বাল্যবিয়ে রোধে এনজিও নয়, চাই সরকারি স্থায়ী বিনিয়োগ

ফেরদৌস আরা রুমী
ফেরদৌস আরা রুমী
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৩৫পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
বাল্যবিয়ে রোধে এনজিও নয়, চাই সরকারি স্থায়ী বিনিয়োগ

এআই ইমেজ

শেয়ার করুন:

আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নারী। তাদের শৈশবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে আর অল্প বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে আমরা কখনো উন্নত রাষ্ট্র হতে পারব না। বাল্যবিয়ে বন্ধ করা কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটা একটা শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকারকে এখন এনজিওর পথ চেয়ে থাকা বন্ধ করে নিজের বাজেটে টাকা বাড়াতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং একটা সত্যিকারের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বাল্য বিবাহ এমনকি গ্রামীণ বিভিন্ন স্বাস্থ্যখাতে নেয়া পরিকল্পনাগুলো মূলত বিদেশ তহবিল বা ফান্ড নির্ভর প্রজেক্ট। বিদেশ থেকে আসা এই ফান্ড বন্ধ হয়ে গেলে প্রকল্প থেকে দেয়া সেবা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের বেতন ভাতা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। গত ইন্টেরিম সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছিল, ফলে হামের টিকাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ রাখতে হয়। আর এর ফলেই হাম মহামারি আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা হাম ও হাম উপসর্গে ১১ শ ছাড়িয়েছে।

এরকম একটি দেশ যেখানে টেকসই উন্নয়ন নীতি নেয়া যায়নি গত সাড়ে পাঁচ দশকে। অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের দেশের নিজের অর্থায়নে শিশু, নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তথা সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষকে সমাজের ওপরে তুলে আনার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই; সেই দেশে শুধুমাত্র এনজিও-নির্ভরতা দিয়ে বাল্যবিয়ের হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। এই চেষ্টা করাটাও অমূলক।

কম বয়সী নারীরা গর্ভধারণ করলে মায়ের মৃত্যু ঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। এই তথ্য সারা দুনিয়া আজ মেনে চলে। সে কারণে কম বয়সী নারীদের বিয়ে আটকানোর কড়াকড়ি ব্যবস্থা প্রায় সব দেশেই করা হয়। সেসব দেশের সরকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে, নিরাপদ ঝুঁকিহীন শিশু প্রসব। আজকের শিশু পরবর্তী সময় ওই দেশের শ্রম শক্তি, নেতৃত্ব বা দেশটির মূল প্রাণ। শিশু ও শিশুর মায়ের প্রতি তাই বিশেষ যত্ন নেয় প্রতিটি উন্নত দেশ।

জাপানে সন্তান প্রসবের ব্যয় ৩,৫০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। তবে সরকার এই অর্থ হাসপাতালকে দিয়ে দেয়। চীনে এই খরচ হয় ৭০০ থেকে ২,১০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৪,০০০ টাকা থেকে ২ লক্ষ ৫২,০০০ টাকার সমান। বর্তমানে সাংহাইসহ কয়েকটি জায়গায় সরকার এটি বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

অবশ্য এই দুটি দেশে শিশুর যত্নের প্রতিও খরচ অনেক বেশি, সেটা রাষ্ট্রই করে। জাপানে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর জন্য বছরে গড়ে প্রায় ৭,৮০০ ডলার বা প্রায় ৯ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা খরচ হয়। পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে সরকার প্রতি মাসে সন্তান পিছু প্রায় ৬৫ থেকে ১০০ ডলার (প্রায় ৭,৮০০ থেকে ১২,০০০ টাকা) ভাতা প্রদান করে থাকে এবং স্কুলে শিক্ষা বিনামূল্যে থাকে। চীনে শিশুকে বড় করার জন্য প্রতি বছর গড়ে ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ ডলার বা প্রায় ৫ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়।

সে তুলনায় বাংলাদেশে গর্ভকালীন মায়ের প্রতি সরকারের নিদারুণ অবহেলা ছাড়া কোনো ব্যয় বরাদ্দ আছে কিনা জানা নেই। আর শিশুদের ক্ষেত্রেও তাই। এখানে মায়েরা আসলে অসম প্রাকৃতিক ভাইরাস আর নানান রোগবালাইয়ের সাথে লড়াই করে টিকে যায়। এটা মিরাকলের মতই। আর কম বয়সের নারী মা হলে অনেক সময় তার বেঁচে থাকাটাও কঠিন হয়ে যায়।

