ভারত, বাংলাদেশ বা আমেরিকা গোদী মিডিয়া ছাড়া কিছু আছে কী?

আরিফুজ্জামান তুহিন
আরিফুজ্জামান তুহিন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
ভারত, বাংলাদেশ বা আমেরিকা গোদী মিডিয়া ছাড়া কিছু আছে কী?
শেয়ার করুন:

ভারতের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ আর আমাদের দেশের ‘রাজাকার’—শব্দ আলাদা হলেও কাজের ধরন তো একই! এখন হাসিনা সরকার পালানোর পর এরা রাতারাতি ভোল পালটে নতুন সরকারের কোলে বসে পড়েছে, গুণকীর্তন গাইছে বিএনপি বা তারেক রহমানের। সরকার বদলায় ঠিকই, কিন্তু এসব কর্পোরেট মিডিয়ার স্বভাব বদলায় না, এরা শুধু ক্ষমতার নতুন কোল খোঁজে।

অনেকেই মনে করেন, গণমাধ্যম বা মিডিয়ার কাজ হলো অসহায় মানুষের কথা বলা। অ্যাকাডেমিক ভাষায় শেখানো হয়—যাদের কোনো কণ্ঠ নেই, যাদের কথা কেউ শোনে না, মিডিয়া তাদের আওয়াজ হয়ে উঠবে। সমাজের নানা স্তরের দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তারা ক্ষমতাশালীকে প্রশ্ন করবে। কিন্তু বাস্তবে কী দেখি আমরা? সত্যি কথা হলো, অ্যাকাডেমিক এই গালভরা কথাটি পুরোটাই ভুয়া। সারা পৃথিবীতেই আজকের দিনে মিডিয়ার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট মালিক আর সাম্রাজ্যবাদীদের পাহারাদারি করা। আগের যুগে যেমন চোর-ডাকাতের হাত থেকে বাঁচতে ধনীর দুলালরা হিংস্র কুকুর পুষতো, এখন তারা টাকা দিয়ে মিডিয়া বানায়।


বড় বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর আসল চেহারা একটু খেয়াল করলেই তাদের নগ্ন রূপ দেখা যায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র যে পরিকল্পনা ছিল, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ তা জেনেও চেপে গিয়েছিল। কারণ সেটা ফাঁস করলে আমেরিকা নামক দানব রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বাধা পড়ত। মাদুরোকে যখন অপহরণ করা হচ্ছিল, তখন প্রতিরোধের মুখে ৩২ জন কিউবান সেনাকে এমন করুণভাবে মারা হয়েছিল যে তাদের শরীরের মাংস কিমা হয়ে গিয়েছিল। অথচ, পরে এই নিউ ইয়র্ক টাইমসই মাদুরোকে অপহরণ করার নিন্দা জানিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখে বড় ভালো সাজার নাটক করলো!


নিউ ইয়র্ক টাইমসের আরেকটি জঘন্য প্রতারণার উদাহরণ হলো ইরাক যুদ্ধ। সাদ্দাম হোসেনের হাতে নাকি ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আছে—মার্কিন এই ডাহা মিথ্যা অভিযোগটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের রিপোর্টার জুডিথ মিলার একের পর এক ভুয়া প্রতিবেদন ছেপেছিলেন। মার্কিন যুদ্ধবাজ কর্মকর্তাদের মনগড়া গল্প সাজিয়ে তিনি লিখলেন, ইরাক গোপনে অ্যালুমিনিয়াম টিউব দিয়ে পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে এবং সাদ্দাম ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছেন। এসব গুজবের ওপর ভর করেই বুশ প্রশাসন ইরাক আক্রমণ করে। ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকে তছনছ করে দশ লাখ মানুষের রক্তে ভাসিয়ে দেওয়া হয় দজলা-ফুরাত। পরে যখন চিলকট রিপোর্টসহ বিভিন্ন স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হলো ইরাকে কোনো মারণাস্ত্রই ছিল না, তখন কি নিউ ইয়র্ক টাইমস বিন্দুমাত্র লজ্জা পেয়েছিল? ২০০৪ সালে কেবল একটা দুঃখ প্রকাশের সম্পাদকীয় ছাপিয়ে এবং সাংবাদিক জুডিথ মিলারকে সরিয়ে দিয়েই তারা দায় সারলো!


আরেক বিশ্বস্ত নাম ‘বিবিসি’-র অতীত ঘাঁটলে তো রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। ১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ায় যখন স্বাধীনতাকামী মাউ মাউ বিদ্রোহ হয়, বিবিসি তখন ব্রিটিশ সরকারের প্রোপাগান্ডা যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তারা স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকারীদের "রক্তপিপাসু", "বর্বর জংলি" বলে আখ্যা দিয়েছিল। অথচ ব্রিটিশ সেনারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হাজার হাজার কেনিয়ানকে যে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যা করছিল, তা তারা পুরোপুরি চেপে যায়। ঠিক একইভাবে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার সময় চরম ভূ-রাজনৈতিক সংকটকে বিবিসি এবং পশ্চিমা মিডিয়া্রেমে ফেলেছিল "আফ্রিকানদের চিরন্তন উপজাতীয় রক্তপাত"  হিসেবে। তারা দেখাতে চেয়েছিল আফ্রিকানরা প্রাকৃতিকভাবেই বুনো ও অসভ্য। এমনকি ১৯৪১-১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রচারণার অংশ হিসেবে বিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল বিবিসির হয়ে কাজ করার পর নিজেই পদত্যাগ করেন। তিনি বিবিসিকে "মিথ্যা ও সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণা সংস্থা" আখ্যা দিয়েছিলেন, যাদের কাজ ছিল ভারতীয়দের মগজে ঢোকানো যে ব্রিটিশরা না থাকলে তারা নৈরাজ্যে ডুবে যাবে।


গত ১৬ বছরে আওয়ামী কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে দেশের  মিডিয়া যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।  সর্বশেষ রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যখন ফ্যাসিবাদের পতন হলো, মিডিয়ার দায়িত্ব ছিল তরুণদের রক্ত আর মহান ত্যাগের পাহারা দেওয়া। কিন্তু জনগণের বদলে তারা নতুন করে সেই পুরনো এলিট আর সুবিধাভোগীদের কোলে গিয়ে বসল, যাদের সারা জীবন জনগণের শত্রু হিসেবে দেখা গেছে। অরাজনৈতিক নতুন একটি সরকার গঠনের পর তাদের যে চাপে রাখা দরকার ছিল, মিডিয়া তা করেনি। বিএনপি সরকার গঠনের পর মিডিয়া আসলে তাই করছে যা তারা আওয়ামী লীগের আমলে করতো। অর্থাৎ ক্ষমতা ও সরকারকে আইসক্রিম মনে করে খাওয়া।


পাশের দেশ ভারতের মিডিয়ার দিকে তাকালে মিডিয়ার কর্পোরেট দাসত্বের চরিত্রটা সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার হয়। ভারতের মিডিয়া আজ বিশ্বের সামনে এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সাধারণ মানুষ যার নাম দিয়েছে ‘গোদী মিডিয়া’ (যে মিডিয়া সরকারের কোলে বা গদিতে বসে)।


বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)-এর বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে যখন হিজাব-বোরকা পরা সাধারণ মুসলিম নারীরা দিনরাত আন্দোলন করছিলেন, ভারতের মূলধারার গোদী টিভিগুলো তখন তাদের নির্লজ্জভাবে ‘পাকিস্তানপন্থি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলে দাগিয়ে দেয়। ভারতের পাহাড়ি ও আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে মাটির নিচে থাকা বিপুল খনিজ সম্পদের দিকে চোখ পড়েছে টাটা, আদানি, আম্বানি আর রিলায়েন্সের মতো রাঘববোয়ালদের। এসব সম্পদ তুলতে জঙ্গল কেটে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই এই গোদী মিডিয়াগুলো তাদের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বা ‘আরবান নকশাল’ ট্যাগ দেয়। রিপাবলিক টিভির অর্ণব গোস্বামী, ইন্ডিয়া টিভির রজত শর্মা কিংবা আজ তকের সুধীর চৌধুরীরা ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে সরকারের বদলে নিরীহ জনগণ বা বিরোধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। তারা নিরলসভাবে একটাই বয়ান তৈরি করেন—‘হিন্দুরা আজ বিপদে’।

এই চিত্রটা কি আমাদের বাংলাদেশের সাথে একেবারে মিলে যায় না? গত ১৬ বছরে দেশে ছাত্র-জনতা কোনো যৌক্তিক দাবিতে রাস্তায় নামলেই আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো তাদের অবলীলায় ‘জামায়াত-বিএনপি’, ‘উন্নয়ন বিরোধী’ বা ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে দিয়েছে। ভারতের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ আর আমাদের দেশের ‘রাজাকার’—শব্দ আলাদা হলেও কাজের ধরন তো একই! এখন হাসিনা সরকার পালানোর পর এরা রাতারাতি ভোল পালটে নতুন সরকারের কোলে বসে পড়েছে, গুণকীর্তন গাইছে বিএনপি বা তারেক রহমানের। সরকার বদলায় ঠিকই, কিন্তু এসব কর্পোরেট মিডিয়ার স্বভাব বদলায় না, এরা শুধু ক্ষমতার নতুন কোল খোঁজে।


বিজ্ঞাপনের বাণিজ্যিক ফাঁদে আটকে থাকা এসব কর্পোরেট মিডিয়ার পক্ষে কখনোই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব নয়। কারণ, তাদের প্রধান শর্তই হলো নিজেদের পেট চালানো ও কর্পোরেট মালিকের স্বার্থ রক্ষা করা। 


সারা দুনিয়াতে মিডিয়ার প্রধান কাজ হলো করপোরেটের মালিকদের বা পুঁজিপতিদের একনিষ্ট সেবক পাহারাদারি করা। সে কারনে অনেকে বলেন, আগের যুগে চোর ডাকাত থেকে রাতে পাহারা দেবার জন্য হিংস্র কুকুর পুষতো,  এ কালে সেই সম্পদের মালিকেরা মিডিয়া বানায়।


স্বাধীন গণমাধ্যমের পাশে দাঁড়ান। ঢাকা পেপার্সসহ বাংলাদেশ ও বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এমন গণমাধ্যমগুলোর পাশে দাঁড়ান।  একটু গভীরভাবে ভাবুন, পত্রিকার পাতা বা টিভির পর্দা যদি কর্পোরেটের দেওয়া বিজ্ঞাপনের চাদরেই ঢাকা থাকে, তাহলে সেখানে আপনি আপনার প্রিয় মানুষের মুখটা খুঁজবেন কোথায়? মুখ যদি বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায়, তবে প্রিয় মুখ আর দেখা হবে না। সত্য দেখতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাটা এখন জনতাকেই কিনে নিতে হবে।


____

*লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।

ইমেইল: [email protected]



শেয়ার করুন: