ইলা মিত্র: তেভাগা আন্দোলন, নাচোল বিদ্রোহ ও কৃষকের সংগ্রাম

১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। দাবি ছিল, জমির মালিক পাবেন ফসলের এক ভাগ। আগে পেতেন অর্ধেক। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি নাচোলে কৃষক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী, থানায় তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়।
ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন ও নাচোল বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কমিউনিস্ট কমরেড ইলা মিত্র ১৯২৫ সালে কলকাতায় জন্মালেও তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন নামকরা ক্রীড়াবিদ। খেলাধুলায় তিনি এতটাই ভালো ছিলেন যে, প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে অলিম্পিকের জন্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। বলছিলাম তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী বিপ্লবী ইলা মিত্রের কথা। নাচোলের সাঁওতালদের কাছে যিনি আজও তাদের রাণিমা।
১৯৪৫ সালে ইলা মিত্রের বিয়ে হয় রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে। তিনি রাজশাহী অঞ্চলের জমিদার পরিবারের ছেলে, আবার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। কথা ছিলো, হিন্দু রক্ষণশীল পরিবারের নিয়মানুসারে অন্দরমহলেই থাকবেন ইলা। কিন্তু তা না করে তিনি নেমে পড়েন কৃষকদের সংগঠনের কাজে।
১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। দাবি ছিল, জমির মালিক পাবেন ফসলের এক ভাগ। আগে পেতেন অর্ধেক। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি নাচোলে কৃষক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী, থানায় তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়।
জেলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে কলকাতায় যান। এরপর ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইলা মিত্র কেবল তেভাগা আন্দোলনই নয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও তিনি ছিলেন এক বিশ্বস্ত শক্তি।
ইলা মিত্র দেখিয়ে গেছেন, বিপ্লবের ধারণা শুধু শোষণের বিরুদ্ধে স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের শ্রেণিগত অবস্থান, সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অতিক্রম করে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ থেকে কৃষক আন্দোলনের নেত্রী হয়ে ওঠার পথটি ছিল সেই অঙ্গীকারেরই এক দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, কারাবাস কিংবা নির্বাসন—কোনোটিই তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে দিতে পারেনি। নাচোলের কৃষক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠী এবং এ দেশের মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাসে ইলা মিত্র তাই শুধু অতীতের এক কিংবদন্তি নন; তিনি শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখা প্রতিটি প্রজন্মের কাছে সাহস, সংহতি ও প্রতিরোধের এক অনিঃশেষ প্রেরণা।


