সন্ধিপূজা– চামুণ্ডা রূপের আবাহন ও কালের পরম ক্ষণ

ডিপি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
সন্ধিপূজা– চামুণ্ডা রূপের আবাহন ও কালের পরম ক্ষণ
শেয়ার করুন:

সন্ধিপূজার মূল দর্শন হলো কাল বা সময়ের রূপান্তর। এটি এমন এক মুহূর্ত যখন অতীত ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। এই সময়টিতে যে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়, তা আমাদের মনের ভেতরের ১০৮টি অন্ধকার কুঠুরিকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার প্রতীক।

দুর্গাপূজার প্রতিটি আচার ও প্রতীকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবন, সময়, শক্তি ও ন্যায়ের নানা দার্শনিক ব্যাখ্যা। মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত সন্ধিপূজা সেই প্রতীকী ব্যঞ্জনার এক বিশেষ প্রকাশ। এখানে একদিকে যেমন দেবী দুর্গার উগ্র ও অসুরবিনাশী শক্তির আরাধনা করা হয়, অন্যদিকে তেমনি অশুভের বিনাশ, আত্মত্যাগ এবং অন্তরের অন্ধকার অতিক্রম করে আলোর দিকে যাত্রার তাৎপর্যও খুঁআজে পাওয়া যায়। সন্ধিপূজার ধর্মীয় আচারকে তাই কেবল পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, মানুষের আত্মোপলব্ধি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও পাঠ করা যায়।

অষ্টমী তিথির শেষ চব্বিশ মিনিট এবং নবমী তিথির শুরুর চব্বিশ মিনিট—এই মোট আটচল্লিশ মিনিটের পরম মুহূর্তটিই হলো সন্ধিপূজা। এই সন্ধিক্ষণকে দুর্গাপূজার আধ্যাত্মিক হৃৎপিণ্ড বলা যায়। ঢাকের আওয়াজ যখন চরমে ওঠে, ধূপ-ধুনোর মায়াবী ধোঁয়ায় মণ্ডপ আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং ১০৮টি মাটির প্রদীপের আলোয় দেবীর মুখ জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই বিশেষ ক্ষণটিতে দেবী দুর্গা ‘চামুণ্ডা’ রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধ করেছিলেন। 

সন্ধিপূজার মূল দর্শন হলো কাল বা সময়ের রূপান্তর। এটি এমন এক মুহূর্ত যখন অতীত ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। এই সময়টিতে যে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়, তা আমাদের মনের ভেতরের ১০৮টি অন্ধকার কুঠুরিকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার প্রতীক। দেবী চামুণ্ডা এখানে কোনো শান্ত বা মমতাময়ী রূপ নন, তিনি হলেন রুদ্রাণী। তিনি আমাদের শেখান যে, পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কখনও কখনও ক্রোধ ও ধ্বংসের শক্তিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই ক্রোধ যেন ব্যক্তিগত অহংকারের না হয়ে, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য হয়। 

এই সন্ধিক্ষণের সাথে জড়িয়ে আছে শ্রীরামচন্দ্রের সেই ঐতিহাসিক চোখের কোরবানি দেওয়ার গল্প। ১০৮টি নীলপদ্মের অভাব মেটাতে তিনি নিজের চোখ উপড়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই গল্পটি আমাদের শেখায় যে, যখন আমরা ঈশ্বরের সাথে মিলিত হতে চাই, তখন আমাদের নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, এমনকি আমাদের নিজেদের আত্মপরিচয়কেও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সন্ধিপূজা তাই শুধু একটি আচার নয়, এটি হলো নিজের ইগো বা অহংকারকে সমূলে বিনাশ করে ঈশ্বরের পরম আলোয় নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ।

সন্ধিপূজার তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত প্রদীপ জ্বালানো, মন্ত্র উচ্চারণ কিংবা পৌরাণিক কাহিনি স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর গভীর আবেদন নিহিত রয়েছে নিজের ভেতরের অন্ধকার, অন্যায়ের প্রতি আপস এবং অহংকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে। দেবী চামুণ্ডার অসুরবিনাশী রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অশুভের বিনাশ কখনও কখনও কঠোর সিদ্ধান্ত দাবি করে; আর আত্মত্যাগের কাহিনি শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে এগোতে হলে নিজের প্রিয় বিশ্বাস, স্বার্থ কিংবা অহংকারকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে হয়। অষ্টমী থেকে নবমীতে উত্তরণের এই প্রতীকী মুহূর্ত তাই কেবল তিথির পরিবর্তন নয়, নিজের ভেতরেও এক রূপান্তরের আহ্বান। ১০৮টি প্রদীপের আলো তখন শুধু মণ্ডপকে আলোকিত করে না—তা হয়ে উঠতে পারে এমন এক প্রত্যয়ের প্রতীক, যেখানে শক্তি প্রতিশোধের নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার; আর আত্মসমর্পণ পরাজয়ের নয়, আত্মোপলব্ধির।




শেয়ার করুন: