ভাতের লড়াই আটকে চুক্তির ফাঁদে, জুলাইয়ের নাম বেচে যুদ্ধ দেয়ালে দেয়ালে

ওয়াশিংটনকে খুশি করতে বোয়িং কেনা হচ্ছে। তাতে ইউরোপ বেজার হচ্ছে দেখে তাদের থেকে এয়াসবাস কেনা হচ্ছে। এসবের আড়ালে এদেশের কৃষক-শ্রমিক সবচেয়ে নিগৃহীত। তাদের বুক ভরা হতাশা এই শহরে যাতে না পৌছায় তাই সরকার মধ্যবিত্তের চোখে জুরে দিচ্ছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের রঙিন ফানুস।
কথা ছিল, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাস থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে ১ কোটি কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেবে। কিন্তু সরকার হাতে নিল বোয়িং ও ইউরোপীয় এয়ারবাস মিলিয়ে মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া, যার খরচ ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। কথা ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগের, কিন্তু দেশে এলো আমেরিকা থেকে জনগণের টাকায় আমাদানিকৃত ৭৩ লাখ টনের বেশি গম। এমন সময়ে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে শিল্পকলার দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকবেন কি থাকবেন না, সেই বিতর্ক। ঝুটঝামেলায় না গিয়ে, দেয়ালে যদি ট্রাম্প কিংবা দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের ছবি আঁকা হতো, তাহলে আমাদের সরকারি ও বিরোধীদলের বুদ্ধিজীবীরা হাফ ছেড়ে বাঁচতেন।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর তালিকা থেকে বাদ পড়েন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী। বাবা মৃত, মা গৃহপরিচারিকা নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা—এই ঠিকানার অভাব এক পরীক্ষার্থীর অপরাধ। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাঁর চাকরি হলো না। মেধার পরীক্ষায় পাস করেও তিনি হেরে গেলেন ফেল হওয়া রাষ্ট্রের কাছে। অথচ নির্বাচনের আগে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাস থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে ১ কোটি কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রায় আট মাস পূর্ণ হয়েছে। আর বাকি দশ মাস। বিএনপির ওয়েবসাইটে পড়ে থাকা ইশতেহারের ওপর যেভাবে ধুলো জমছে, সেভাবেই এ দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ আর অর্থনীতির ওপর এক হতাশার আস্তরণ পড়ছে। বিএনপির দেশ গড়ার পরিকল্পনায় বড় বড় করে লেখা ছিল মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ। কিন্তু এই আট মাসে এ দেশের মানুষ দেখল ক্ষমতাভিত্তিক নিয়োগ। সেই পুরোনো বন্দোবস্তের কায়দায় চলছে আমাদের নিয়োগব্যবস্থা। শুধু কর্মসংস্থানের রঙিন বেলুন চুপসে যায়নি, জাতীয় অর্থনীতির সব দিকই আজ ক্ষতাসীনের হটকারী সিদ্ধান্ত আর লুটপাটে দিশেহারা।
একদিকে কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে চাকরির দরজায় পরিচয় যাচাইয়ের নামে বাদ পড়া পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাস। এই দুইয়ের মাঝখানেই আটকে আছে মানুষের ভবিষ্যত।
২.
এ বছর ২৪ টাকা খরচের আলু কৃষককে বিক্রি করতে হচ্ছে ১২ টাকায়। বছরের পর বছর লোকসান করার পরও কৃষক জমি থেকে উঠে আসেনি। প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে এবার খরচ হয়েছে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। ধান বিক্রির মৌসুমে কৃষক সর্বোচ্চ প্রতি কেজি ধানের দাম পান ২৫ টাকা। কেজিপ্রতি ধানে লোকসান ১২ টাকা ৫০ পয়সা। মণপ্রতি লোকসান ৫০০ টাকার মতো। দিনের পর দিন কৃষকের ভর্তুকিতেই উৎপাদিত হচ্ছে এ দেশের মানুষের চাল, ডাল, সবজি। কৃষক নিজের শ্রমের দাম পাচ্ছে না, জমির দাম পাচ্ছে না, ফসলের দাম পাচ্ছে না। রাষ্ট্রের বাজারব্যবস্থা কৃষকের লোকসানকে স্বাভাবিক করে তুলেছে, আর মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফাকে বানিয়েছে অর্থনীতির নিয়ম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ। রাজশাহী, ঝিনাইদহ, নীলফামারী ও মেহেরপুরে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডিলারশিপ দেওয়া হচ্ছে বলে পত্রিকায় খবর আসছে। সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। গুদামের তালা ভেঙে সার নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন আমাদের গরিব মেহনতি কৃষকরা, আর তাঁদের নামেই মামলা দিচ্ছে সরকার।
যে কৃষক দেশের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার ভার নিজের কাঁধে বহন করেন, তাঁর হাতেই সার পৌঁছায় না। দলীয় পরিচয়ের জোরে ডিলারশিপ পাওয়া মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই সারের নিয়ন্ত্রণ। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, ফসলের দাম পড়ে যায়, সার পেতে হয়রানি বাড়ে। কৃষকের ফসলের দাম নেই, শ্রমিকের মজুরি নেই, তরুণের চাকরি নেই। অথচ রাষ্ট্রের ব্যয়ের খাতা আর ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতির খাতায় অভাব নেই। এভাবেই জনগণের শ্রমে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতি জনগণেরই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বুল্ডোজার চালাচ্ছে।
৩.
রাজনীতির চটকদার কথার বাইরে এসে আমাদের চোখে প্রখর রোদের মতো যে বাস্তবতা এসে লাগে, তা হলো বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ ও ‘ম্যাক্রো পোভার্টি আউটলুক’ (অক্টোবর ২০২৬)। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩.৪ শতাংশে। আগামী অর্থবছরেও এই স্থবিরতা কাটার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যের হার—দিনে ৩ ডলারের নিচে আয়—বেড়ে ১০.১ শতাংশে উঠেছে, যা আগামী অর্থবছরে ১০.৫ শতাংশে পৌঁছাবে। দিনে ৪.২০ ডলারের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় নিলে দারিদ্র্যের হার এখন ২৪.৪ শতাংশ। এক বছরেই নতুন করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৩২ লাখ বা সোয়া ৬ কোটি মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার ঠিক কিনারায়—ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে—বাস করছে। এদের কোনো সঞ্চয় নেই, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ন্যূনতম সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম কিংবা সামান্য পারিবারিক অসুস্থতার একটি ধাক্কাতেই এই সোয়া ৬ কোটি মানুষ এক নিমেষে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবর্তনের যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি দেশের উৎপাদনব্যবস্থার জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো গাজী টায়ার্সের মতো সুবিশাল কারখানা। অথচ গাজী টায়ার্স দেশে উৎপাদন করায় ভারত থেকে টায়ার আমদানি প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। কারখানাটি পুড়িয়ে দিয়ে লাভটা আসলে কার হলো। শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় বন্ধ করে দিয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করা হলো। একই চিত্র বেক্সিমকোসহ ছোট-বড় কয়েকশ কারখানায়। বেক্সিমকোর পোশাক কারখানাগুলো সচল রাখলে শুধু ৫০ হাজার শ্রমিকের পেটে ভাত জুটত না, তাঁদের আয়ের টাকায় পণ্য কেনাবেচা চলত, ভ্যাট পেত সরকার, সচল থাকত অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাকা। এটিই বাজারব্যবস্থার টিকে থাকার প্রাথমিক শর্ত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আর পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত বিএনপি সরকার—কেউই এই ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে বা বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারেনি। উল্টো এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজিরবিহীন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। জ্বালানির অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এখন অর্ধেকে নেমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত ০.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
এর সরাসরি আঘাত এসেছে শ্রমিকের পেটে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমেছে ০.৫ শতাংশ, আর শিল্প খাতে এই মজুরি পতন ঘটেছে ০.৭ শতাংশ। অর্থাৎ, শ্রমিক কাজ করলেও মাস শেষে আগের চেয়ে গরিব হচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষ বেড়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ, কিন্তু কাজ তৈরি হয়েছিল মাত্র ৮৭ লাখ। এই অর্থনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি ক্রমেই জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে পরিণত হচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে টিভিতে দেখতেই তা ভালো লাগে। এর বাহিরে এই স্লোগানের কোনো সংযোগ নেই। যে শ্রমিকরা এখনো অর্থনীতির চাকা ঘুরাচ্ছে তারাও পাচ্ছে ১০০ ডলার মজুরি। ভারত, চীন, শ্রীলংকার তুলনা সবচেয়ে কম মজুরি পাচ্ছে আমার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মজীবী মানুষ। তাদের হাতের টাকা লুট করে তা দিয়ে দেশ বিদেশে তৈরি হচ্ছে সাম্রাজ্য! এই শ্রমিকদের প্রতিদিনের যাপনই আমার দেশের বাস্তব চিত্র।
৪.
জনগণের এই হাহাকারের সময়ে সরকার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাও ১৫ বছরের জন্য। যুক্তি—দুর্নীতি কমবে, বন্দর আধুনিক হবে। ওই সেই পুরোনো ডিজিটাল বাংলাদেশ আর উন্নয়নের গালগল্প। এত গালগল্পের পরও ২০২৬ সালে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয় কীভাবে, সেটাই প্রশ্ন।
বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে এনসিটি থেকে বন্দরের নিট আয় কনটেইনারপ্রতি ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার। গত অর্থবছরেও এই টার্মিনাল থেকে হাজার কোটি টাকার ওপর নিট লাভ হয়েছে। এটি বিদেশিদের হাতে দিলে লাভের একটি বড় অংশ রয়্যালটি ও লভ্যাংশের আকারে বিদেশি কোম্পানি বিদেশে নিয়ে যাবে, যার ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে রাজস্ব ঘাটতির কথা বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আছে, সেই রাজস্বে ঘটতি তৈরি করারা মত আরেকটি চুক্তি ঘটে গেল।
চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিদিন যা আয় করত, বন্দর বিদেশিদের হাতে দিলেই কি আমূল কোনো পরিবর্তন হয়ে যাবে? সরকারি তথ্য যাচাই করলে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায়। আমাদের এনসিটি এমনিতেই প্রস্তুত একটি টার্মিনাল। নিজস্ব জনবল আর যন্ত্রপাতি দিয়েই বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন বছরে প্রায় ১৪ লাখ কনটেইনার সামলাচ্ছে। অথচ সরকারের সই করা এই নতুন চুক্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার কনটেইনার। অর্থাৎ, বিদেশি কোম্পানির জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা দেশের বর্তমান সক্ষমতার চেয়েও অনেক নিচে। এরপর আসে বিনিয়োগের আলোচনা। বলা হচ্ছে, তারা এই বন্দরে ১৫ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। কিন্তু আড়ালে থাকা সত্যটি হলো, বাইরে থেকে এই পুরো মূলধন আনার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। এক হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ, যার পরিমাণ অন্তত ৬০ শতাংশ হতে পারে, তারা আমাদের দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে জোগাড় করবে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি বিদেশি কোম্পানি নামমাত্র মূলধন আনবে। উল্টো দেশের ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের জমানো টাকা ঋণ হিসেবে নেবে। সেই টাকায় আমাদের তৈরি লাভজনক একটি টার্মিনালে ব্যবসা ফাঁদবে। আর আমরা শুনব, এতে দেশ আধুনিক হবে, দুর্নীতি কমবে, দক্ষতা বাড়বে।
একটি লাভজনক টার্মিনাল পরিচালনা করার সক্ষমতা আমাদের আছে। সেই সক্ষমতাকে আরও উন্নত করা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দেশের রাজস্ব বাড়ানোই হতে পারত রাষ্ট্রের কাজ। অথচ রাষ্ট্র নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে তৈরি সম্পদের পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।
সাংস্কৃতিক যুদ্ধের আড়ালে অর্থনীতির লুট।
৫.
সরকারের গণবিরোধী পরিকল্পনা আমাদের অর্থনীতিকে ধসিয়ে ফেলছে। এই প্রাক্কালে যখন জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার আমাদের মিডিয়া, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ও সার্বিক বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির, তখন তারা সকলে আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিচ্ছে এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধের দিকে।
গরিব ঠেঙিয়ে এই মধ্যবিত্তের চোখের আরাম নিশ্চিত করার নামে দেয়ালে শিল্পকর্ম চলছে। অথচ এই মধ্যবিত্ত যখন শিল্পকলার দেয়াল ধরে হেঁটে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে গিয়ে ডিমের দাম দেখছেন, তখন কৃষক আর মধ্যবিত্ত বুকভরা বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একই কাতারে। কাতার বড় হচ্ছে, আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তাদের ছাড়িয়ে সামনে এগোতে এগোতে— রাষ্ট্র তাদের হাতে যে ললিপপ ধরিয়ে দিয়েছে, তা নিয়েই মেতে আছে।
রাষ্ট্র ছবি আঁকছে, একজনকে দিয়ে তা মুছে ফেলছে, আরেকজনকে দিয়ে কালি মোছাচ্ছে। কালি দিচ্ছে যে, তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে দেশদ্রোহীতার মামলায়! এর মাধ্যমেই যেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবও ঘটাচ্ছে সরকার- বুদ্ধিজীবীরা তাও বলার চেষ্টা করে। অথচ সরকার অনুপস্থিত সেসব জায়গায়, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো পড়ে আছে উগ্রবাদীদের হাতে ভাঙা ভাস্কর্যগুলো। পড়ে আছে ভাঙা মাজার ও মন্দির।
বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক শক্তির পণ্য বিক্রির ভাগাড়ে।
ওয়াশিংটনকে খুশি করতে বোয়িং কেনা হচ্ছে। তাতে ইউরোপ বেজার হচ্ছে দেখে তাদের থেকে এয়াসবাস কেনা হচ্ছে। এসবের আড়ালে এদেশের কৃষক-শ্রমিক সবচেয়ে নিগৃহীত। তাদের বুক ভরা হতাশা এই শহরে যাতে না পৌছায় তাই সরকার মধ্যবিত্তের চোখে জুরে দিচ্ছে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের রঙিন ফানুস।
জুলাইয়ের নিজের পকেটে ভরা বুদ্ধিজীবীরাও আজ বসে দেয়ালে চাঁদ আঁকছে। যে চাঁদ এই দেশের প্রত্যেক ক্ষুধার্ত পেটের কাছে ঝলসানো রুটি হয়ে রয়ে গেছে। নজর ঘোরানোর পরিকল্পিত রাজনৈতিক চালে যখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশি করপোরেট মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহল, তখন যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।
____
*লেখক: নূজিয়া হাসিন রাশা
গবেষক ও সাংবাদিক


