গুগল ও মেটা যেভাবে শিশুদের আসক্ত করছে 

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩:৫০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
গুগল ও মেটা যেভাবে শিশুদের আসক্ত করছে 
শেয়ার করুন:

কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে অভিভাবক ও অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি বোর্ড সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট গুগল ও মেটাকে কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল আসক্তির জন্য দায়ী করে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। 


বুধবার  (২৫ মার্চ) ঘোষিত এই রায়ে বলা হয়, অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন গুগল এবং মেটার সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা শিশুদের মধ্যে নেশার মতো আসক্তি তৈরি করে। 


আল জাজিরার বরাত দিয়ে বিশ্লেষকরা একে প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য 'বিগ টোব্যাকো মোমেন্ট' হিসেবে দেখছেন। যেমনটা এক সময় তামাক কোম্পানিগুলোকে স্বীকার করতে হয়েছিল যে তাদের পণ্য ক্ষতিকর, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। 


এই রায় কেবল একটি আইনি বিজয় নয়, বরং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নৈতিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। 


কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে অভিভাবক ও অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাসে ব্যাধি, আত্মক্ষতি এবং এমনকি আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো ভয়াবহ সব পরিণতির জন্য সরাসরি এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ডিজাইনকে দায়ী করা হয়। আদালতের বাইরে শিশুদের ছবি সংবলিত ব্যানার নিয়ে অপেক্ষারত বাবা-মায়েদের জন্য এটি ছিল এক দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রথম বড় সাফল্য।


এই মামলার কেন্দ্রে ছিলেন ২০ বছর বয়সী এক তরুণী, যাকে আইনি নথিতে 'কেইলি' নামে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি সাক্ষ্যে বর্ণনা করেছেন কীভাবে মাত্র ৬ বছর বয়সে ইউটিউব এবং ৯ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের মাধ্যমে তার শৈশব বদলে যায়। প্রাথমিক স্কুল শেষ হওয়ার আগেই তিনি কয়েকশ ভিডিও পোস্ট করেছিলেন এবং পরিবারের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন। 


১০ বছর বয়সে তিনি গুরুতর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন এবং বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে 'বডি ডিসমরফিয়া' বা নিজের শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। কৃত্রিম ফিল্টারের ব্যবহার তার আত্মবিশ্বাসকে এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে, তিনি নিজের স্বাভাবিক চেহারার প্রতি ঘৃণা বোধ করতে শুরু করেন। 


কেইলির আইনজীবীরা আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, কোম্পানিগুলোর নোটিফিকেশন সিস্টেম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা কিশোর মনে উত্তেজনার পারদ বাড়ায় এবং তাদের বারবার ডিজিটাল পর্দার দিকে ফিরে আসতে বাধ্য করে। 


এটি কিশোর মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে।


বিচারের সময় গুগল ও মেটার আইনজীবীরা দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন যে, কেইলির মানসিক সমস্যার মূলে ছিল তার পারিবারিক কলহ এবং আগে থেকে থাকা ব্যক্তিগত সংকট। তারা আদালতকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, কেইলি কেবল তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণার উপশম হিসেবে এসব অ্যাপ ব্যবহার করেছিলেন। মেটার পক্ষ থেকে কেইলির মায়ের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডার ভিডিও উপস্থাপন করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। 


তবে দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টার আলোচনা শেষে জুরি বোর্ড কোম্পানিগুলোর এই যুক্তি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ব্যবহারকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুগল ও মেটা চূড়ান্ত অবহেলা দেখিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এসব প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কোনো কার্যকর সতর্কবার্তা না দিয়ে তারা কেবল মুনাফা ও ব্যবসা প্রসারে লিপ্ত ছিল। 


কোম্পানিগুলোর এই চতুরতা জুরি বোর্ডের কাছে অনৈতিক বলে মনে হয়েছে।


আদালত এই অবহেলার দায়ে কেইলিকে ৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণের শাস্তি হিসেবে আরও ৩ মিলিয়ন ডলার শাস্তিমূলক জরিমানা করা হয়। এই মোট ৬ মিলিয়ন ডলারের বড় অংশ অর্থাৎ ৭০ শতাংশ বহন করবে মেটা এবং বাকি ৩০ শতাংশ পরিশোধ করবে গুগল। 


সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর 'সেকশন ২৩০' ধারার অধীনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দায়মুক্তি পেয়ে থাকে, কিন্তু এই মামলায় তাদের সিস্টেম ডিজাইনের ত্রুটিকে সামনে এনে সেই প্রাচীর ভাঙা সম্ভব হয়েছে।

এই রায়ের ফলে বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করার পথ সুগম হলো বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। 


আয়ারল্যান্ড কাউন্সিল ফর সিভিল লিবার্টিজের মতে, এটি প্রযুক্তি জায়ান্টদের জন্য একটি সতর্কঘণ্টা। তারা যদি তাদের অ্যালগরিদম এবং আসক্তিকর ফিচারের পরিবর্তন না করে, তবে আগামী দিনে তাদের আরও বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। 


যদিও গুগল ও মেটা রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছে যে তারা শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করছে এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে জনমত ও আইনি কাঠামোর এই পরিবর্তন তাদের জন্য এক বড় ধরনের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। 


মুনাফার পাহাড় গড়ার চেয়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি দানবরা শেষ পর্যন্ত কোনো গুণগত পরিবর্তন আনে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শেয়ার করুন: