চিলির অন্য এক ‘নাইন ইলেভেন’: আয়েন্দের আত্মত্যাগ ও সিআইএ’র রক্তাক্ত ইতিহাস


আয়েন্দে বুঝে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ভয় ছিল না। তিনি বলেন, “ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, জনগণের প্রতি আনুগত্যের মূল্য আমি জীবন দিয়ে দেব। আমি নিশ্চিত, হাজার হাজার চিলিবাসীর বিবেকের মাটিতে যে বীজ আমরা বপন করেছি, তা চিরদিনের জন্য নষ্ট হবে না। ওরা আমাদের বলপ্রয়োগ ও অস্ত্র দিয়ে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু বলপ্রয়োগ ও হিংসা দিয়ে কোনো সামাজিক প্রক্রিয়াকে থামানো যায় না। ইতিহাস আমাদের... আর ইতিহাস তৈরি করে জনগণ।”
‘নাইন ইলেভেন’ বা ৯/১১ বললে সাধারণত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ছবি মনে আসে। কিন্তু ইতিহাসে আরও একটি ৯/১১ আছে, যা সেই ঘটনার ২৮ বছর আগের। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মদদে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চিলির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়।
প্রতি বছর এই দিনটিতে চিলির মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের নিহত প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করে। ৫৩তম বার্ষিকীতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু এবারও সেই স্মরণকালে হাজারো মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আঘাত নেমে আসে। বর্তমান মার্কিন-ঘেঁষা চিলির প্রশাসন যেন পুরনো নিপীড়ক চরিত্র নিয়েই হাজির হয়েছে। প্রতিবাদী ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষকে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী পিটিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ৫৩ বছর আগে সিআইএ ও মার্কিন সরকার চিলির ওপর যে প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো চাপিয়ে দিয়েছিল, তার শেকড় কতটা গভীরে।
সেই ভয়াল ১১ সেপ্টেম্বরের সকাল
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল। চিলির প্রেসিডেন্ট হাউস ‘লা মোনেদা’ ঘিরে ফেলেছে ট্যাংক বাহিনী, আকাশে চক্কর দিচ্ছে সামরিক বিমান। চারদিকে গোলাগুলি। প্রাসাদ অবরুদ্ধ। ভেতরে আটকা প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দে।
সেনাবাহিনীর তরফ থেকে তাকে বারবার পদত্যাগের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নইলে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। কিন্তু সামরিক হুঙ্কারের কাছে মাথানত করতে অস্বীকার করেন তিনি। তিনি ঘোষণা দেন, “একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আমাকে লা মোনেদা থেকে বের করা যাবে না।”
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় সামরিক বাহিনীর লোক চারদিক থেকে ঘিরে ফেললে পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে প্রাসাদে উপস্থিত সাংবাদিক, কম বয়সী তরুণ ও কর্মীদের অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দেন তিনি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তোমাদের মতো তরুণ-তরুণীদের সামনে এখনো অনেক কাজ পড়ে আছে। চিলির বিরুদ্ধে এই চক্রান্তের কথা, চিলির শোষিত জনগণের বিপ্লবী মতাদর্শের কথা দেশে দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তোমাদের বেঁচে থাকতে হবে। সে কারণে এই প্রসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাও।”
শেষ পর্যন্ত দেশ ও গণতন্ত্রকে বাঁচানোর চূড়ান্ত চেষ্টা হিসেবে প্রেসিডেন্ট আয়েন্দে নিজেও হাতে তুলে নেন একে-৪৭ রাইফেল (যা ফিদেল কাস্ত্রোর পক্ষ থেকে উপহার ছিল)। সেই আগুনের মধ্যেই তিনি অবিচল ছিলেন, একটু পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে শুরু করেন তাঁর সেই বিশ্ববিখ্যাত ভাষণ।
কী বলেছিলেন আয়েন্দে তাঁর শেষ ভাষণে?
রেডিও পোর্তালে এবং রেডিও কর্পোরাসিওঁ’র সম্প্রচারকেন্দ্রগুলো ততক্ষণে বোমাবর্ষণ করে ধ্বংস করে দিয়েছে বিমানবাহিনী। তবে তখনও কোনোমতে সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিল ‘রেডিও ম্যাগালানেস’। এই রেডিওতেই আয়েন্দে তাঁর দেশের শ্রমিক-জনতার উদ্দেশে জীবনের শেষ কথাগুলো বলে যান।
গোলাগুলির শব্দকে পাশ কাটিয়ে ইথারে ভেসে আসে রাষ্ট্রপতির কণ্ঠ: “আমার বন্ধুরা, আপনাদের উদ্দেশে কথা বলার এটাই সম্ভবত আমার শেষ সুযোগ... আমার কথায় কোনো তিক্ততা নেই, আছে হতাশা। যারা নিজেদের শপথের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের জন্য এই ভাষণ নৈতিক শাস্তি হয়ে থাকবে। আমি পদত্যাগ করছি না!”
আয়েন্দে বুঝে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ভয় ছিল না। তিনি বলেন, “ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, জনগণের প্রতি আনুগত্যের মূল্য আমি জীবন দিয়ে দেব। আমি নিশ্চিত, হাজার হাজার চিলিবাসীর বিবেকের মাটিতে যে বীজ আমরা বপন করেছি, তা চিরদিনের জন্য নষ্ট হবে না। ওরা আমাদের বলপ্রয়োগ ও অস্ত্র দিয়ে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু বলপ্রয়োগ ও হিংসা দিয়ে কোনো সামাজিক প্রক্রিয়াকে থামানো যায় না। ইতিহাস আমাদের... আর ইতিহাস তৈরি করে জনগণ।”
দেশের কৃষক ও শ্রমিকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিদেশি পুঁজি, সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মিলে এই জঘন্য পরিবেশ তৈরি করেছে... তোমরা নিপীড়িত হবে, কিন্তু পরাজিত হবে না।” শেষ লাইনে গিয়ে তাঁর অমর স্লোগান ধ্বনিত হয়, “দীর্ঘজীবী হোক চিলি! দীর্ঘজীবী হোক জনগণ! দীর্ঘজীবী হোক শ্রমিকেরা! অন্তত আমার আত্মত্যাগ অপরাধ, কাপুরুষতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক শিক্ষা হয়ে থাকবে।”
এই ভাষণের কিছুক্ষণ পরই প্রাসাদের ভেতরে আয়েন্দেকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সামরিক জান্তা পরবর্তীতে ঘোষণা করে যে আয়েন্দে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন, তবে এটি নিয়ে চিরকালই সন্দেহ ও বিতর্ক রয়েছে।
মার্কিনরা কেন আয়েন্দেকে খুন করেছিল?
সালভাদর আয়েন্দে কোনো সামরিক স্বৈরশাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ১৯৭০ সালে চিলিতে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মার্ক্সবাদী প্রেসিডেন্ট। তার জয়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কিন্তু কেন?
কারণ আয়েন্দের এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী জয় ছিল না। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদেশি পুঁজির হাতে লুণ্ঠিত হওয়া একটি জাতির নিজেদের সম্পদ নিজেদের করে পাওয়ার জয়। ক্ষমতায় বসেই তিনি চিলির তাম্র শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ করেন। যুগ যুগ ধরে মার্কিন বড় কর্পোরেশনগুলো—যেমন আনাকোন্দা এবং কেনেকট কপার—চিলির খনিগুলো দখল করে বিপুল মুনাফা লুটে নিচ্ছিল। আয়েন্দে ভূমিসংস্কার করেন এবং শ্রমিকদের হাতে কারখানার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেন। চিলির এই উত্থান মার্কিন করপোরেট দুনিয়া (বিশেষত আইটিটি’র মতো টেলিকম বহুজাতিক কোম্পানি) এবং হোয়াইট হাউসের কাছে ভয়ংকর অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দেয়। তারা ভয় পেয়েছিল, আয়েন্দে সফল হলে এই দৃষ্টান্ত গোটা ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আয়েন্দেকে রুখে দিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন ও সিআইএ গোপনে চক্রান্তের নীলনকশা আঁকে। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে সিআইএ পরিচালক রিচার্ড হেলমসের একটি গোপন নোটে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সুস্পষ্ট নির্দেশ লেখা ছিল: “Make the economy scream”—অর্থাৎ চিলির অর্থনীতিকে এমনভাবে ধ্বংস করো যাতে তারা যন্ত্রণায় চিৎকার করে। এর পাশাপাশি সিআইএ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে চিলিতে ধর্মঘট উসকে দেয়, বিরোধী দলগুলোকে অর্থ জোগায় এবং সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করে একটি কৃত্রিম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।