বাংলাদেশে কোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হলেই সচেতনতামূলক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে মূল দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ রাষ্ট্রের নেই। যদি আইন প্রয়োগ, মাঠপর্যায়ের সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক তদারকি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে বিদেশি ফান্ডের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়, ‘তাহলে সরকারের কাজ কী?’—এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। বাল্যবিয়ে কোনো দাতব্য কাজ নয়, বরং দেশের প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জরিপের এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে এসেছে। তথ্যগুলো সত্যি বলতে মন খারাপ করে দেওয়ার মতো। রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। শহরের অবস্থা যদি ৫০ শতাংশ হয়, তবে গ্রামের চিত্র আরও করুণ—প্রায় ৫৬ শতাংশ। সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, এই বিভাগে ১৫ বছরের কোঠায় পৌঁছানোর আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে ১৩ শতাংশ শিশু। ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তো ৬৫.০৭ শতাংশেরই বিয়ে হয়ে যায়, আর ১০ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের বিয়ের হার ৭.১২ শতাংশ।

রাজশাহীর পদ্মা পাড়ের চর মাঝাড়দিয়াড় বা চর নবীনগরের দিকে তাকালে কারণটা স্পষ্ট হয়। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের কোনো সুযোগ নেই। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে বা নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে বাবা-মায়েরা মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়াকেই একমাত্র সমাধান মনে করেন।

রাজশাহীর এই ছবি কিন্তু আমাদের দেশের বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। পুরো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই এটা এখন এক বিশাল সংকট। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক তহবিলের (ইউএনএফপিএ) 'গ্লোবাল পপুলেশন স্টেটাস ২০২৫' এবং বিবিএস ও ইউনিসেফের 'মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫' প্রতিবেদনের তথ্যও একই কথা বলে।

বাংলাদেশে এখনো ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর ছোঁয়ার আগেই। বিশ্বের যেসব দেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে অষ্টম। আর এশিয়ার ভেতরে আমরা একদম শীর্ষে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৬ লাখ কিশোরী ১৮ বছর হওয়ার আগেই বাল্যবিয়ের শিকার। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই হার আরও বাড়ছে। ২০২০ সালে এই হার ৩১.৩ শতাংশ থাকলেও ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০.৮৫ শতাংশে এবং ২০২৩ সালে তা ৪১.৬ শতাংশে পৌঁছায়। বিবিএস ও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১,০০০ জন কিশোরীর মধ্যে ৯২ জনই (পূর্বের পরিসংখ্যানে ৭১ জন) বয়সে পৌঁছানোর আগেই সন্তানের মা হয়ে যাচ্ছে। খুব কম বয়সে মায়েরা গর্ভধারণ করলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৫ বছরের কম বয়সে গর্ভবতী হলে সেই ঝুঁকি সাধারণ বয়সের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিশাল সমস্যা মোকাবিলায় আমরা কী করছি? একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের পুরো বাল্যবিয়ে বিরোধী কাঠামোটি আসলে এনজিও আর বিদেশি ফান্ডিংয়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক বছরে দাতা সংস্থাগুলোর বাজেট কমেছে, অনেক প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর অর্ধশতাধিক বেসরকারি সংস্থা কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তার প্রভাব পড়েছে সোজা মাঠপর্যায়ে। উন্নয়ন কর্মীরা নিজেরাও স্বীকার করছেন যে, অর্থ বরাদ্দ না থাকায় আগের মতো উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক সভা বা আইনি সহায়তার আয়োজন আর করা যাচ্ছে না।

কিন্তু ভেবে দেখুন, একটি দেশের শিশুদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজটা কেন শুধুই বিদেশি এনজিওর বাজেটের ওপর ঝুলে থাকবে? একটা প্রজেক্ট আসে নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য। মেয়াদ শেষ হলে তারা চলেও যায়। কিন্তু দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া তো সরকারের স্থায়ী দায়িত্ব। এনজিওদের সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করার এই চর্চা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাল্যবিয়ে বন্ধের প্রধান দায়িত্বটা সরকারকে নিজের কাঁধেই নিতে হবে।

আমাদের দেশে আইন কিন্তু একেবারে কম শক্ত নয়। ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে স্পষ্ট বলা আছে—প্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিয়ে করলে তাকে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে, অথবা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। টাকা না দিলে আরও ৩ মাসের জেল। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ বিয়ে করলে তার জন্য ১ মাসের আটক বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানের নিয়ম রয়েছে। কাগজ-কলমে ইউনিয়ন, উপজেলা আর জেলা পর্যায়ে সচেতনতা কমিটিও করা আছে। কিন্তু বাস্তবে আইনটির প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ে না। ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং সঠিক জবাবদিহিতার অভাবে এই কমিটিগুলো শুধু সরকারি ফাইলে আটকে থাকে। মাঠপর্যায়ের চেয়ারম্যান, মেম্বার বা গ্রাম পুলিশদের নিয়মিত তদারকি করার কথা থাকলেও সদিচ্ছা আর অর্থসংকটের কারণে বাস্তবে কিছুই হয় না।

আইন প্রয়োগের ঢিলেঢালা ভাব ছাড়াও এখানে আরেকটি বড় সংকট আছে। তা হলো রাষ্ট্রীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব। বাল্যবিয়ে শুধু একটা সামাজিক প্রথা বা অন্ধবিশ্বাস নয়, এটি দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল বাল্যবিয়ের কারণেই বাংলাদেশ প্রতি বছর ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে। একটা মেয়ের যখন কম বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, তখন তার পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয়। সে শ্রমবাজারে ঢুকতে পারে না, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ হারায়। এতে পুরো দেশই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

তাই এই সংকট সামাল দিতে হলে সরকারকে নিজের পকেট থেকে বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে।

প্রথমত, যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের স্কুল নেই, সেখানে দ্রুত অবকাঠামো বানাতে হবে। রাজশাহীর চরাঞ্চলের মতো জায়গায় অন্তত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। মেয়েদের নিরাপদে স্কুলে যাওয়া-আসার সুযোগ আর উপবৃত্তির ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা দরকার। ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা প্রশাসনকে এনজিওর ফান্ডের অপেক্ষায় ফেলে রাখা যাবে না। সরকারি রাজস্ব বাজেট থেকেই সচেতনতামূলক সভার জন্য টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—তাদের এলাকায় বাল্যবিয়ে হলে তার জবাব তাদেরই দিতে হবে।

তৃতীয়ত, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়ানো দরকার। যে পরিবারগুলো অভাবের কারণে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়, তাদের জন্য শর্তসাপেক্ষ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সোজা নিয়ম থাকবে—মেয়ে ১৮ বছর পর্যন্ত পড়াশোনা করবে, বিয়ে দেওয়া যাবে না, তাহলেই পরিবারটি ভাতা পাবে।

চতুর্থত, ১০৯ কিংবা ৩৩৩-এর মতো সাহায্য চাওয়া জাতীয় হেল্পলাইনগুলোকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি কাজী, স্থানীয় মাতব্বর আর অভিভাবকদের ওপর কড়া নজর রাখা দরকার। কোথাও বাল্যবিয়ে থামানো না গেলে সেখানকার স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে।

আমাদের সরকার ঘোষণা দিয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নির্মূল করবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে সব ধরনের বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করবে। কাগজ-কলমে সুন্দর লক্ষ্য ঠিক করা সহজ, কিন্তু মাঠে কাজ না নামলে বা কেবল এনজিওর সভার ওপর ভরসা করে থাকলে এই লক্ষ্য কোনোদিন অর্জন করা যাবে না।

আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নারী। তাদের শৈশবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে আর অল্প বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে আমরা কখনো উন্নত রাষ্ট্র হতে পারব না। বাল্যবিয়ে বন্ধ করা কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটা একটা শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকারকে এখন এনজিওর পথ চেয়ে থাকা বন্ধ করে নিজের বাজেটে টাকা বাড়াতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং একটা সত্যিকারের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কন্যাশিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষায় রাষ্ট্রের নিজের বিনিয়োগই পারে আমাদের এই অভিশাপ থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতে।

কিশোরীদের কম বয়সে বিয়ের পিঁড়ি থেকে বাঁচাতে হলে সরকারকে শক্তিশালী নীতি নিতে হবে প্রথমে। এরপর অবকাঠামো তৈরি করতে হবে এবং স্থায়ী লোকবল দিয়ে দিনের পর দিন পরিকল্পনাভিত্তিক কাজ এগিয়ে নিতে হবে। এতে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামভিত্তিক এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পথরেখা থাকতে হবে। বিদেশি ফান্ড নির্ভর প্রকল্পগুলোর অধিকাংশ লক্ষ্য বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে না, ফলে অনেক সময় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় সমাজের সাথে নানান দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে সবার আগে দরকার সরকারের সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা।

---
*লেখক: জেন্ডার বিশ্লেষক এবং মানবসম্পদ বিভাগ প্রধান, ঢাকা পেপার্স।

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন: