পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নামের কোনো দলের অস্তিত্ব রইল না

স্কেচ: এআই
এদিকে এই নতুন নাম ঘোষণার পরেই ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে। এদিকে নতুন দুটি দলের মধ্যে মমতার নেতৃত্বাধীন দলের নাম স্বয়ং তাঁর নাম দিয়ে কেন করা হলো তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ইন্দিরা কংগ্রেসের অনুকরণে নেত্রীর নাম দলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াটা খুব একটা শোভনীয় নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের নির্বাচন কমিশন আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক দল হিসাবে সর্বভারতীয় ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি এবং তাদের ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক বাজেয়াপ্ত করেছে। ফলে আপাতত সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নামের কোনো দলের অস্তিত্ব রইল না পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে। তার বদলে সাময়িক সময়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে তৈরি হলো দুটি দল। ভারতের নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, প্রথম দলটির নাম ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। তাদের জন্য কমিশনের তরফে যাদের ফুটবল খেলোয়াড় প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দলটির নাম ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস। যার নেতৃত্বে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী অরূপ রায়। তাদের দলের জন্য ‘খাম’ প্রতীক বরাদ্দ করেছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের ২০১১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের গোড়া অবধি দীর্ঘ কালপর্বে যে দলটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় দল এবং শাসক পক্ষ ছিল, এমনকী যে দলটি বেশ কয়েকটি কালপর্বে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম শরিক দল ছিল, তাদের আপাতত কোনো সাংবিধানিক অস্তিত্ব রইল না। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের তৃণমূল সরকারের সাবেক মন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক নেতা শুভেন্দু অধিকারী কিছুদিন আগেও হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে তৃণমূল কংগ্রেসকে তিনি টিকে থাকতে দেবেন না। বাস্তবেও সেটাই দেখা গেল।
২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি বিজেপির এজেন্সি হিসাবে কাজ করার অভিযোগ তুলেছিল প্রায় সবকটি বিরোধী দল। সেই অভিযোগে কার্যত সিলমোহর লাগিয়ে শুভেন্দু-সহ বিজেপি নেতাদের নির্দেশ মতো তৃণমূল কংগ্রেস দল ও তাদের প্রতীক সাময়িকভাবে বাজেয়াপ্ত করে কমিশন। পরে মমতা শিবির ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের তরফে কমিশনে জমা দেওয়া বিকল্প নাম ও প্রতীকের মধ্যে থেকে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ (ফুটবল খেলোয়াড় প্রতীক) এবং ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস (‘খাম’ প্রতীক) বরাদ্দ করা হয়েছে।
যদিও এ ব্যাপারে তৈরি হয়েছে আরেক বিতর্ক। নওশাদ সিদ্দিকী নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের প্রতীকও ‘খাম’। ওই প্রতীকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০২১ ও ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন নওশাদ। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনে নিবন্ধিত থাকা একটি দলের প্রতীক কীভাবে কমিশন অন্য আরেকটি দলের জন্য বরাদ্দ করেছে। এ ব্যাপারে কমিশনের বিরুদ্ধে আইএসএফ আদালতের দ্বারস্থ হবে বলে দলীয় সূত্রে খবর।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেস আড়াআড়িভাবে মমতা তৃণমূল কংগ্রেস ও ঋতব্রত তৃণমূল কংগ্রেস এই দুইভাবে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে, দলের নাম ও প্রতীক কাদের দখলে থাকবে এই বিষয়ে রাজনৈতিক দ্বৈরথের মাঝে নির্বাচন কমিশনের এহেন সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে কমিশন চেয়েছে দলের নাম ও প্রতীক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের দিকেই যাক কিন্তু বিষয়টি আদালত অবধি গড়িয়েছে বলেই আপাতত নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করেছে কমিশন। যদিও এই নাম ও প্রতীক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরকে দেওয়ার জন্য কমিশন মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
যদিও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, দলীয় নাম ও প্রতীক ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এর মধ্যে দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। নির্বাচনে ইতিমধ্যেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে সবকটি রাজনৈতিক দল। যার মধ্যে রয়েছে মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস এবং ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসও। দলীয় নাম ও প্রতীক চূড়ান্তভাবে কার দখলে যাবে এই মীমাংসা চূড়ান্তভাবে হওয়ার আগেই বিদ্যমান দুটি তৃণমূল কংগ্রেস দলের তরফেই বিকল্প নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে লড়াই করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, এক সময়ে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সম্পাদক ও বামফ্রন্টের তরফে নির্বাচিত হওয়া ভারতের রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যৌন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। কিছুদিন পরে তিনি যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেসে। উচ্চশিক্ষিত ও বাগ্মী এই যুবনেতাকে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও রাজ্যসভায় পাঠানো হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত সৈনিক হিসাবেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। দলের শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় তাঁকে। ওই সংগঠনের নেতৃত্বের জায়গায় রয়েছেন সাবেক নকশালপন্থী নেত্রী ও বর্তমান তৃণমূল সাংসদ দোলা সেনও। দুই বামপন্থী নেতৃত্বকে সামনে রেখে রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি হয় তৃণমূল কংগ্রেসের। ক্ষমতা হারায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।
