সৌদির আকাশে হুথিদের দাপট, অকার্যকর কি রিয়াদের প্রতিরক্ষা?

পেনুকা সুলতানা
পেনুকা সুলতানা
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:২৭পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
সৌদির আকাশে হুথিদের দাপট, অকার্যকর কি রিয়াদের প্রতিরক্ষা?

ছবিঃ সংগৃহীত

শেয়ার করুন:

প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যবস্থায় শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয় ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রথম মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এসব প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ দ্রুত ব্যবহার করতে হয়েছে। তাই এখন সংকটে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আর তা প্রতিহত করতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বাহিনীর দেশ সৌদি আরব। শনিবার রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র। প্রাণহানি হয় কমপক্ষে ১৩ জনের এবং গুরুতর আহত হন তিন শতাধিক। হামলা চালানো হয় রবিবারও। এতে নিহত হন ১ জন এবং আহত হন আরও অনেকে। হুথিদের এমন আক্রমণে অনেকটাই নাস্তানাবুদ সৌদি সরকার। প্রশ্ন উঠছে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে। কারণ, সৌদি আরবের হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাহলে সংকট কোথায়? আর এই হুথিরাই বা কারা? আর এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণই বা কী?

১৯৯০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করা হুথি গোষ্ঠী আনসার আল্লাহ বা ‘আল্লাহর অনুসারী’ নামে পরিচিত। দলটি উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। কিন্তু ইরানের সমর্থনে ছোট এ সংগঠনটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে একটি শক্তিশালী যোদ্ধা বাহিনীতে। এরপর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। বিপরীতে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তাই বলা যায়, দুই পক্ষের সংঘাতের মূলে রয়েছে ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইরান-সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বৈরিতা।

হুথিদের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান অংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। হুথিদের প্যালেস্টাইন-টু ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। তুফান ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ রয়েছে। আর এই পাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে ইয়েমেনের বাইরেও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে গোষ্ঠীটি। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অস্ত্রের ঘোষিত পাল্লা থাকলেই যে সেটি প্রতিবার নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে, তা কিন্তু নয়। কেননা, অস্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপরও।

তবে রিয়াদের বিমানবন্দরে সর্বশেষ হামলায় ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হুথিদের অস্ত্রভান্ডারের বড় অংশ ইরানি প্রযুক্তি ও অস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। চীনা প্রযুক্তির প্রভাব থাকার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে। আর সে জন্যই কি হুথিদের এসব হামলা ঠেকাতে বেগ পেতে হচ্ছে সৌদি আরবের মতো উন্নত সামরিক সক্ষমতার দেশকে?

মূলত, বিমান প্রতিরক্ষা কোনো একক ব্যবস্থা নয়। আকাশপথের বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় একাধিক স্তরের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে। সৌদির কাছে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো মার্কিন প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও তা শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এ ছাড়া, হুথিরা যখন একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে, বিভিন্ন গতি ও উচ্চতায় একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তখন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। সব লক্ষ্য শনাক্ত করা, কোনটিকে আগে প্রতিহত করতে হবে তা নির্ধারণ করা এবং পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর দিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা—সবকিছুই তখন জটিল হয়ে ওঠে। পাশাপাশি রয়েছে সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ড এবং বিস্তৃত সীমান্ত। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার জন্য বড় এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়। তবে সমস্যা শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নয়; রয়েছে গোলাবারুদের মজুত নিয়েও উদ্বেগ। প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যবস্থায় শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয় ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রথম মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এসব প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ দ্রুত ব্যবহার করতে হয়েছে। তাই এখন সংকটে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ।

এমন পরিস্থিতিতে হুথিদের ঠেকাতে কী করবে সৌদি কর্তৃপক্ষ? ইরান-সমর্থিত এ গোষ্ঠীকে মোকাবিলায় রিয়াদের সামনে রয়েছে কঠিন হিসাব। কেননা, হুথিদের শক্তি শুধু তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনে নয়, বরং তুলনামূলক সীমিত সামরিক সম্পদ ব্যবহার করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশলেও। আর সৌদি আরবের চ্যালেঞ্জ শুধু প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা নয়, বরং নিজের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়িয়ে চলা।

____

*পেনুকা সুলতানা
লেখক ও সাংবাদিক



শেয়ার করুন: