নজরুল ও সুইটির বিচারিক হত্যাকাণ্ড এবং সৌদির ‘প্রভুসুলভ’ আচরণ

ছবিঃ নজরুল ও সুইটি
১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে আটক ও বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর দেশের দূতাবাসকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু, সৌদি সরকার বিচারপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস বা পরিবারকে কিছুই জানায়নি।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি—নজরুল ইসলাম ও আক্তারের প্রকৃত অপরাধ কী ছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সৌদি রাজতন্ত্রের শরিয়া আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সপক্ষে দেশটির তদন্তকারী কর্মকর্তারা কী কী প্রমাণ হাজির করেছিলেন, সেটিও আমাদের অজানা। সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশ, ভাষা না জানা এবং নিজেদের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকা—সব মিলিয়ে সুইটি ও নজরুলের প্রকৃত অপরাধ কী ছিল এবং আদালতে তা কতটুকু প্রমাণ করা গিয়েছিল, সে সম্পর্কে দেশের গণমাধ্যম কিছুই জানে না। এমনকি খোদ সৌদি আরবেও যে চুমু খাওয়ার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়, সেই তথ্যটুকুও জানার বা খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি দেশের মিডিয়া। অথচ কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফলাও করে প্রচার করা হলো যে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ দায়ে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর রেশ ধরে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন মন্তব্য করলেন, ‘এই লাশ লজ্জার’, তাঁদের লাশ দেশে আসুক তা তাঁরা চান না। অর্থাৎ, প্রকৃত ঘটনা কেউ জানার আগেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাঁদের চূড়ান্ত চরিত্রহনন যা হওয়ার তা হয়ে গেল।
সাড়ে চার লাখ টাকার ঋণের বোঝা ও পরিবারের শোক
সমাজ ও মিডিয়ায় যখন না জেনেই চরিত্রহনন চলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলায় নজরুলের বাড়িতে তখন চলছে কেবলই মাতম। নিজে ২৪ বছর প্রবাসে থেকেও ভাগ্য ফেরাতে না পারা কৃষক বাবা আবদুল বাছির সচ্ছলতার আশায় ২০২২ সালের নভেম্বরে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে বড় ছেলে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। আট মাসের মাথায় গ্রেফতার হওয়ার আগে মাত্র দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করতে পেরেছিলেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ। এখনো পরিবারের ঘাড়ে ঝুলছে সাড়ে চার লাখ টাকার ঋণের বোঝা। কিন্তু, সেই ঋণ শোধের আগেই গত ১৪ অক্টোবর থেমে গেল নজরুলের জীবন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বৃদ্ধা ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। আর নিঃস্ব বাবা-মায়ের এখন একটাই আকুতি—সব অপবাদ পেরিয়ে শেষবারের মতো সন্তানের মরদেহটা যেন তাঁরা অন্তত একবার দেখতে পান।
মক্কায় কী ঘটেছিল এবং তথ্যে কেন এত লুকোচুরি?
২০২০ সালে মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে কলেজে ভর্তি হলেও দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে বিদেশের পথ ধরতে হয় নজরুলকে। ‘মুসা ইন্টারন্যাশনাল’ নামের এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়ে মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ পান তিনি।
মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৮০০ রিয়াল। স্বজনদের দাবি, সেখানে এক পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। ওই পাকিস্তানির করা একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুলকে এবং পরদিন সুইটিকে আটক করে সৌদি পুলিশ। প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর গত ১১ অক্টোবর মা-বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো মাত্র দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ পান নজরুল। এর তিন দিন পরই পরিবারকে না জানিয়ে কার্যকর করা হয় মৃত্যুদণ্ড।
সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া বন্দিতালিকা নিয়ে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ দূতাবাসকে দেওয়া তালিকায় নজরুলের অপরাধ হিসেবে ‘সাইবার ক্রাইম’ এবং সুইটির ক্ষেত্রে ‘ব্যভিচারের’ কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তাঁদের যে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম সাজা দেওয়া হয়েছে, তা ওই তালিকায় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। অথচ সাইবার অপরাধ বা ব্যভিচারের দায়ে এর আগে কোনো বাংলাদেশিকে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই।
১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে আটক ও বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর দেশের দূতাবাসকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু, সৌদি সরকার বিচারপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস বা পরিবারকে কিছুই জানায়নি। মূলত দুর্বল কূটনীতির দেশগুলোর সাথে সৌদি আরব বরাবরই এমন ‘প্রভুর মতো’ আচরণ করে।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বা ইউরোপ তো দূরের কথা—ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সৌদি আরব এভাবে গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সাহস দেখাত না। তারা জানে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর কূটনৈতিক চাপ আসবে না। বাস্তবে হয়েছেও তাই; দুজন নাগরিকের জীবন চলে যাওয়ার পর ঢাকা কেবল রায়ের কপি চেয়েই দায় সেরেছে।
রেমিট্যান্সের যন্ত্র নাকি রাষ্ট্রের নাগরিক?
নজরুল দীর্ঘ তিন বছর সৌদি কারাগারে বন্দী ছিলেন। মাসে মাত্র এক-দুই মিনিটের নিয়ন্ত্রিত ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাস তাঁকে কোনো কার্যকর আইনি সহায়তা দিতে পারেনি। প্রতিবছর সৌদি আরবের কারাগার থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক শূন্য হাতে দেশে ফেরেন, যাঁদের বড় অংশই নিরপরাধ।
রাষ্ট্র প্রবাসীদের কেবল ‘রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র’ হিসেবে দেখে, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে নয়। নিজের দেশ, গণমাধ্যম ও রাজনীতিকরা যখন প্রবাসীদের জীবনের মূল্য না দিয়ে উল্টো চরিত্রহননে মেতে ওঠেন, তখন সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও তাঁদের সাথে প্রভুর মতো আচরণ করার সুযোগ পায়।
বাবা আবদুল বাছির আর মা রহিমা বেগমের চোখের জল আজ একটিই প্রশ্ন তুলছে—দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিকের জীবন ও সম্মানের কি কোনো মূল্যই নেই বাংলাদেশের কাছে?


