মধ্যপ্রাচ্যে কীভাবে ড্রোন বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের কৌশল
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সস্তার’ এই ড্রোনগুলো করে ভূপাতিত করতে প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করতে হয়, যার দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ এখন নির্ভর করছে এক নতুন অস্ত্রের ওপর—ড্রোন। ইরানের সস্তা কিন্তু ভয়ংকর কার্যকর ‘শাহেদ’ ড্রোন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নকল করা ‘লুকাস’ ড্রোন—প্রযুক্তির এই লড়াই এখন যুদ্ধের অর্থনীতি ও কৌশল দুটোই বদলে দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পর থেকে ইরান ও তার মিত্ররা ব্যাপক হারে ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে ।
আল জাজিরা ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন এখন এই যুদ্ধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচ করে তৈরি করা এই ড্রোন উৎক্ষেপণের পর এর স্বতন্ত্র ‘মোপেড সাউন্ড’ বা স্কুটারের শব্দের মতো আওয়াজ আতঙ্ক ছড়ায়, এর পাল্লা প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার, যা দিয়ে উপসাগরের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। এর মূল শক্তি এর বিস্ফোরক নয়, বরং এর অর্থনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সস্তার’ এই ড্রোনগুলো করে ভূপাতিত করতে প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করতে হয়, যার দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
এর ফলে এক ধরনের ‘ক্ষতিবৃদ্ধির যুদ্ধ’ তৈরি হয়েছে। ইরান সহজে ও কম খরচে বহু ড্রোন নিক্ষেপ করে যাচ্ছে, আর আমেরিকাকে বিপুল মূল্যবান মিসাইল ব্যয় করতে বাধ্য করছে। গত কয়েক দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে ৮০০টিরও বেশি ড্রোন এবং প্রায় ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি এবং সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গচিত্র হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের কাছ থেকেই ড্রোন তৈরির কৌশল শিখে সেটা ব্যবহার করছে। মার্কিন সেনাবাহিনী গোপনে ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোন সংগ্রহ করে সেটির ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে তৈরি করেছে ‘লুকাস’ ড্রোন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে প্রথমবারের মতো এই ‘লুকাস’ ড্রোন যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে বলে সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে। প্রতিটি ‘লুকাস’ ড্রোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। এই ড্রোনগুলো ‘শাহেদের’ মতো প্রি-প্রোগ্রাম করা পথে না চলে, স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে উড়তে পারে এবং একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।
পেন্টাগনের হিসাব বলছে, ড্রোনের এই ঝাঁক মোকাবিলায় তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন শত শত ড্রোন মোকাবিলায় হাজার হাজার প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইতিমধ্যে নিঃশেষ হওয়ার পথে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, আকাশে আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও ইরানের সব ড্রোন হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন এই ড্রোন যুদ্ধ মোকাবিলায় ‘ড্রোন ডমিনেন্স’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যেখানে ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ লাখ ৪০ হাজার ড্রোন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যাধুনিক কিন্তু দামি ফাইটার জেটের দিন শেষ হচ্ছে, এখন যুদ্ধ হবে সস্তা ও বহুল ব্যবহার্য ড্রোনের।
ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে এবং কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস শিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।
এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন শুধু গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যম নয়, বরং মূল আক্রমণের হাতিয়ার। ইরানের সস্তা প্রযুক্তি আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং এই অসম লড়াইয়ের ফলাফল নির্ধারণ করবে কে এই ‘ক্ষতিবৃদ্ধির যুদ্ধে’ টিকে থাকতে পারে।



