সাংস্কৃতিক আধিপত্য বনাম জনপরিসর: রাবিতে ‘সর্বজনের সংস্কৃতি’


ছবিঃ সর্বজনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
মঞ্চ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, কল্পনা ও গান পুরোপুরি বন্দী করা যায় না। ক্ষমতা যখন নির্ধারণ করতে চায় মানুষ কী গাইবে, তখন একটি সাধারণ শিল্পচর্চাও স্বাধীনতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে। ঠিক এই জায়গা থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সর্বজনের সংস্কৃতি’ আয়োজনের দিকে নজর দেওয়া দরকার।
দেশে এখন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর প্রবল চাপ দেখা যাচ্ছে। মাজার, ওরস, বাউল কিংবা লোকসংস্কৃতির নানা আয়োজন আজ প্রশ্নের মুখে। সংকুচিত হচ্ছে জনপরিসরের বহুত্ববাদী চর্চা। ঠিক এই সময়ে ভিন্ন চিত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে তরুণ শিক্ষার্থীরা গড়ে তুলেছেন নতুন এক সাংস্কৃতিক মঞ্চ। সেখানে সংস্কৃতিকে একমুখী করা হচ্ছে না। বরং উদযাপন করা হচ্ছে তার বহুত্বকে।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা মাজার ও কনসার্টে বাধা আসার খবর মিলেছে। এসব বাধায় সব সময় একই গোষ্ঠী যুক্ত থাকছে, এমন নয়। তবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মুছে ফেলার এই প্রবণতাকে আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা 'কালচারাল হেজিমনি' শুধু ধর্মীয় কট্টরপন্থার মধ্যে আটকে থাকে না। পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে এই ধারণাটি নিয়ে আলোচনা করেছেন ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি। তাঁর মতে, ক্ষমতাবান গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ইতিহাস ও মূল্যবোধকে সমাজের ওপর স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এটাই সাংস্কৃতিক আধিপত্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনে এমনটিই ঘটেছিল। তখন মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রীয় বয়ানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর একটি বড় উদাহরণ ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী। সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ৪ক) সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
এখানে মূল বিতর্ক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে নয়। মূল বিষয় হলো ক্ষমতার প্রয়োগ। ক্ষমতা যখন একটি সুনির্দিষ্ট বয়ানকে এককভাবে প্রতিষ্ঠা করে, তখন অন্য ইতিহাসগুলো আড়ালে পড়ে যায়। একইভাবে কোনো গোষ্ঠী যখন ঠিক করে দেয় কোন গান বা উৎসব চলবে, তখনও সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়।
জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবেরমাস তাঁর তত্ত্বে ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসরের ধারণা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সমাজের জনপরিসর যখন ক্ষমতাবানদের হস্তক্ষেপে সংকুচিত হয়, তখন সেখানে মানুষের স্বাধীন আলাপ বা বহুস্বর বাধাগ্রস্ত হয়। সংস্কৃতি তখন হয়ে যায় নিয়ন্ত্রিত। তখন প্রশ্ন জাগে, সংস্কৃতির পরিসর কে ঠিক করবে?
এই প্রশ্ন একদম নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এর শক্তিশালী একটি উত্তর রয়েছে।
সময়টা ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানে তখন সামরিক শাসক জিয়াউল হকের আমল। লাহোরের আলহামরা আর্টস কাউন্সিলের এক মঞ্চে উঠলেন প্রখ্যাত শিল্পী ইকবাল বানো। তিনি গাইলেন কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের বিখ্যাত কবিতা 'হাম দেখেঙ্গে' বা ‘আমরা দেখব’। ফয়েজের লেখা তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। বানোর গান সেদিন আর শুধু সংগীতে আটকে থাকেনি। গানটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ। বিপুল দর্শক সেদিন তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।
মঞ্চ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, কল্পনা ও গান পুরোপুরি বন্দী করা যায় না। ক্ষমতা যখন নির্ধারণ করতে চায় মানুষ কী গাইবে, তখন একটি সাধারণ শিল্পচর্চাও স্বাধীনতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
ঠিক এই জায়গা থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সর্বজনের সংস্কৃতি’ আয়োজনের দিকে নজর দেওয়া দরকার। ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তরুণ কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাত ধরে এই সংগঠনের জন্ম। ঠিক দুই বছর পর ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাদের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এই দিনব্যাপী উৎসব চলে।
আয়োজনটিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছিল না। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান টাকা দেয়নি। সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে শিক্ষার্থীরা এটি নামিয়েছেন। চারুকলা, অর্থনীতি, নাট্যকলা, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং—নানা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এখানে যুক্ত ছিলেন।
তারা কাওয়ালি, লালনগীতি, বাউল, আদিবাসী ও আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। ছিল রবীন্দ্রসংগীত এবং নজরুলগীতি। পাশাপাশি আধুনিক গান ও কবিতাও বাদ যায়নি।
সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বহুত্ববাদ নিয়ে পশ্চিমা শিক্ষায়তনে কাজ করেছেন ব্রিটিশ তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হল। তাঁর গবেষণার সারমর্ম হলো—শুধু অনেক ভিন্নতাকে জড়ো করাই বহুত্ববাদ নয়; নিজের পরিচয়কে টিকিয়ে রেখে অন্যের পরিচয়ের প্রতি সম্মান জানানোটাই হলো বহুত্ব। এখানে আদিবাসী গান কেবল একটি পারফরম্যান্স ছিল না। এর ভেতর জড়িয়ে ছিল একটি গোষ্ঠীর ভূমি, শ্রম আর পরিচয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। লালন ও বাউল গানের সঙ্গে আছে বাংলার শেকড় আর সাধন সংস্কৃতির টান। অন্যদিকে আঞ্চলিক গান বলে যায় সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের কথা।
বাংলাদেশ অনেক ধর্ম, জাতি ও ভাষার মানুষের বাসভূমি। এখানে সংস্কৃতির স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের দখল থেকে মুক্তির বিষয় নয়। এটি সমাজের ভেতরের আধিপত্য ও একমুখী চিন্তার বিরুদ্ধে টিকে থাকারও লড়াই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সর্বজনের সংস্কৃতি’ ঠিক এই সহাবস্থানের উদাহরণ। এখানে কাওয়ালির পাশেই লালনের ঠাঁই হয়। লালনের পাশে বাউল আর বাউলের পাশে বাজে আদিবাসী সুর। এখানেই রবীন্দ্রনাথ আর নতুন প্রজন্মের শিল্প কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে হয়ে যাওয়া এই উৎসব শুধু একটি বর্ষপূর্তি নয়। এটি একটি চর্চা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হোক বা সামাজিক কট্টরতা—কেউ যেন সংস্কৃতির সীমা একা টেনে দিতে না পারে, তারই প্রমাণ এই মঞ্চ। কারণ সংস্কৃতি কারও একার সম্পত্তি নয়; এটি সর্বজনের।



