ফ্রান্সের বিক্ষোভ: জনক্ষোভের আড়ালে চরম বামপন্থার ভূত দেখছে ডানপন্থীরা

ছবিঃ দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষকের সংকট নিয়ে প্রথমে রাস্তায় নামেন ফ্রান্সের বেশ কিছু শিক্ষার্থী। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং সামাজিক বৈষম্যের অভিযোগ। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বৃহত্তর প্রতিবাদে। বিক্ষোভকারীদের মতে, সরকারি পরিসেবার মান কমছে বিপরীতে খরচ বাড়ছে দৈনন্দিন জীবনের।
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনে মানুষের তীব্র ক্ষোভে চরম বামপন্থীদের ভূত দেখছেন দেশটির ডানপন্থীরা। আন্দোলনের সহিংস রুপকে ব্যবহার করে চেষ্টা করছেন বিভাজন তৈরীর।
১৭ অক্টোবর, শনিবার, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বেকারত্ব আর জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এসব নিয়ে ক্ষোভ থেকে ফ্রা্ন্সজুড়ে রাস্তায় নামে লাখ লাখ মানুষ।শুরুতে বিক্ষোভ ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। কিন্তু দিন গড়ানোর সাথে সাথে বদলাতে থাকে পরিস্থিতি । একপর্যায়ে রূপ নেয় দেশজুড়ে সহিংসতায়।
রাজধানী প্যারিসে মুখোশ পরা একদল তরুণ দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। লিয়ঁ শহরে আগুন পুড়ে যায় পর্যটন কার্যালয়। আর মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে আগুনে ধসে পড়ে ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলের চূড়া। ঐতিহাসিক ভবনটির এই ক্ষতি অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে নটর ডেম ক্যাথেড্রালের অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। ভয়াবহ এ সহিংসতায় গ্রেপ্তার হয়েছে দুই হাজারের বেশি নাগরিক। .অন্তত দুজনের মৃত্যু খবর সামনে এসেছে। পুলিশ ও বিক্ষোভাকারীসহ গুরুতর আহত অনেকেই।
তবে এ বিক্ষোভ হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। এর সূত্রপাত গেলো মাসেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষকের সংকট নিয়ে প্রথমে রাস্তায় নামেন ফ্রান্সের বেশ কিছু শিক্ষার্থী। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং সামাজিক বৈষম্যের অভিযোগ। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বৃহত্তর প্রতিবাদে। বিক্ষোভকারীদের মতে, সরকারি পরিসেবার মান কমছে বিপরীতে খরচ বাড়ছে দৈনন্দিন জীবনের। শিক্ষা, পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যে পরিষেবা পাওয়ার কথা সেটুকুও নিশ্চিত হচ্ছে না। পাশাপাশি জ্বালানির উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের দাবি দিয়ে শুরু হলেও বিক্ষোভের পরিধি ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষে।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও মানুষের দাবি নিয়ে সরকারি কোন ঘোষণা না আসায় আন্দোলন ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠতে থাকে। ভাংচুর চালায় অনেকেই। এই সুযোগে একদল মুখোশ পরা মানুষকে লুটপাটে অংশ নিতে দেখা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নেন। কিছু সহিংস গোষ্ঠীকে সমাবেশের মধ্যে ঢুকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত, দোকানের কাচ ভাঙা বা পণ্য লুট করা এবং আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য দায়ি করা হচ্ছে। অন্য শহরেও সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।
এমন অবস্থায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিক্ষোভের মূল দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার ।
শনিবার দেশজুড়ে ৬০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কিছু শহরে সহিংস জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতা বন্ধে নতুন পরিকল্পনা নিতে এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আগাম পরিস্থিতি মূল্যায়নের ব্যর্থতা সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন। এছাড়া ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনও, সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো দায়ি বলে অভিযোগ করেছেন।
ফ্রান্সের এই অস্থিরতা এখন আইনশৃঙ্খলার সংকটেই আর সীমাবদ্ধ নেই। প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারি ঋণ এবং বাজেট নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি করতে পারে। এখানেই শেষ নয়, আছে আসন্ন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই বিক্ষোভের রাজনৈতিক প্রভাবও । ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন’র অভিযোগ, সাধারণ মানুষের যৌক্তিক ক্ষোভকে চরম বামপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ।
তাই ফ্রান্স সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। প্রথমত সহিংসতা থামিয়ে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। আর দ্বিতীয়ত মানুষের ক্ষোভের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা।
তবে ম্যাক্রোঁর সরকার এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে কি না তার ওপরই নির্ভর করছে ফ্রান্সের চলমান সংকট কোন দিকে এগোবে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই বিক্ষোভ প্রমাণ করে ফ্রান্সের বৃহৎ করপোরেট গুলোর মুনাফার চাপে তৈরী হওয়া মানুষের ক্ষোভ উদার মধ্যপন্থী সরকার দিয়েও প্রশমিত হচ্ছে না।