সে সময়কার কুখ্যাত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার দাম্ভিকতার সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, “চিলির সাধারণ মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে তাদের দেশ মার্ক্সবাদের পথে চলে যাবে, আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখব, এটা হতে পারে না।” ফলশ্রুতিতে চিলির সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ ও ইন্ধন দেওয়া হয় অভ্যুত্থান করার জন্য। সিআইএ স্পষ্ট বার্তা দেয়—তারা আয়েন্দেকে উৎখাত করলে ওয়াশিংটনের কোনো আপত্তি তো থাকবেই না, বরং পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
বেঈমানি এবং একটি স্বৈরতন্ত্রের জন্ম
আয়েন্দের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তিনি সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রতি অতি মাত্রায় আস্থা রেখেছিলেন। অভ্যুত্থানের মাত্র এক মাস আগে তিনি অগাস্তো পিনোশে-কে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এই আশায় যে, তিনি সরকারকে রক্ষা করবেন। অথচ এই পিনোশে-ই মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ছকে পা দিয়ে নিজের দেশের গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করেন।
আয়েন্দের পতনের পর চিলির ওপর নেমে আসে গভীর অমানিশা। জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ১৭ বছরের জন্য এক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সিআইএর সরাসরি আশীর্বাদপুষ্ট পিনোশে ক্ষমতা দখলের পরই শুরু করেন ভয়াবহ গণহত্যা। প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা বা গুম করা হয়। প্রায় ৩৮ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বন্দি করে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। রাজধানী সান্তিয়াগোর সুবিশাল ‘এস্তাদিও নাসিওনাল’ ফুটবল স্টেডিয়ামকে রীতিমতো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা মৃত্যু উপত্যকায় রূপ দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মুক্ত বিশ্বে’র তকমা সে দিন চিলির মাটিতে ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। ওয়াশিংটনের রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে চিলির সাবেক রাষ্ট্রদূত অরল্যান্ডো লেটেলিয়ারকেও ১৯৭৬ সালে গাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় পিনোশের গুপ্তচর সংস্থা ‘দিনা’, যাতে সিআইএর প্রচ্ছন্ন মদদ ছিল।
মহান চলচ্চিত্রকার চার্লি চ্যাপলিন তাঁর কালজয়ী ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ সিনেমার শেষ ভাষণে বলেছিলেন, মানবতার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসকের হাতে নয়, মানুষের হাতেই থাকে। ৫৩ বছর আগের সেই সেপ্টেম্বর আয়েন্দের মতো একজন রাষ্ট্রনায়ককে বুলেটে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে পেরেছিল, লা মোনেদাকে পুড়িয়ে ছারখার করেছিল, কিন্তু তাঁর চেতনাকে ধ্বংস করতে পারেনি।
আজ এত বছর পরেও যখন চিলির রাজপথে লক্ষ মানুষের ঢল নামে, বর্তমান সরকার শত লাঠিপেটা করেও যাদের টলাতে পারে না, তাদের মধ্যেই বেঁচে আছেন সালভাদর আয়েন্দে। হয়তো ৫৩ বছর আগের সেই বোমা বিধ্বস্ত প্রাসাদ থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া তরুণদের কেউই আজও মিছিলে আছেন, নয়তো তাদের উত্তরসূরিরা নতুন করে মশাল হাতে তুলে নিয়েছেন। বুলেট বা টিয়ারশেল হয়তো মানুষকে সাময়িক আঘাত করতে পারে, মার্কিন কর্পোরেট পুঁজিপতিরা হয়তো সাময়িক ছড়ি ঘোরাতে পারে, কিন্তু যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার বীজ সালভাদর আয়েন্দে বপন করে গিয়েছিলেন, তা ৫৩ বছরে বিশাল মহীরুহে রূপ নিয়েছে। পিনোশেরা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ হয়েছে, আর আয়েন্দে হয়ে আছেন নিপীড়িত মানুষের ইতিহাসের এক চিরঞ্জীব বাতিঘর।
-- --
লেখক: সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।
ইমেইল: [email protected]



