রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে বাংলা: রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

দিলীপ রায়
দিলীপ রায়
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে বাংলা: রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেই আমরা দুই বাংলার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক আত্মীয়তাকে স্বীকার করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ—এই উত্তরাধিকার আমাদের কাছে কোনো বিদেশি ব্যাপার নয়; এটি আমাদের ভাষা ও অঞ্চলের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাসকে সংকীর্ণদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বিপন্ন করা নয়, সমালোচনা, সংলাপ ও মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের উচিত কাজ হবে।

শিল্পকলার দেয়ালে সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে বলে তাঁর নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—তিনি ভারতীয় নাগরিক, বাংলাদেশের শিল্পকলার দেয়ালে তাঁর ছবি কেন? একই সময়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপে দেওয়ার মতো ঘটনাও আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে।

এই দুই ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে আলাদা, এমনকি আলাদা বর্গের মানুষের কাজ বলে মনে হলেও এই দুই প্রতিক্রিয়ার গভীরে রয়েছে একই ধরনের সংকীর্ণতা—জাতীয় পরিচয়কে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে খণ্ডিত করে দেখার প্রবণতা।

সত্যজিৎ রায় ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। কিন্তু তাঁর শিল্প কি কেবল ভারতের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ? রবীন্দ্রনাথ কি শুধু পশ্চিমবঙ্গের, নজরুল কি শুধু বাংলাদেশের?

ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাস কি রাষ্ট্রের সীমান্তরেখা মেনে তৈরি হয়? একজন শিল্পীর নাগরিকত্বের ভিত্তিতে তাঁর শিল্পের ওপর অধিকার নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বড় একটি অংশকেই অস্বীকার করতে হবে।

দুই বাংলার মানুষের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে তা রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এই ভাষার মধ্য দিয়ে দুই বাংলার মানুষের সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, নাটক ও জীবনবোধ পরস্পরকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের মানুষ যেমন সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র থেকে নিজেদের সমাজ ও মানুষকে চিনতে পারে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বাংলাদেশের সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের মধ্যে নিজেদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়।

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে এর অর্থ এই নয় যে দুই বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা এক। বরং রাজনৈতিক পার্থক্য ও ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সীমান্তের মধ্যে বসবাস করেও মানুষের পারস্পরিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেন্দ্রিক আত্মীয়তা রয়েছে এখানে।


বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস এই সত্যের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির লড়াই শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সংগীতশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা সভা করেছেন, বিবৃতি দিয়েছেন, গান গেয়েছেন, কবিতা লিখেছেন, বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছেন।

শরণার্থী মানুষের দুর্দশা এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান আন্তর্জাতিক সংহতি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষের উপর নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলে পশ্চিম বাংলার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এসবের প্রেক্ষিতে ২৮ মার্চ কলকাতার লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা এক বিবৃতির মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সামরিক আক্রমণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি এই অন্যায় প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছিল। এদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়ও ছিলেন।

এই ইতিহাসেও আমরা রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্রও খুঁজে পাই। তিনি ১৯৭১ সালে জীবিত ছিলেন না; কিন্তু তাঁর গান, কবিতা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সহায়তা করার বহুমুখী তৎপরতার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমিতি’। সেই বুদ্ধিজীবী সমিতি ঘোষণা করেছিল, ‘পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী আমরা, রবীন্দ্রনাথের উত্তর পুরুষ আমরা ঐতিহাসিক মুহূর্তে নীরব থাকতে পারি না।’

এছাড়াও স্পেনের গৃহযুদ্ধে (১৯৩৬–১৯৩৯) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান , স্পেনের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রতি সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ভূমিকাকেও উল্লেখ করেন সমিতির সদস্যরা।

দিলীপ চক্রবর্তীর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ডায়েরি: একাত্তরের রাতদিন গ্রন্থে সংকলিত বিবরণে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন উদ্যোগের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। ২৩ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সমর্থনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হলে একটি সভা হয়েছিল। তার পরদিন ২৯ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গান্ধী শান্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও সভা হয়। ৩০ মার্চ কলকাতার বিশ্বশান্তি পরিষদ, আফ্রো-এশীয় সংহতি সমিতি, সাহিত্য পত্রিকা পরিচয় এবং বামপন্থী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, মৈত্রেয়ী দেবী, পান্নালাল দাশগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন।

তাঁদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল, রাজনৈতিক অবস্থানেরও ভিন্নতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং পাকিস্তানি সামরিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশের প্রশ্নে অনেকে এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন।

তাঁদের এই অবস্থানকে শুধুমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, মানবিক মর্যাদা ও জনগণের মুক্তির অধিকারের প্রতি ঐক্য ও সংহতির প্রকাশ।

এই ইতিহাস আমাদের একটি জরুরি শিক্ষা দেয় যে, সংস্কৃতির শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থানে নয়, বরং মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির ক্ষমতায়। সত্যজিৎ রায়ের চিত্র বাংলাদেশের শিল্পকলার দেয়ালে স্থান দেওয়া তাই কোনো বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং বাংলা ভাষা ও উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানকে স্বীকার করা। তাঁর কাজ বাংলাদেশের মানুষের কাছেও অর্থবহ—এই স্বীকৃতিই এখানে মুখ্য।

অথচ এই স্বীকৃতির বিরুদ্ধে নাগরিকত্বের প্রশ্ন তুলে যে আপত্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতিকে জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গোঁড়ামি ও ঈর্ষার খোপে বন্দি করার চেষ্টা।

এই যুক্তি মেনে নিলে আমাদের ভাবতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ কি রবীন্দ্রনাথের গান গাইবে না, কারণ তিনি ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক ছিলেন? আমরা কি সত্যজিৎ রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অন্যান্যদের শিল্প ও সাহিত্যকর্ম থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলব? আবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কি বাংলাদেশের কবি, কথাসাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্রকারদের নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিসরে গ্রহণ করতে পারবে না? এমন চিন্তা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায় না; বরং তাকে বিপন্ন করে।

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপে দেওয়ার ঘটনাটিও একই সংকীর্ণতার বিপজ্জনক প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তার সমালোচনা অবশ্যই করা যায়। কোনো লেখক বা শিল্পীই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু যুক্তি ও সমালোচনার পরিবর্তে তাঁর ছবিতে কালি লেপে দেওয়া কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নয়। এটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার এক ধরনের প্রতীকী আগ্রাসন।

রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতে গিয়ে আমরা যদি তাঁর গান, সাহিত্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতিকেও অস্বীকার করি, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—এই অস্বীকৃতির ভিত্তি কী? তাঁর কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা বা বক্তব্যের সমালোচনা, নাকি কেবল অহেতুক রবীন্দ্রবিদ্বেষ?

রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করার অর্থ তাঁর সব চিন্তার সঙ্গে একমত হওয়া নয়। বরং তাঁকে সমালোচনা করার জন্যও তাঁকে পড়তে হবে, তাঁর সময় ও সমাজকে বুঝতে হবে, তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার দ্বন্দ্বগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। তার ছবিতে কালি লেপে দিয়ে সেই কাজ করা যায় না। তাতে রবীন্দ্রনাথের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিসর, যুক্তিবোধ ও সমালোচনার চর্চা।

আমাদের মনে রাখা দরকার, ১৯৭১ সালে কলকাতার যেসব শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম কেবল একটি বিদেশি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। তাঁরা এর মধ্যে দেখেছিলেন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ভাষার অধিকার, সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের লড়াই। সেই সংহতির ইতিহাসকে সম্মান জানাতে হলে আজও আমাদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও সাংস্কৃতিক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেই আমরা দুই বাংলার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক আত্মীয়তাকে স্বীকার করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ—এই উত্তরাধিকার আমাদের কাছে কোনো বিদেশি ব্যাপার নয়; এটি আমাদের ভাষা ও অঞ্চলের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাসকে সংকীর্ণদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বিপন্ন করা নয়, সমালোচনা, সংলাপ ও মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের উচিত কাজ হবে।

শেয়ার করুন: