গাজীপুরে ২০ মাসে ৯৫১ আত্মহত্যা

ডিপি ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৯:২৫পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
গাজীপুরে ২০ মাসে ৯৫১ আত্মহত্যা
শেয়ার করুন:

মাত্র ২০ মাসে গাজীপুর জেলায় ৯৫১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। হিসাব করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে গড়ে প্রতি দুই দিনে  ৩ জনের বেশি এবং প্রতি মাসে প্রায় ৪৮ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। ভয়াবহতার দিক থেকে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী।

গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। পোশাক কারখানা, গার্মেন্টস কর্মী আর বিভিন্ন স্তরের কর্মজীবী মানুষের পদচারণায় এই জেলা সার্বক্ষণিক মুখর। কিন্তু শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার আড়ালে এখানে জমে উঠেছে নীরব ও গভীর এক মানবীয় ট্র্যাজেডি। পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত—মাত্র ২০ মাসে গাজীপুর জেলায় ৯৫১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। হিসাব করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে গড়ে প্রতি দুই দিনে  ৩ জনের বেশি এবং প্রতি মাসে প্রায় ৪৮ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। ভয়াবহতার দিক থেকে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। কয়েক মাস আগে তরুণ শ্রমিকদের এই অসহায়ত্ব নিয়ে গানও বানানো হয়। 


এই পরিসংখ্যান নিঃস্ব পরিবার এবং সমাজব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল হিসেবে আমাদের সামনে থেকে যায়। গাজীপুরের এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক অমানবিক কর্ম পরিবেশ, বকেয়া মজুরির অনিশ্চয়তা, নিম্ন মজুরি, আকাশচুম্বী ঋণগ্রস্ততা এবং ক্রমবর্ধমান চরম মানসিক বিষণ্ণতা।

অমানবিক কাজের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা 


পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও এই শিল্পের ওপর ভর করে বেঁচে থাকা লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন অমানবিকতায় ঘেরা। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, নামমাত্র মজুরি এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার অনমনীয় চাপ কর্মীদের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তোলে। মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির যুগে প্রাপ্ত নিম্ন মজুরি দিয়ে দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ওপর যখন যুক্ত হয় বকেয়া মজুরি কিংবা হঠাৎ চাকরি হারানোর ভয়, তখন একজন শ্রমিকের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। জীবনধারণের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে তারা বাধ্য হয়ে এনজিও, স্থানীয় মহাজন কিংবা কিস্তি ব্যবস্থার চক্রব্যূহে প্রবেশ করেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্য ও আয়ের অনিশ্চয়তার কারণে ঋণের বোঝা শোধ করতে না পেরে শ্রমিকরা ঋণগ্রস্ততার গভীর জালে বন্দি হয়ে পড়েন।


শিল্প ঘন অঞ্চলে একই পুঁজিবাদী মুনাফাখোরীর কারনে মানবিক  ট্র্যাজেডি নতুন নয়। দেশে দেশে শ্রমঘন অঞ্চলগুলোতে এই মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। ২০১০ সালে চীনের শেনঝেন শহরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ইলেকট্রনিক্স  প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'ফক্সকন'-এ টানা এক ডজনেরও বেশি তরুণ কর্মী আত্মহত্যা করেন। কম মজুরি, অমানবিক কর্মঘণ্টা, অত্যধিক কাজের মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই তরুণ কর্মীদের আত্মহননে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কর্ম পরিবেশ সংস্কারে বাধ্য হয়।


কম্বোডিয়া এবং ভারতের ব্যাঙ্গালোরের তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চলেও নিয়মিতভাবে চরম মানসিক বিষণ্ণতা ও শ্রমিকের আত্মহননের খবর সামনে এসেছে। দৈনিক কাজের মাত্রাতিরিক্ত চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সামান্য মজুরি পাওয়ার ফলে সৃষ্ট চরম বিষণ্ণতাই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।


টার্গেট পূরনের প্রচন্ড পরিশ্রমের পরও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ঋণের দায় মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন, মহাজনের তাগাদা এবং পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলার গ্লানি তরুণ কর্মীদের মাঝে গভীর বিষণ্ণতা তৈরি করে। যখন বেঁচে থাকার মানসিক সামর্থ্য শেষ হয়ে যায়, তখন অনেকেই আত্মহননকে এই যন্ত্রণার শেষ পথ হিসেবে ধরে নেন।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা পেতে গার্মেন্টস ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবিলম্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরী। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে যখন আমরা উন্নয়নের কথা বলি তখন আড়ালে শ্রমিকদের জীবনের সময়সীয়ামা ফুরিয়ে আসতে থাকে। শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত না করলে এ উন্নয়ন টেকসই হবে না।


শেয়ার করুন: