১৪ বছর ও হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর বাতিল হচ্ছে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প

ডিপি ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৫৪পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
১৪ বছর ও হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর বাতিল হচ্ছে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প

ছবিঃ সংগৃহীত

শেয়ার করুন:

প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নেওয়া এবং ব্যয় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে। কিন্তু প্রকল্পের কার্যকারিতা, নকশাগত ত্রুটি ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লেগেছে ১৪ বছর। চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে যানজটমুক্ত যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়নি। বরং ব্যয় বৃদ্ধি, নকশাগত ত্রুটি, জনদুর্ভোগ ও প্রাণহানির ঘটনার পর প্রকল্পটি বাতিল করে স্টেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথে দ্রুত গণপরিবহন চালুর লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। নির্মাণকাজের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও কাদাপানি এবং শুষ্ক মৌসুমে ধুলার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রকল্পটির অন্যতম বড় সমস্যা ছিল অবকাঠামোর নকশা ও প্রচলিত গণপরিবহনের মধ্যে অসামঞ্জস্য। মহাসড়কের মাঝখানে নির্মিত স্টেশনগুলোতে যাত্রী ওঠানামার জন্য বিশেষ ধরনের বাস প্রয়োজন ছিল, যার দরজা থাকবে ডান দিকে। কিন্তু সেই বাস চালু করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ বাস দিয়ে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বাঁ পাশের দরজা দিয়ে নামতে গিয়ে যাত্রীদের সরাসরি চলমান যানবাহনের ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে। ফলে স্টেশন নির্মাণের পরও সেগুলো প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার করা যায়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নেওয়া এবং ব্যয় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে। কিন্তু প্রকল্পের কার্যকারিতা, নকশাগত ত্রুটি ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

নির্মাণকাজের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের বক্স গার্ডার একটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে। এতে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। প্রকল্পটির নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রকল্পটির বিভিন্ন ত্রুটি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে একে অবকাঠামো খাতের পদ্ধতিগত ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকাও পর্যালোচনার কথা বলা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। প্রকল্পটির বিভিন্ন পর্যায়ে এসব সংস্থার পরিকল্পনা, সমন্বয়, তদারকি ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল করে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি বিলুপ্ত করা এবং স্টেশনসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে একদিকে দীর্ঘদিনের নির্মাণজনিত ভোগান্তি থেকে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও অন্যদিকে নির্মিত অবকাঠামো ভাঙতে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে।

একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়, মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট এবং প্রাণহানির ঘটনার পর শুধু প্রকল্প বাতিল করেই দায় শেষ করা যায় না। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, নির্মাণ, তদারকি ও ব্যয়ের প্রতিটি পর্যায়ে যাঁদের দায়িত্ব ছিল, তাঁদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের মতো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।

শেয়ার করুন: