ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইস্তফার দাবিতে উত্তাল নয়াদিল্লি

ছবিঃ সংবাদ সম্মেলনে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম ঘোষণা করছে ককরোচ জনতা পার্টি
বৃহস্পতিবার প্রথমে ককরোচ জনতা পার্টির সর্বভারতীয় নেতৃবর্গ ও পরে কংগ্রেসের তরফে রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ককরোচ জনতা পার্টির তরফে জানানো হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দিলে তাঁকে বরখাস্ত করার দাবিতে লক্ষাধিক ছাত্র-জনতা নয়াদিল্লির রাজপথ দখলে নেবে।
সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে'র একটি অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত ভারতীয় রাজনীতি। ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নির্বিচারে ভারতের বৈধ নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দিয়ে বিজেপির পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। দেখানো হয়েছে কীভাবে ভারতের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী অবকাঠামোকে কার্যত বিপর্যস্ত করা হয়েছে খোদ ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনের দ্বারা। কীভাবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই কমিশনারের আপত্তি ও মতামতকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার।
সাংবাদিক ঋত্বিকা চোপড়ার ওই প্রতিবেদন বুধবার প্রকাশিত হওয়ার পরেই উত্তাল নয়াদিল্লির রাজনীতি। জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার দাবি তুলেছে কংগ্রেস, সিপিআই(এম), সিপিআই, সিপিআই(এম-এল) (লিবারেশন), আরজেডি, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা (উদ্ধব) ইত্যাদি ইন্ডিয়া জোটের অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দল। আরও এক ধাপ এগিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ওই সংবাদ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন করে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেন সমাজবাদী পার্টি সমর্থিত রাজ্যসভার নির্দল সাংসদ কপিল সিব্বল।
নয়াদিল্লিতে বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন করে জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারির দাবি জানান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অন্যদিকে কলকাতার নিজ বাসভবনে সাংবাদিক বৈঠকে একই দাবি জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাম দলগুলিও প্রেস বিবৃতিতে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করে।
বৃহস্পতিবার প্রথমে ককরোচ জনতা পার্টির সর্বভারতীয় নেতৃবর্গ ও পরে কংগ্রেসের তরফে রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ককরোচ জনতা পার্টির তরফে জানানো হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দিলে তাঁকে বরখাস্ত করার দাবিতে লক্ষাধিক ছাত্র-জনতা নয়াদিল্লির রাজপথ দখলে নেবে।
রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলনে একের পর এক তথ্যপ্রমাণ দাখিল করে দেখান কীভাবে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছেন জ্ঞানেশ কুমার। তিনি জানান, জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দিলে কোনোভাবে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না, রাস্তায় নামবে ভারতের জনগণ। তিনি বলেন, "অমিত শাহের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমার ভোট লুঠ করেছেন। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন। এটা আমরা বসে বসে দেখব না।" তিনি বলেন, "ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়োগ করেছেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলছেন ভারতে আগামী ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকবে। তারপর দেখা যাচ্ছে জ্ঞানেশ কুমার ভোট লুঠের ব্যবস্থা করছেন। তার মানে এটা স্পষ্ট যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মিলে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন।"
এদিন রাহুল গান্ধী আরও বলেন, "বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরে যে ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া, সেই ইন্দিরা গান্ধীকেই কিছুদিন বাদে ক্ষমতা থেকে জনাদেশ নিয়ে সরে যেতে হয়েছিল। একই ঘটনা রাজীব গান্ধী, মনমোহন সিংদের ব্যাপারেও ঘটেছে। তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে জনপ্রিয়তার সময়ে। অকংগ্রেসি নানা সরকারের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। এমনকী নানা রাজ্যেও এটা হয়েছে। বামফ্রন্টকে সরতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে।
কিন্তু একমাত্র বিজেপির বেলায় দেখা যাচ্ছে অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি কাজ করছে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে যাতে ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন না করা যায়।" তিনি জানান, জ্ঞানেশ কুমারকে সামনে রেখে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে ভেঙে ফেলে ভোট চুরির ব্যবস্থা কায়েম করতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে। এদিন নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখায় যুব কংগ্রেস।
উল্লেখ্য, বুধবার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছে। অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী অভিযোগ তুলেছেন যে তাঁদের অন্ধকারে রেখেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত ১০ মাসে ভোটার তালিকা এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে এই দুই নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন সান্ধু ও যোশী। এমনকী ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা, 'ফর্ম ৬'-এর পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ও সফটওয়্যারের সেন্ট্রালাইজেশন বা কেন্দ্রীকরণ নিয়েও তাঁরা একাধিক প্রশ্ন তোলেন।
যেগুলি অগ্রাহ্য করে এবং কমিশনের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলি পরিচালনা করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন তার মধ্যেই একটি। স্বভাবতই এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরেই এসআইআর ও ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের আরও দাবি, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে চলা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারকে অবৈধ ঘোষণার।
যদিও তিন নির্বাচন কমিশনারের মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলেই দাবি ভারতের নির্বাচন কমিশন ও শাসক দল বিজেপির। তবে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে বিরোধীরা এককাট্টা হলে বিজেপির কপালে সমূহ দুঃখ আছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
-- --
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত।
ইমেইল- [email protected]