অভিযোগ, এসআইআরে কোটি সংখ্যক ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধাসেনা কর্মীকে পশ্চিমবঙ্গের মাঠে নামিয়ে এবং ভোট গণনায় ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমেই তৃণমূলকে সরিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। কিন্তু নির্বাচনে এই ব্যাপক ভরাডুবির মাঝেই হাওড়া জেলায় তৃণমূলের ব্যাপক প্রভাবচালিত উলুবেড়িয়া পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ী আরও বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতানেত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঋতব্রত তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন, সেই কমিটি থেকে ৬ বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ঋতব্রতর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র, অনুব্রত মণ্ডল, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, আখরুজ্জামান, সন্দীপন সাহা প্রমুখ।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত ২০ জন সাংসদ এনসিপিআই নামে একেবারেই একটি অখ্যাত দলে যোগ দেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থেকে যাওয়া বাকি সাংসদ এবং বিধায়করা ঋতব্রত ঘনিষ্ঠ বিধায়কদের এবং এনসিপিআইতে যোগ দেওয়া সাংসদদের পাল্টা তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করে। অন্যদলে যোগ দেওয়া সাংসদদের বিরুদ্ধে ভারতের দলত্যাগ বিরোধী আইনে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে অভিযোগ জানানো হয়। মামলা দায়ের করা হয় সুপ্রিম কোর্টেও। এদিকে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করতে থাকে তারাই আসল তৃণমূল। তাদের বিরুদ্ধেও কমিশনে নালিশ জানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির। যদিও এ ব্যাপারে কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগই উঠেছে। শেষমেশ কমিশন তরফে সংসদীয় রাজনীতিতে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নাম ও তাদের জোড়া ঘাসফুল প্রতীক ফ্রিজ করে নতুন দুটি দলীয় নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করা হলো।
এক্ষেত্রে শুভেন্দুর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। প্রথমত, ভারতের নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়ালের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগে সরব হয়েছিলেন বিজেপি বিরোধীরা। কমিশনের এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাও চলমান। এই পরিস্থিতিতেই মনোজকুমার আগরওয়ালকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। যার পিছনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং রয়েছেন বলে মনে করে বিরোধীরা। দ্বিতীয়ত, শুভেন্দুর সঙ্গে বোঝাপড়া করেই তৃণমূল কংগ্রেসে অন্তর্ঘাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আসলে মূলত মমতার ভাইপো অভিষেকের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণেই ২০২০ সালে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আর তারপর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে নির্মূল করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করেও তাঁর সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তাই রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁদের প্রতি আস্থা রাখা নেতাদের অকার্যকরী করতেই তৃণমূল কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ অকার্যকরী করতেই শুভেন্দুই প্রকারান্তরে তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক মহলের বড় অংশ।
পাশাপাশি আরও ব্যাখ্যা, ত্রিপুরায় যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে আরএসএসের নির্দেশে বিজেপি বিপ্লব দেবকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেভাবেই ভবিষ্যতে যদি পশ্চিমবঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী পদে বিজেপির তরফে অন্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয় সেক্ষেত্রে ঋতব্রত নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থন কাজে লাগবে শুভেন্দুর। বিজেপির মধ্যে থাকা সাবেক তৃণমূলীদের নিয়ে ঋতব্রতর ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিতে যাতে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী থেকে যেতে পারেন সেই পথ খোলা রাখতেই প্ল্যান-বি হিসাবে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ধরিয়েছেন শুভেন্দু। এদিকে এই নতুন নাম ঘোষণার পরেই ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে। এদিকে নতুন দুটি দলের মধ্যে মমতার নেতৃত্বাধীন দলের নাম স্বয়ং তাঁর নাম দিয়ে কেন করা হলো তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ইন্দিরা কংগ্রেসের অনুকরণে নেত্রীর নাম দলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াটা খুব একটা শোভনীয় নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
-- --
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত।
ইমেইল- [email protected]



