ফ্রান্স জ্বলছে, এবার কি যুক্তরাষ্ট্রের পালা?

ছবিঃ রোওর মিডিয়া আর্কাইভ
বড় অর্থনীতি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ার আগে যে সময় পাচ্ছে, সেটা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি নিয়মতান্ত্রিক পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় ঋণ বা ঘাটতি বাজেট কমানো কঠিন। আর সরকারি ব্যয় বা কর বাড়ালে আগে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা জনগণ ফ্রান্সের মতো ক্ষোভে ফেটে পড়বে।
বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ফ্রান্স। যদিও তা সামাল দিতে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও কারফিউ দেওয়ারও সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। কিন্তু তাতে কি শান্ত হবে ফ্রান্স? কেননা ফ্রান্সের এ বিক্ষোভের শিকড় অনেক গভীরে। রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশটির রয়েছে বাড়তে থাকা ঋণের বোঝাও। অর্থাৎ নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করায় আর্থিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে ফ্রান্স সরকার। ঠিক এমনই সংকটের আভাস মিলছে যুক্তরাষ্ট্রেও। তাহলে কি ওয়াশিংটনও প্যারিসের পথ ধরে হাঁটবে?
ফ্রান্সের আর্থিক সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় আর ক্রমবর্ধমান ঋণ। এখন সেই ঋণ পরিশোধের খরচও বাড়ছে দ্রুত। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ১১৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে দেশটি যত পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার মোট মূল্যের চেয়েও বেশি সরকারি ঋণ রয়েছে।
অন্যদিকে প্যারিসের বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ফারাক বিপুল। তবে এই সংকট মোকাবিলায় রয়েছে প্রচলিত দুটি পথ। এক. সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং দুই. কর বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি। কিন্তু এমন গণক্ষোভের মুখে পথ দুটির মনে মনে সমর্থনকারীরাও মুখে আনার সাহস রাখে না। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ জনসাধারণ। তার ওপর সরকারি সুবিধা কমানো কিংবা করের বোঝা বাড়লে এই গণঅসন্তোষ আর থামানো যাবে না। অর্থাৎ চলমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমস্যা সমাধানের জন্য যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া দরকার, রাজনৈতিকভাবে সেগুলো আর প্রচলিত পুঁজিতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে বলাই অসম্ভব।
প্যারিসের পরিস্থিতিতে একা ফ্রান্স নেই। যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশই এখন সরকারি ঋণ, সুদ পরিশোধের ব্যয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার চাপে রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্রান্সের এই সংকটের সঙ্গে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। ওয়াশিংটনের সরকারি ঋণ প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩২ লাখ কোটি ডলার, যা বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। আর বাজেট ঘাটতি ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলারের বেশি। এ ছাড়া সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই বছরে ব্যয় হচ্ছে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ চলে যাচ্ছে শুধু এই খাতে। অর্থাৎ পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অন্য সরকারি খাতে ব্যয় করার সুযোগও প্রতিদিন সীমিত হয়ে আসছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা এত বেশি হওয়ার পরও দেশটি কেন এখনই ফ্রান্সের মতো সংকটের মুখে পড়ছে না? এটি হচ্ছে না তিনটি কারণে। প্রথমত, মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। আর মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকেও বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশাল ও বহুমুখী। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে সরকারি ঋণের বোঝা সামলানোর সময় পাওয়া যায় বা একটা ব্যবধান তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকলে ঋণের তুলনায় অর্থনীতির আকার বাড়ার একটা আশা জিইয়ে রাখার একটা জামিন পাওয়া যায়, যা ঋণ সামলানোর সুযোগ ও সময়কে দীর্ঘায়িত করে।
তবে এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। কারণ ডলারের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব কিংবা এআই খাতে বিনিয়োগ—এগুলোর কোনোটাই অনির্দিষ্টকাল ধরে ঋণের চাপ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। অর্থাৎ ঝুঁকিমুক্ত নয় যুক্তরাষ্ট্র। বরং দেশটির জন্য রয়েছে আরেকটি সংকট। তা হলো রাজনৈতিক অচলাবস্থা। কারণ আগামী বছর আবারও সরকারি ঋণের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তখন ঋণসীমা বাড়াতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক দফা বেড়েছে। মানুষের অসন্তোষ বৃদ্ধি এরই মধ্যে খোদ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করছে। কংগ্রেসে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়লে কঠিন হয়ে উঠতে পারে প্রয়োজনীয় সমঝোতা। আর ঋণসীমা না বাড়ানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বড় অর্থনীতি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ার আগে যে সময় পাচ্ছে, সেটা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি নিয়মতান্ত্রিক পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় ঋণ বা ঘাটতি বাজেট কমানো কঠিন। আর সরকারি ব্যয় বা কর বাড়ালে আগে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা জনগণ ফ্রান্সের মতো ক্ষোভে ফেটে পড়বে।
অর্থাৎ সরকারি ঋণ, সুদ পরিশোধের ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি—ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান ও অর্থনীতির আকারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সংকট মোকাবিলার কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা মানেই স্থায়ী নিরাপত্তা নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি ঋণের বোঝার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে আর জনমতের চাপে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানো বা কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আটকে যায়, তাহলে একটু দেরিতে হলেও ইউরোপের এই স্প্রিং বিক্ষোভে আমেরিকা পর্যন্ত জ্বলে উঠতে পারে।


