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও এলিট শ্রেণীর ক্ষমতার হাতিয়ার করা হয়েছে, তখনই তার বলি হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। ১৯৪৭ সালের রক্তাক্ত দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সমগ্র ইতিহাস মূলত এই ঔপনিবেশিক নকশা ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক অপশক্তির বিরুদ্ধেই এক ধারাবাহিক মুক্তির সংগ্রাম।


-- --

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।


শেয়ার করুন: