মতাদর্শ বনাম পোস্ট আইডিওলজির আখ্যান: মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে

উইঙ্কল টুইঙ্কল সিনেমা রিভিউ
আসলে যতই নব্যউদারতাবাদ বা নিওলিবারালিজম আর কনজিউমার ম্যানেজমেন্ট ও করপোরেট পুঁজি মতাদর্শিক রাজনীতিকে দূরে ঠেলে কেবলমাত্র ক্ষমতার দরকষাকষির বন্দোবস্ত কায়েম করতে নানা তৎপরতা চালাক, তবুও মতাদর্শ বেঁচে থাকে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে নিজের আঙ্গিকে বদল ঘটাতে পারে। স্থান-কাল প্রেক্ষিতে তৈরি হতে পারে নয়া কৌশল ও রণনীতি। কিন্তু মতাদর্শ জীবিতই থাকে।
“উদারতাবাদ রাজনীতিকে বিলুপ্ত করেছে। আজকের দিনে যা রাজনীতি নামে পরিচিত তা আসলে কোনো মতাদর্শিক লড়াই নয়। বরং তা হলো কেবলই কনজিউমার ম্যানেজমেন্ট বা ক্রেতা-ভোক্তা ব্যবস্থাপনা।”
— আলেকজান্ডার দুগিন, ‘দ্য ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’
উত্তর-ভুবনায়িত দুনিয়ায় যখন বাজার অর্থনীতি ক্রমে জাঁকিয়ে বসছে তৃতীয় বিশ্বের ভুবনে, যখন পক্ষ ও প্রতিপক্ষের চিরাচরিত দ্বন্দ্বের চেনা ছক আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে, শ্রমিক-কৃষকসহ মেহনতি মানুষের সমাজ কায়েম করার স্লোগান আউড়ে যারা অধিষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় বিশ্বের বহুদলীয় বুর্জোয়া লিবারাল ডেমোক্রেসির ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে— সেই তথাকথিত বামপক্ষই যখন গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রইকার পথ ধরে বৃহৎ পুঁজির রাজনৈতিক এজেন্সিতে পর্যবসিত, যখন আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা পুঁজিবাদী (মতান্তরে আধা ঔপনিবেশিক) ব্যবস্থার পরিবর্তনে জনগণতান্ত্রিক কিংবা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বুলি কেবলমাত্র ধুলোপড়া মলাটের ভিতরে শীর্ণকায় অক্ষরে পরিণত, ঠিক তখন, ঠিক তখনই রিপ ভ্যান উইঙ্কেলের দীর্ঘ বিশ বছরের নিদ্রাভঙ্গের উপাখ্যানের সূত্র ধরে নাট্যকার ব্রাত্য বসু সৃজন করলেন বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসের অমূল্য রত্ন ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’।
যে নাটকের সূত্রে বাবা ও ছেলের রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বন্দ্ব থেকে উঠে এসেছিল মতাদর্শ ও পোস্ট আইডিওলজির দ্বন্দ্ব। ২০০২ সালে বসু-বিরচিত সেই নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছিল নাট্যদল ‘সংসৃতি’র প্রযোজনায় এবং নাট্যপরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। ক্রমে তা ২০২৬ সালে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সৃজনে।
যদিও তখনও দুনিয়া ডিজিটাইজড হয়নি, তখনও পৃথিবী অ্যানালগ, তখন সবেমাত্র কি-প্যাড মোবাইল উপমহাদেশের মেট্রো শহরগুলিতে মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে, তখনও সম্পাদকীয় নীতির নামে পুরোদমে শাসকপক্ষ ও করপোরেট পুঁজির তল্পিবাহক হয়ে ওঠেনি গণমাধ্যম, তখনও ছায়াছবি রুপালি পর্দা থেকে ঢুকে পড়েনি ওটিটির মোবাইল স্ক্রিনে, তখনও মার্কিনি তৎপরতায় ঘাড় ধরে শাসনক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হয়নি সাদ্দাম হুসেন কিংবা গাদ্দাফিকে।
তখনও চোখ-হাত-মুখ বেঁধে অপহরণ করা হয়নি ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে। তখনও শুরু হয়নি ওয়ার অন টেররের নামে ইসলামি বিশ্বের ওপর মার্কিন হানাদারি। তখনও কেউ ভাবতে পারেনি মুসলিম গণহত্যায় হাত রাঙিয়ে ফেলা দুই কুখ্যাত রাজনীতিবিদ শাসন করবেন ভারত, তখনও কল্পনা করা যায়নি পশ্চিমবঙ্গে একদিন উড়বে গেরুয়া ধ্বজা, কেড়ে নেওয়া হবে বাংলার ভূমিসন্তানের নাগরিক পরিচয়, তখনও কেউ ভাবতে পারেনি জেনারেশন জেড নামের একটি প্রজন্ম রাস্তায় নেমে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা আর ইন্দোনেশিয়ার শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন আনবে, আর তার ঢেউ এসে পড়বে নয়াদিল্লিতে, দিল্লির শাসক মাথা নিচু করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করাবে মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে।
তখনও রক্তমাংসের মানুষের তথ্য-উপাত্তের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়নি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে… কিন্তু সোভিয়েত পতন, বাজার অর্থনীতির আমদানি, জোট রাজনীতির সূচনায় বদলে যাওয়া উপমহাদেশ তথা ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালে রচিত সেই নাটকের চলচ্চিত্রের রূপায়ণ যখন হলো তখন সময়টা ২০২৬। যখন নাটকের প্রেক্ষাপটের থেকেও অনেক অনেক বদলে গিয়েছে কলকাতা শহর, বদলে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, বদলে গিয়েছে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র, বদলে গিয়েছে উপমহাদেশ এবং গোটা বিশ্ব। বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে আপস ও শ্রেণিরাজনীতির সঙ্গে গাদ্দারি করার অভিযোগ কাঁধে নিয়ে সরে যেতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারকে।
তারপর একদিকে দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগে জেরবার হয়ে এবং অন্যদিকে দিল্লির খবরদারি ও অতিদক্ষিণপন্থী হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি আরএসএস-বিজেপির সর্বগ্রাসী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির হানাদারির জেরে পতন হয়েছে মা-মাটি-মানুষের স্লোগান দেওয়া তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন শাসকেরও।
যখন মতাদর্শ নয় বরং বিশ্বায়িত পুঁজির সঙ্গে দরকষাকষি ও জাতিবিদ্বেষী সংস্কৃতিই রাজনীতির একমাত্র রূপ হিসেবে প্রায় প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের জনমানসে, তখনই ২০০২ সালে রচিত নাটকে ধারণ করা বৈপ্লবিক কমিউনিজম বনাম সংসদীয় ও সংশোধনবাদী প্রাতিষ্ঠানিক বামপন্থার চিরাচরিত মতাদর্শিক আর্গুমেন্ট বনাম ক্ষমতার সেটেলমেন্টের উত্তর-মতাদর্শিক ঝোঁকের তীব্র দ্বন্দ্বের আখ্যানকে ২০২৬-এর চলচ্চিত্রের রূপ দিলেন চলচ্চিত্র নির্দেশক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। মতাদর্শ ও উত্তর-মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের টেক্সটের রূপান্তর ঘটালেন থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রে। এবং জিইয়ে রাখলেন প্রশ্ন, এই মতাদর্শহীনতার যুগেও কি ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গান গাইতে গাইতে মতাদর্শের সেনানীরা সামাজিক অগ্রসরতার অনুঘটক হয়ে ওঠেন!
মঞ্চের মায়া, থিয়েটারের দ্রোহকথা
রিপ ভ্যান উইঙ্কল ঘুমিয়ে ছিলেন ২০ বছর। আর ১৯৭৬ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা চলাকালীন পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লুকিয়ে পড়া সিপিআইএম কর্মী সব্যসাচী সেন কোনো এক অন্ধকার ঘুপচির আড়ালে ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর ঘুম ভাঙে ২৬ বছর বাদে। সময়টা ২০০২ সাল। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তিনি বুঝতে পারেন না যে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম ভাঙার পর তাঁর চারপাশটা একেবারে অচেনা লাগে। রাস্তায় সম্পূর্ণ অচেনা রাজনৈতিক দেয়াললিখন। লোকজনের হাতে মোবাইল।
কলকাতার অবকাঠামোর বদল… অদ্ভুত লাগে তাঁর। তিনি কোনোক্রমে বাড়ি ফেরেন। ততদিনে তাঁর শিশু পুত্রসন্তান যুবক। পুলিশি ধাওয়ায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী রাজলক্ষ্মী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে তাঁদের কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। আজন্ম বাপের মুখ না দেখতে পাওয়া সেই কন্যাসন্তানও ততদিনে যুবতী। বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন তাঁর পুত্র রীতিমতো এক যুবক। কন্যা ইন্দ্রাণীকে চিনতে পারেন না প্রাথমিকভাবে। পরে তিনি জানতে পারেন ছাব্বিশ বছর সময় নাকি কেটে গিয়েছে। তাঁর ছেলে ইন্দ্র তাঁকে জানায়, মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শ এখন অচল। সোভিয়েতের পতন হয়েছে।
আমদানি হয়েছে বাজার অর্থনীতি। গ্লাসনস্ত পেরেস্লেইকা। ’৬৯-এ সিপিএম ভেঙে নকশালপন্থীরা তৈরি করেছিলেন সিপিআই(এমএল), সেই সিপিএমে আবারও ভাঙন হয়েছে। একদা দাপুটে সিপিএম যুবনেতা সাইফুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে পার্টি ফর ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম বা পিডিএস। কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। যার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীই সব্যসাচীর পুত্র ইন্দ্র। ইন্দ্র তাঁর বাবার মতাদর্শকে তিরস্কার করতে থাকে। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারণে সে চাইলে বিজেপি, এমনকী বাবরি মসজিদ ভাঙা করসেবক হয়ে যেতে পারে বলেও জানায়। ইন্দ্র তার বাবাকে জানায় যে সে তাঁকে নাম ধরে ডাকবে, ‘বাবা’ সম্বোধন করতে পারবে না।
সব্যসাচীর মনে পড়ে যায় তাঁর কংগ্রেসি বাবার কথা। যিনি তাঁর ছেলের কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা মেনে নিতে পারেননি। আর সব্যসাচীও একইভাবে তাঁর বাবাকে সেদিন নাম ধরে ডেকেছিলেন। ক্রমে নাটকে হাজির হয় লগ্নিপুঁজি আর ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করে চলা সংশোধনবাদী এক সিপিএম নেতা, সত্তরের স্ট্রাগলের দিনগুলোয় যাঁর টিকি খুঁজে পাওয়া যায়নি। হাজির হন এক বসে যাওয়া নকশালপন্থী নেতাও। উত্তাল সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল্যায়ন চলে। চলতে থাকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংশোধনবাদ বনাম বিপ্লবী বামপন্থার মতাদর্শিক আর্গুমেন্ট।
আর সেসবের মুখোমুখি বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের ইন্দ্রর নয়া রাজনীতি তথা উত্তর-মতাদর্শিক প্রতিযুক্তি। এক সময় ইন্দ্র বুঝতে পারে, তাদের নয়া সামাজিক-রাজনৈতিক বন্দোবস্তর মাঝে হাজির হওয়া তার বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শ তাদের বাস্তবতাকে জটিলতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। তার কমিউনিস্ট গেরিলা বাবার যে পিস্তল লুকিয়ে রেখেছিলেন তার মা, সেই পিস্তল দিয়েই সব্যসাচী সেনকে খুন করতে চায় ছেলে ইন্দ্র। সেই সময় কাজী নজরুলের ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গান গাইতে গাইতে অন্ধকারে মিলিয়ে যান সব্যসাচী সেন। আর এভাবেই নাটকের সব্যসাচী সেন নামের প্রধান চরিত্রের সেই ‘অরা’ বা আভা দর্শকের মনে বিশেষ তাড়না তৈরি করেছিল।
আর তাই ২০০৬ সাল থেকে বামফ্রন্ট সরকারের কৃষিজমি অধিগ্রহণ তথা বহিরাগত পুঁজিপতিদের দ্বারা শিল্পায়ন তথা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গঠনের তৎপরতার বিরুদ্ধে বামফ্রন্টের বাইরে থাকা বিপ্লবী কমিউনিস্ট দল, সংগঠনসমূহ ও বুদ্ধিজীবীরা মিলিতভাবে অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যে আন্দোলন শুরু করেছিল, সেই আন্দোলনের পিছনে শ্রেণিচেতনার সাংস্কৃতিক প্রেরণা হয়ে উঠতে পেরেছিল ব্রাত্য বসুর এই নাটক।
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের ঐতিহাসিক পতন হয়। নকশালপন্থী, মাওবাদী, এসইউসি, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ইত্যাদি শক্তির কাঁধে ভর করে এবং শ্রেণিসংস্কৃতিতে আস্থা রেখে সেন্টার রাইট থেকে সেন্টার লেফট হয়ে ওঠা তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মা-মাটি-মানুষের জোট সরকার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। যদিও পরে ক্রমেই তারা কয়েক বছরের মধ্যেই সেন্টার লেফট পজিশন থেকে স্খলিত হয় বলেও মনে করেন অনেকেই। সে অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।
নাটকে অভিনয় করে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন সব্যসাচী চরিত্রে দেবশঙ্কর হালদার আর ইন্দ্র চরিত্রে রজতাভ দত্ত। বাকি অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়, নাটকের মঞ্চ-কম্পোজিশন, সেট, মিউজিক— সবকিছুই দর্শকের মনে আলোড়ন তৈরি করেছিল। এই নাটকটির মাধ্যমেই নাট্যকার ব্রাত্য বসু প্রমাণ করেছিলেন উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তদের পরে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা থিয়েটারে তিনিই কাল্ট ফিগার। পরবর্তীতে নাটকের সফল নির্দেশনায় দেবেশ চট্টোপাধ্যায় বাংলা মঞ্চ নাট্যাঙ্গনের নয়া নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
রূপালি পর্দায় উইঙ্কল টুইঙ্কল
থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রের রূপায়ণে নাটক তথা অভিনয়শিল্পের ‘অরা’ বা আভা অনেকাংশে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেও শিল্পতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর গ্রন্থ ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দ্য এজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন’-এ বলছেন, “আমাদের পানশালা, শহরের অলিগলি, অফিস ও শোবার ঘর, রেলস্টেশন আর কারখানাগুলো আমাদের এমনভাবে বন্দি করে রেখেছিল যে মনে হতো মুক্তির কোনো উপায় নেই। তারপর এলো চলচ্চিত্র; আর এই মাধ্যমটি সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগের ডিনামাইট দিয়ে এই বন্দি বিশ্বকে গুঁড়িয়ে দিল। এখন আমরা ধ্বংসস্তূপের মাঝে ক্লোজ-আপ আর স্লো-মোশনের সাহায্যে এক রোমাঞ্চকর অভিযাত্রায় মেতে উঠতে পারি।”
থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর টেক্সট কিয়দংশের ‘অরা’ হারালেও তার ডিসকোর্সের সম্ভাবনাও প্রশস্ত হয়েছে সিনেমা মাধ্যমের নিজস্ব ল্যাঙ্গুয়েজ ও চলচ্চিত্র নির্দেশকের আন্তরিকতায়। যা বোঝা যায় ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ সিনেমার একেবারে শেষে গিয়ে। সে কথায় পরে আসছি।
নাটকে ইন্দ্রের চরিত্রে অভিনয় করা রজতাভ দত্তকে সিনেমার একেবারে শুরুতে দেখা যায় অন্য আরেকটি চরিত্রে। ২০০২ সালের কোনো এক সকালে কলকাতা শহরের নির্জন কোনো এক প্রান্তে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে সত্তরের পুলিশি শ্বেত সন্ত্রাসের এক টুকরো বিবরণের কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে। ক্রমে ছবিতে হাজির হন সব্যসাচী সেন, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী।
একে একে বাকি চরিত্রগুলিও পর্দায় হাজির হতে থাকেন। ছাব্বিশ বছর বাদে প্রায় বার্ধক্যে উপনীত সব্যসাচীর স্ত্রী রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনসূয়া মজুমদার। তাঁর যৌবনবেলা, অর্থাৎ সিপিআইএমের রাজনৈতিক কর্মী কমরেড রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে সোহিনী সরকার আর ছেলে ইন্দ্রর চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। কন্যা ইন্দ্রাণীর চরিত্রে অঙ্গনা রায়। তাঁদের প্রত্যেকের অভিনয়ে থিয়েটারের অরার ফিল্মি রূপান্তর ঘটে গিয়েছে অনায়াসে। বিশেষত প্রধান চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তীর অভিনয় ভুলবার নয়। অনসূয়া কিংবা সোহিনীও অনবদ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাডার তথা সব্যসাচীর পুত্রের ভূমিকায় পরমব্রত চলনশীল হলেও নাটকে ওই একই চরিত্রে রজতাভর অভিনয় অনেক বেশি এগিয়ে ছিল। সিনেমায় পরমব্রত আরও সাবলীল হতে পারতেন। আরও বেশি করে চরিত্রে ঢুকতে পারতেন।
ইন্দ্রাণীর চরিত্রে অঙ্গনাকে ভালো লেগেছে। থিয়েটারের পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় মঞ্চে হাজির না হলেও চলচ্চিত্রে তিনি হাজির হয়েছেন সব্যসাচীর বন্ধু সনৎ হিসেবে। যিনি একজন চরম সুবিধাবাদী ও সংশোধনবাদী সরকারি বাম নেতা। চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর অভিনয় অনবদ্য। তবে ঋত্বিকের পরেই যদি এ ছবিতে অভিনয়ে সবচেয়ে বেশি দর্শকের কারও নজর কেড়ে থাকেন, তাহলে তিনি নকশাল নেতা রাজেনের চরিত্রে সত্রাজিৎ সরকার। থিয়েটার কর্মী সত্রাজিৎ যেভাবে মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ান, সেভাবেই চলচ্চিত্র মাধ্যমে তিনি হাজির হয়েছেন সত্তর দশকের জেলখাটা নকশালপন্থী বিপ্লবী হিসেবে।
আসলে এই রাজেনরাই তো আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে দাপটের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তৈরি করেছিলেন নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনা। পিকিং রেডিওতে সেই দ্রোহকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ হিসেবে। তো সেই বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজেনের অতীতের সেই দাপট এবং মতাদর্শে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের উপাখ্যান সার্থকভাবে মূর্ত করেছেন সত্রাজিৎ। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, সৃজিতের নির্দেশনাতেই মৃণাল সেনের বায়োপিক ‘পদাতিক’-এ ঋত্বিক ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সত্রাজিৎ। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর নকশালপন্থী বিপ্লবী ‘পদাতিক’-এ মূর্ত হয়েছেন বঙ্গের ভূমিজ কমিউনিজমের বীক্ষণ তৈরি করা চলচ্চিত্রকার তথা উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের দেবতা ঋত্বিককুমার ঘটক হিসেবে।
নির্দেশক সৃজিত এই ছবিতে ফ্ল্যাশব্যাকের পাশাপাশি বহুবার একই শটে বর্তমান ও অতীতকে হাজির করেছেন, বিশেষত রাজলক্ষ্মী চরিত্রটি উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তাঁর এই সিনেম্যাটিক কৌশল প্রয়োগ প্রশংসনীয়। সব্যসাচী সেনের স্বপ্নে তাড়া করা তাঁর অতীতকে হাজির করেছেন সাইকোলজিক্যাল ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে। যা পোস্ট-প্রোডাকশন প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের দ্বারা তিনি করে তুলেছেন সার্থক। যেখানে দেখা যাচ্ছে সব্যসাচী সেনের শোবার ঘরের তিনটি দেয়াল সিনেমার স্ক্রিন হয়ে উঠছে আর তাতে হাজির হচ্ছে তাঁর অতীতের বহু যাপনচিত্র। দ্বিমাত্রিক চলচ্চিত্র মাধ্যমের মধ্যেই এক্ষেত্রে সৃজিত সৃজন করেছেন ত্রিমাত্রিকতার। এবং তিনি চলচ্চিত্রের কালচেতনা মূর্ত হওয়ার চিরাচরিত কৌশল অবলম্বন করেননি, বরং রপ্ত করেছেন চলচ্চিত্রের অধুনান্তিক ভাষা।
মতাদর্শহীনতার বাস্তবতার ভিতর সব্যসাচীর অসহায়তা ফুটিয়ে তুলতে নাগরদোলা ও ক্লাউনের অবতরণ করে পরাবাস্তবিক অনুষঙ্গ প্রকাশ করেছেন সৃজিত। বিশেষত হাতি-ঘোড়া দোলায় বসে থাকা মতাদর্শিক সব্যসাচী ও উত্তর-মতাদর্শিক নয়া প্রজন্মের ইন্দ্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হাজির করা হয়েছে পোয়েটিকভাবে। আর ঘোড়াদোলায় মার্ক্স-লেনিন-স্তালিন-মাও এবং মুজফফর আহমেদ ও জ্যোতি বসুর প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে পোস্ট আইডিওলজিক্যাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আইডিওলজিক্যাল আইকনোগ্রাফির পর্যালোচনা করেছেন সৃজিত।
কিন্তু এ কথা অবশ্যই বলতে হবে যে এ ছবির প্রথমার্ধে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ টেক্সটের যতটা সফল চলচ্চিত্র রূপান্তর ঘটেছে, দ্বিতীয়ার্ধে তা অনেকটাই ক্ষীণ। নাটক বা টেক্সটের আখ্যানের অতিক্রমণের চেষ্টা করা সৃজিত মুখোপাধ্যায় সিনেমায় লেনিন-স্তালিনকে যেভাবে হাজির করেছেন, তাতে ডিরেক্টোরিয়াল দৃষ্টিকোণ (পয়েন্ট অব ভিউ) একপ্রকার মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মুখোমুখি পোস্ট আইডিওলজিক্যাল বোঝাপড়ায় অবস্থান নিয়েছে। আর যেখানে সব্যসাচী সেনকে স্তালিন নিয়ে যাচ্ছেন লেনিনের কাছে, সেখানে রাজনৈতিক মিমের প্রকাশের মতোই আকস্মিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতার কয়েক মুহূর্তের প্রয়োগ হতে দেখা যায়। এটা কি মমতা ও নকশালপন্থীদের একদা মৈত্রীর সম্পর্কের ব্যঙ্গ? নাকি মমতার মধ্যে যারা লেনিনকে খুঁজে পেয়েছে, তাঁদের দিকে ব্যঙ্গ ছুড়ে দিলেন পরিচালক?
স্তালিনের ফোর্থ ওয়াল ভাঙার প্রয়াস আর লেনিন-স্তালিনের মুখোমুখি ললিপপ নিয়ে সব্যসাচীকে হাজির করার ভিতর দিয়ে ছবির গাম্ভীর্যকে পরিচালক নিজেই ভেঙে দিয়েছেন। কিন্তু কেন তা করেছেন বোধগম্য নয়। দ্বিতীয়ত, টেলিভিশন স্টুডিও এবং সব্যসাচী সেনের সাক্ষাৎকার গ্রহণের দৃশ্য অতি দুর্বল। ২০০২ সালের টেলিভিশন স্টুডিও যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, সিনেমায় তা হয়নি। বরং স্টুডিওটি হয়ে গিয়েছে ২০২৬ সালের মতো। আর সাংবাদিকের চরিত্রে বাস্তব জীবনের সাংবাদিক মৌপিয়া নন্দীর উপস্থিতি ছবিটির জন্য স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠেনি। বরং জীবনের অপ্রাপ্তি, নিঃসঙ্গতা আর উদ্বেগকে পর্দায় সামান্য কিছু সময়ের জন্য রাজেনের দিদির চরিত্রে খুব দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ভদ্রা বসু। আর তৃণমূল নেতার চরিত্রে বাস্তবিক তৃণমূল নেতা তথা বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী পার্থ ভৌমিকও সাবলীল। ফ্ল্যাশব্যাকে রাজেনের তরুণবেলার চরিত্রটিতে বাপি দাসের অভিনয়ও নজর কেড়েছে দর্শকদের।
ছবিতে শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে সংগীত প্রয়োগ পরিচালকের বাণিজ্যিক মননের প্রতিফলন। ছবিতে দেখা যায় রাজলক্ষ্মী তাঁর স্বামীকে ক্যাসেট প্লেয়ারে শ্রেয়া ঘোষালের গান শোনাচ্ছেন। অথচ ২০০২ সালে মৌসুমী ভৌমিক, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, কবীর সুমন, নচিকেতা এবং অঞ্জন দত্তরাই বাংলা গানের নয়া অধ্যায়কে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, নতুন দিনের গান হিসেবে রাজলক্ষ্মী তো মৌসুমী ভৌমিককেই শোনাতে পারতেন সব্যসাচী সেনের উদ্দেশে। প্রথমত ২০০২ সালে শ্রেয়া ঘোষাল সকল বাঙালি শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না, দ্বিতীয়ত মার্ক্সবাদী দম্পতি ওই সময়ে কেনই বা শ্রেয়া ঘোষাল শুনবেন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছবির নির্দেশকের পাশাপাশি সংগীত পরিচালক তমালিকা গোলদার ও প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রশ্নের সম্মুখীন যে হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে অন্য আরেকটি গান ‘না থাকা প্রিয়’ সুন্দর। যেটি গেয়েছেন রাপূর্ণা ভট্টাচার্য, সুর তমালিকা গোলদারের আর কথা শ্রীময় ভট্টাচার্য। সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশনে গণনাট্য সংঘের গানের ব্যবহার সুন্দর।
নাটকে কোথাও এটা ছিল না যে সব্যসাচী সেনের দিকে পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ছে ইন্দ্র। বরং সে পিস্তল নিশানাবদ্ধ করেছিল মাত্র। কিন্তু সিনেমায় গুলিটা ছোড়া হয়। তখন সব্যসাচী সেন গাইছেন ‘কারার ওই লৌহকপাট…’। গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু সব্যসাচীর লাশ পড়ে না। তিনি অন্তর্হিত হয়ে যান। এই দৃশ্যে ইন্দ্র চরিত্রে পরমব্রত অনেকটাই আশাহত করেছেন। এবং দৃশ্যের নাটকীয়তা ধরার ক্ষেত্রে সিনেম্যাটোগ্রাফিক কম্পোজিশন তেমন বলিষ্ঠ নয়। কিন্তু শেষ দৃশ্যে কবীর সুমনের কণ্ঠে ‘জানলার কাচে বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে’র ব্যবহার এবং ২০০২ সাল থেকে এক লহমায় ২০২৫ সালে চলে আসাটা চমৎকার হয়েছে। দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় ‘নবান্ন’র সন্নিকটে ফুটপাতে শুয়ে থাকা সব্যসাচী সেন আবারও ঘুম থেকে উঠছেন। ট্যাক্সি ধরে আবারও ফিরে যাচ্ছেন যাদবপুরের বাড়িতে। তিনি ফের ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আবারও তাঁর ঘুম ভাঙল ২০২৫ সালে। তিনি মরে যাননি। তিনি বেঁচে আছেন। অর্থাৎ নির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার সৃজিত মুখোপাধ্যায় মতাদর্শকে বাঁচিয়ে রাখলেন। মতাদর্শের আসলেই তো মৃত্যু নেই কোনো। আর তা সোজাসুজি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচালকের অবশ্যই ধন্যবাদ ও সাধুবাদ প্রাপ্য। চিয়ার্স সৃজিত।
আসলে যতই নব্যউদারতাবাদ বা নিওলিবারালিজম আর কনজিউমার ম্যানেজমেন্ট ও করপোরেট পুঁজি মতাদর্শিক রাজনীতিকে দূরে ঠেলে কেবলমাত্র ক্ষমতার দরকষাকষির বন্দোবস্ত কায়েম করতে নানা তৎপরতা চালাক, তবুও মতাদর্শ বেঁচে থাকে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে নিজের আঙ্গিকে বদল ঘটাতে পারে। স্থান-কাল প্রেক্ষিতে তৈরি হতে পারে নয়া কৌশল ও রণনীতি। কিন্তু মতাদর্শ জীবিতই থাকে। আমরা জানি যে গানটি গেয়ে উঠলেন সব্যসাচী, সেই দ্রোহ নজরুলগীতি গেয়েই চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমেছিল ঢাকা-সহ গোটা বাংলাদেশে। গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটেছিল আওয়ামী রেজিমের। যদিও সেই অভ্যুত্থানের ভিতরেও পাশাপাশিই ছিল মতাদর্শিক ও উত্তর-মতাদর্শিক উভয় পক্ষই। পোস্ট আইডিওলজির কারবারিরা এক জাতবাদী ফ্যাসিস্টকে তাড়িয়ে ফের বাংলাদেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তির হাত শক্তও করতে চেয়েছিল, কিন্তু মতাদর্শে সজাগ ছাত্রজনতার তৎপরতায় সেই অপচেষ্টাও রুখে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে।
আর ছাব্বিশে দিল্লির রাজপথেও ছাত্রজনতা নজরুলের সেই দ্রোহসংগীতের স্পিরিটকে ধারণ করে উত্তর-মতাদর্শিক রাজনীতির ভান করা হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি অপমতাদর্শিক ফ্যাসিস্টদের নাস্তানাবুদ করছে। সাম্য, ন্যায় ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের মতাদর্শ বেঁচেই আছে। মরেনি। নাটক ও সিনেমায় সব্যসাচী সেনের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপটিই যেন আজও কিছু স্বপ্নবাজ মানুষকে তাড়া করে, ‘আমি মনে করি মানুষের জীবনের যদি কোনো পবিত্র কর্তব্য থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে কমিউনিস্ট হওয়া।’
বহু বছর পর ভিন্ন মাধ্যমে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ দেখার পর কথা হচ্ছিল সিপিআইএমের প্রয়াত শ্রমিক নেতা চিত্তব্রত মজুমদারের কন্যা বর্ষণার সঙ্গে। তাঁকে বলছিলাম, সব্যসাচী সেনকে দেখে তাঁর বাবার কথা মনে পড়ছে। আসলে যে সিপিআইএমের একদল নেতা বৃহৎ লগ্নিপুঁজির পক্ষে সওয়াল করেছেন, সেই দলেরই শ্রমিক নেতা চিত্তব্রত দলের অন্দরে থেকে ইনার পার্টি আইডিওলজিক্যাল স্ট্রাগলে আজীবন পক্ষ নিয়েছেন মেহনতি মানুষের। প্রবলভাবে বিরোধিতা করে গিয়েছেন পুঁজির দাসত্বের। কমরেড চিত্তব্রতর মতো কিছু নেতাদের ভিতরেই হয়তো সব্যসাচী ছিলেন। কমরেড সব্যসাচী সেন হয়তো আজও বেঁচে আছেন, অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে। ক্রেতা-ভোক্তা ম্যানেজমেন্ট-কেন্দ্রিক ভুবনায়িত রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মুখোমুখি।
ছবির সিনেমাটোগ্রাফি ও সম্পাদনা যথাযথ। শব্দসংযোজন এবং আবহ সংগীতও সুন্দর। শিল্পনির্দেশনাও মানসম্মত। তবে লিরিক গড়পড়তা। এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সংলাপের বেশিরভাগটাই নাটক সূত্রে তৈরি হওয়া। তবে ফিল্মের প্রয়োজনে আরও কিছু সংলাপ লিখেছেন সৃজিত ও পদ্মনাভ, যেগুলি মূল টেক্সটের সংলাপ বা ব্রাত্য বসু বিরচিত নাটকের সংলাপের আভা বা প্রজ্ঞার তুলনায় হয়তো বা দুর্বল।
উইঙ্কল টুইঙ্কল
কাহিনি (নাটক): ব্রাত্য বসু
নির্দেশনা: সৃজিত মুখোপাধ্যায়
চিত্রনাট্য: সৃজিত মুখোপাধ্যায় ও পদ্মনাভ দাশগুপ্ত
সংলাপ: ব্রাত্য বসু, সৃজিত মুখোপাধ্যায় ও পদ্মনাভ দাশগুপ্ত
প্রযোজক: ফিরদৌসুল হাসান ও মণি শঙ্কর বসু
চিত্রগ্রাহক: ইন্দ্রনাথ মারিক
সম্পাদনা: সৃজিত মুখোপাধ্যায়
সংগীত পরিচালনা ও আবহ সংগীত: তমালিকা গোলদার ও প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়
শব্দ সংযোজনা: অনিন্দিত রায় ও আদীপ সিং মাঙ্কি
শিল্প নির্দেশনা: নাফিসা
লিরিক: শ্রীময় ভট্টাচার্য
অভিনয়: ঋত্বিক চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনসূয়া মজুমদার, সোহিনী সরকার, অঙ্গনা রায়, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, সত্রাজিৎ সরকার, বাপি দাস, রজতাভ দত্ত, উন্মেষ গাঙ্গুলি, সন্দীপ ভট্টাচার্য, প্রেমাংশু, ভদ্রা বসু, পার্থ ভৌমিক, মৌপিয়া নন্দী প্রমুখ।
-- --
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত।
ইমেইল- [email protected]



